সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কালের বির্বতনে বিপন্ন বক



June_1279075075_7-boga_kalak13-bপাখি সব করে রব রাত্রি পোহাল, কাননের কুসুম কলি সকলি ফুটিল কবির এমন ছন্দে ভরা কবিতার কথা আজ আমাদের কাছ থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।নেই এখন আর ভোর বেলা পুকুর পাড়ে কিংবা কোন ঝোপের উপর খাপ পেতে থাকা সাদা বক কালা বক। নেই পড়ন্ত বিকেল বেলা নীল আকাশে বক পাখিদের ঝাক বাধা মিছিল। কালক্রমে আমাদের এই রুপসী বাংলাদেশ থেকে নানা প্রজাতির পাখির মত হারিয়ে গেছে বক প্রানী।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাসহ আমাদের দেশের জলাভূমির ভারসাম্য রক্ষায় নিবেদিত পাখি বক এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। বিশেষ করে শিকারীদের পাতা ফাঁদে ব্যাপক হারে ধরা পড়ার ফলে আজ বিপন্ন বিভিন্ন বক প্রজাতির পাখিরা। নানা প্রজাতির বক আমাদের দেশের অতি চেনা একটি পাখি। গ্রামেগঞ্জে সর্বত্র জলাভূমিতে মাছ শিকারের আশায় গাছের ডালে বসে থাকতে বা বিল-ঝিল-নদী-নালা পুকুরের পানিতে নয়তো পানির ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বকদের। নিঃসঙ্গ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ধ্যানে মগ্ন বক আমাদের সবার দেখা চিরচেনা একটি দৃশ্যপট। ইদানিং এই দৃশ্য শহর বা শহরতলীতে তো নয়ই, বরং গ্রামাঞ্চালেও খুব বেশি একটা চোখে পড়ে না। এর আরেকটি কারণ হচ্ছে সহজ লভ্য এবং সর্বত্র বিরাজমান বককে নির্বিচারে হত্যা করে আমাদের রসনা তৃপ্তি। আজকাল শহর অঞ্চলে এক শ্রেণীর পাখি বিক্রেতাদের দেখা যায় হাতে ঝুলিয়ে বক বিক্রি করতে। এই চোরা পাখি শিকারীরাই বকের প্রধান শত্রু।
বকরা সাধারণত জলাভূমির পাশে বড় কোন গাছে, নয়তো বাঁশ ঝাড়ে বাথান গড়ে তুলে ঝাঁক বেঁধে বাস করে। একটা বাথানে অনেক পাখি থাকে। কোন কোন বাথানে দু’শ থেকে তিন’শ পর্যন্ত বককেও এক সাথে থাকতে দেখা গেছে। রাতে এসব বাথানে জাল এবং ফাঁদ পেতে অতি সহজেই শিকারীরা বকদের ধরে। এছাড়া বড়শিতে কোলা ব্যাঙ বা মাছ গেঁথেও অতি সহজে এই নিরীহ পাখিদের ধরা যায়। ফলে এসব লোভী শিকারীদের কবলে পড়ে ব্যাপক হারে নিধন হচ্ছে বক পাখিরা। এছাড়া জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে কীটনাশকে মৃত ব্যাঙ, কেঁচো এবং পোকা মাকড় খেয়েও বিষক্রিয়ায় নির্বিচারে মারা পড়ছে বক জাতীয় পাখিরা। আমাদের দেশে বক প্রজাতির নানা পাখি দেখতে পাওয়া যেত। এদের মধ্যে অনেক জাতের বক এখন বিলুপ্ত প্রায়। সামান্য কিছু টিকে আছে সুন্দরবন নয়তো বিল হাওড়ের দুর্গম অঞ্চলগুলোতে। বক জাতীয় যে পাখি এখন বিলুপ্তির পথে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নিশি বক, গো বক, বেগুনি বক, কালো বক, নল ঘোঙ্গা, কোদালী বক, সবুজ বক, মোহনা বক, খুন্তে বক, ধূসর বক, মদনটাক বক, কাস্তেচোরা, বড় বক, শামুক ভাঙ্গা বক, সাদা বক ইত্যাদি। বড় বক বা ডাটিয়া এদের মধ্যে বড় বক আকৃতিতে ৭৫ সেন্টিমিটার থেকে সর্বোচ্চ ১শ’ ৫২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এরা স্থানীয় জাতের পাখি। গ্রামাঞ্চলের বাঁশ-ঝাড় বা বড় বড় গাছের উপর এরা ডাল পালা দিয়ে বাসা বানায়। কেউ বিরক্ত না করলে এরা একটি বাসা দীর্ঘদিন ব্যবহার করে থাকে। কালো পা এবং অপেক্ষাকৃত বাহারী গলা, হলুদ ঠোঁট এবং শুভ্র পালকের এ বকগুলোকে গ্রামাঞ্চলের লোকজন ডাটিয়া বক বা বৃহৎ বক বলেও ডাকে। আগে দেশের সর্বত্র এদের দেখতে পাওয়া যেত। এখন শুধু সিলেটে বড় বড় হাওড় এবং বড় নদীর চরাঞ্চলে এদের দেখতে পাওয়া যায় তবে সংখ্যায় অল্প। মাছ, ব্যাঙ এবং জলজ পোকা মাকড় এদের প্রধান খাদ্য।
সাধারণত পানিতে দাঁড়িয়ে বা হেঁটে হেঁটে মাছ এবং ব্যাঙ ধরে খায়। জলাভূমির ভারসাম্য রক্ষায় এদের রয়েছে অবদান। শামুক ভাঙ্গা বক গোত্রের আর একটি বিলুপ্ত প্রায় পাখি হচ্ছে শামুক ভাঙ্গা।এদের শামুক খোল নামেও ডাকা হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদ এবং সুন্দরবন এলাকায় এদের দেখতে পাওয়া যা। সত্তর থেকে আশি সেন্টিমিটার আকৃতির শামুক ভাঙ্গা পাখির পালকের রং সাদা। তবে পিঠে, লেজ ও ডানার সম্মুখের অংশে কালো। ঠোঁটের রং লাল কালোতে মিশেল রংয়ের এবং ঠোঁটের মাঝখানে রয়েছে ফাঁক। জলজ শামুক এদের প্রধান খাদ্য। তবে শামুকের পাশাপাশি ব্যাঙ, কাঁকড়া ও জলজ পোকা মাকড়ও এরা খেয়ে থাকে। পাখি পর্যবেক্ষকদের মতে শামুক ভাঙ্গার সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমছে। নিশি বক দেশের সর্বত্র যে বক আগে দেখতে পাওয়া যেতো সেই নিশি বক এখন আর সুন্দরবন ছাড়া অন্য কোথাও তেমন একটা চোখে পড়ে না। আকৃতিতে পঞ্চাশ সেন্টিমিটার এবং মাথা, ঘাড় ও পিঠের রং কালচে। এছাড়া শরীরের বাকি অংশের পালকের রং ফুরফুরে সাদা। সুন্দর নিশি বকের আর একটি বৈশিষ্ট হচ্ছে এরা দিনের বেলা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে। আর আঁধার নামার পরেই বের হয় খাদ্যের এদের চোখের বিশেষ বৈশিষ্টর কারণেই এরা রাতে ভাল দেখতে পায়। নিশাচর এই বক দিনের বেলা দলবদ্ধভাবে ঝোপ জঙ্গলে আশ্রয় নেয় বলেই বিশ্রামকালে এরা অতি সহজেই শিকারীদের হাতে ধরা পড়ে। ফলে নিশি বক অতিদ্রুত বিলুপ্ত হতে চলেছে। এছাড়া এদের মাংস অত্যন্ত বলেই মানুষের রসনা মেটাতেই এরা আজ নিঃশেষ হতে চলেছে। আকৃতিতে পঞ্চাশ থেকে ষাট সেন্টিমিটারের বেশি নয়। এরা ওয়াক ওয়াক শব্দে ডাকে বলে অনেক এলাকায় এদের ওয়াক বক নামেও চেনে। কোদালী বক লম্বা দীর্ঘ ঠোঁটের আকৃতি অবিকল কোদালের মতো চ্যাপ্টা তাই বিলুপ্ত প্রায় এই বকের নাম হচ্ছে কোদালী বক। ভরা শীতে আসে বড় বড় জলাভূমি থেকে। এদের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৯০ সেন্টিমিটার। আবার অনেকে একে চামুচ ঠোঁটা বক বলেও আখ্যায়িত করে থাকে। এদের ঠোঁটের গোড়া মোটা এবং মাঝখানে চিকন আবার অগ্রভাগ ক্রমশ চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। ঠোঁটের অগ্রভাগ হলুদ এবং বাকি অংশ কালো। শরীরের পালক সাদা এবং পা কালো। এরা শুধু মাছ, ব্যাঙ, শামুক ও পোকা মাকড়ই খায় না বরং ঘাসও খায়। কোদালী বক সুন্দরবন ও দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চল ছাড়া এখন আর অন্য কোথাও দেখা যায় না। তদুপরি সংখ্যায় অনেক কম। গো বক পিঠ ও গলায় কমলা রঙের পালকসহ সাদা রঙের। এরা সাধারণত গরু ও মহিষের পিঠে চড়ে ওইসব প্রাণীদের গা থেকে ডাস বা এটুলী জাতীয় পরজীবী পোকা ধরে খায়। গো বক ফসলের ক্ষেতে হেঁটে হেঁটেু পোকা মাকড় ধরে ধরে খায়। এতে কৃষকের অনেক উপকারে আসে। এরা সাধারণত ঝাঁক বেঁধে থাকে। এদের খাটো ঠোঁট, পা হলুদ এবং প্রজনন মৌসুমে মাথা, ঘাড় ও গলার নীচের দিক এবং বুক ও পিঠে সোনালী বা বাদামী ও কমলা রঙের পালক দেখা যায়। সেই অতি চেনা গো বকও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষের রসনা তৃপ্তিতে বলি হতে গিয়ে এদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। মদনটাক বক গোত্রের আর একটি বৃহৎ আকৃতির পাখি।আকৃতিতে ১১০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার। পিঠের পালক কালো এবং এদের বুকের রং সাদা। গলা, মাথা ও ঠোঁটের পালকের রং হালকা গোলাপী। মাথায় পালক কম, অনেকটা ন্যাড়ো ধরণের। মদনটাকের ঠোঁট অনেক বড় এবং শক্ত। মাছ, ব্যাঙ ও সরীসৃপ এদের প্রধান খাদ্য। এদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যা জোড়ায় জোড়ায় চলাচল করতে দেখা যায় সুন্দরবনে। ইতোমধ্যে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতায় এই পাখিটি অতি দুর্লভ হয়ে উঠেছে। নলঘোঙ্গা অতি বিরল প্রজাতির পরিযায়ী বক গোত্রের পাখি। এদের শীতকালে আমাদের দেশে আসে। গায়ের রং হলুদ এবং লালচে বাদামি। এরা একা একাই জলাভূমিতে পোকা মাকড় ধরে খায়। এছাড়া ধূসর বক,বেগুনি বক,সবুজ বা কুড়ো বক, ছোট বক এখন আর খুব বেশি চোখে পড়ে না। বন্যপাখি শিকার এবং বিক্রয় আইনত নিষিদ্ধ এবং দন্ডণীয় অপরাধ আমাদের দেশে। কিন্তু আইনটির যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এখনও অবাধে চলছে পাখি শিকার ও বিক্রয়। সে জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ধনকারী পাখি সম্পদ রক্ষায় আইনটির প্রয়োগ একান্ত অপরিহার্য। অন্যথায় আমাদের এমন অতি চেনা জানা অনেক পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাবে আমাদের দেশ থেকে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত