বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব শ্রমিক দিবস এবং আমাদের করণীয়



9এ.এইচ.এম শামীম ইকবাল : আল্লাহ মানুষকে খেদমত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হুকুম অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামের পরিভাষায় আমরা সবাই শ্রমিক একজন প্রেসিডেন্টও শ্রম দিয়ে থাকেন অন্য দিকে একজন সাধারণ কাজের লোক শ্রম দিয়ে থাকেন। নারী, পুরুষ, ধনী-গরীব সবাই কাজ করতে হয়। এটাই নিয়ম পৃথিবীতে যত নবী রাসুল এসেছেন সবাইকে পরিশ্রম করতে হয়েছে যেমন কৃষি কাজ হযরত আদম (আঃ) এর সুন্নত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) ছাগল ছড়ানোর মত কঠিন কাজ করেছেন। আমার নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কিশোর বয়স থেকে ব্যবসা, বানিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই সুবাধে মা খাদিজা (রাঃ) সঙ্গে নবী (সাঃ) এর পরিচয় ঘটে। সৎ আদর্শবাদী মহিলা মা খাদিজা (রাঃ) আমার নবী (সাঃ) এর চরিত্র, আদর্শ, নীতি-সততা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন খাদিজা (রাঃ) নিজেই বিয়ের প্রস্তাব নবী (সাঃ) কে দিলেন একপর্যায়ে নবীর সাথে মা খাদিজা (রাঃ) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সকল নবী রাসুলগণ যে সমস্ত কাজ করেছেন (১) ছাগল ছড়ানো (২) গৃহ পালিত পশু পালন (৩) কূপ থেকে পানি উত্তোলন (৪) পরিখা খনন (৫) জ্বালানী সংগ্রহ। ব্যবসার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কাপড় ও পাথর ইত্যাদি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করছেন সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে। মানব জাতিকে জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, প্রতিভা দিয়ে আল্লাহ পাকের প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। রাসুল (সাঃ) বলেছেন ‘আল মুমেনু ইয়ামুতো বে আরাকিল জাবিন’ অর্থাৎ মুমিন তার কপালে ঘাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করে। যারা মুমিন হবে তারা কখনোও শ্রমিককে ঘৃণা করতে পারে না। শ্রমিকের অবমূল্যায়ন করতে পারে না। শ্রমের মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতি আজ খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছে। যুগে যুগে খ্যাতিমান মনিষিরা তাদের কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ আজীবন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। পৃথিবীর আদিকাল থেকে এ ধারা প্রবাহমান।
কোরআনে করিমে আল্লাহ বলেছেন “তোমরা নামাজ আদায় কর, তার পর হালাল রিজিক এর জন্য জমিনে ছড়িয়ে পড়।” আর একটি বিষয় হলো শ্রমের মাধ্যমে মানুষের ধর্য পরীক্ষা করা যায়, তাই আল্লাহ পাক নবী রাসুলগণকে ছাগল ছড়ানোর মত কঠিন কাজ করিয়ে তাদের ধর্য পরীক্ষা করিয়েছেন, তারপর নবুয়তি দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সমাজের দিকে থাকালে দেখা যায় লক্ষ লক্ষ যুবসমাজ বেকার, তার কারণ কি আমরা আল্লাহ পাকের হুকুম মত, নামাজ আদায় করছিনা কাজও তালাশ করছিনা। আর এক শ্রেণীর লোক যারা ধনী তাদের ছেলে-মেয়েদের সু-শিক্ষা না দিয়ে ও তাদের মৌলিক দায়িত্ব আদায় না করে, হাতে টাকা তোলে দিয়ে থাকেন। এতে করে সে একটি মটর সাইকেল বা প্রাইভেট গাড়ি ক্রয় করে নোংড়া রাজনীতি, গ্রুপিং সহ নানান অসামাজিক কার্যকলাপের দিকে ডুকে পড়ছে। তাতে সমস্যায় পরছে দেশ, জাতি, তথা সমাজ। তাই ঐ সমস্ত অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, সকল ধনীদের ধনী, সকল জ্ঞানীদের জ্ঞানী আল্লাহ সুবহানু তায়ালা নিজেই তাঁর প্রতিনিধি নবী রাসুলগণকে নবুয়তী প্রদানের পূর্বে শ্রমিক বানিয়েছেন, ব্যবসা বাণিজ্য করিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নবুয়তি প্রদান করেছেন। পিতা-মাতার প্রতিনিধি হচ্ছেন তার সন্তান, তাই আপনার সন্তানকে পরিশ্রমি না করে আদর করে অযথা টাকা পয়সা দিলে বিপদগামী হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই আমার দেশের বেকারত্ব দূর করতে হলে ধর্মীয় অনুশাসন মানতে হবে। হযরত ওমর (রাঃ) প্রেসিডেন্ট হয়েও শ্রমিক হিসেবে উটের রশি টেনেছেন আটার বস্তা নিজ পিঠে বহন করেছেন। নেতা হলে, ধনী হলে কাজ করবনা এবং করাবনা তা হতে পারে না।
বিশ্বের শ্রেষ্টতম মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পদশালী লোকদের চেয়ে ঈমানদার, চরিত্রবান শ্রমিককে বেশি ভালোবাসতেন, তার জলন্ত প্রমাণ হচ্ছে, আরবের ধনী ব্যাক্তি ইবনে আবু বক্কর এসে নবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর নিকট আরজ করলেন যে, আমার মেয়েকে আরবের কোনো অভিজাত বংশের ছেলের কাছে বিয়ে দিয়ে দিন। নবী করিম (সাঃ) বললেন বিলাল (রাঃ) এর সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। কিন্তু তিনি রাজী না হয়ে চলে গেলেন। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় দিন এসে নবী করিম (সাঃ) এর নিকট বললেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) একই উত্তর প্রদান করলেন। তৃতীয় দিন এসে তিনি আবেদন করলেন তখন হুজুর (সাঃ) বললেন একজন জান্নাতি (শ্রমজীবি, চরিত্রবান যুবক) লোকের নিকট তোমার মেয়েকে কেন বিয়ে দিচ্ছ না। তখন ইবনে আবু বক্কর বললেন হে রাসুল (সাঃ) আপনার মত আমার মত। (বোখারী)
হুজুরে পাক (সাঃ) আরবের অভিজাত লোকেদেরকে উৎসাহিত করতেন তাদের মেয়েদেরকে শ্রমজীবি যুবকদের নিকট বিয়ে দিতে। কথায় নয় কাজেই প্রমাণ করেছেন নবীজির কলিজার টুকরা, জান্নাতি মহিলাদের সর্দার যাকে নবীজি বলেছেন নবীজির গায়ের অংশ, মোহাম্মদ (সাঃ) এর কন্যা হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর যখন বিবাহের সময় হলো তখন মক্কা তথা গোটা আরবের বড় বড় অভিজাত সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ ফাতেমা (রাঃ) বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তার বিপরীত ঘটলো হুজুর (সাঃ) এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বীরযোদ্ধা জান্নাতি যুবকদের সর্দার, যিনি মানুষের কাছে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন শ্রমজীবি যুবক হযরত আলী (রাঃ) এর সাথে মা ফাতেমা (রাঃ)-কে বিয়ে দিলেন।
আজকের পৃথিবীতে যে সব অসহায় ও মজলুম শ্রমজীবি মানুষ রয়েছেন তাদের অধিকার আদায়ে সকলের প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখতে হবে।
বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাতকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে শ্রমিকের হাত বানাতে হবে। একদিন দয়াল নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর দরবারে এক ভিক্ষুক এসে বলল, হে নবী আপনি আমাকে কিছু সাহায্য করুন। নবী (সাঃ) একখানা কম্বল লোকটির হাতে তুলে দিয়ে বললেন, কম্বলটি বাজারে বিক্রয় করে একটি কোড়াল ক্রয় করে নিয়ে এসো এবং বনে যাও কাঠ কেঠে বাজারে বিক্রয় করো। লোকটি রাসুল (সাঃ) এর কথায় তাই করলো। যে সকল কাজ মানুষের প্রয়োজন, এর কোন বিষয়কে তুচ্ছ মনে করা যাবে না। মুচি জুতা সেলাই করে, দর্জি কাপড় সেলাই করে, নাপিত চুল কাটে, জেলে মাছ ধরে, ধোপা কাপড় ধৌত করে, ফেরিওয়ালা ঘুরে ঘুরে ফেরি দেয়, কোন কাজই নগন্য নয়। রাসুল (রাঃ) নিজ হাতে জুতা মেরামত করে, কাপড় সেলাই করে এবং এক মুসাফির বিছানায় পায়খানা রেখে যাওয়া কাপড় ধৌত করে শ্রমের মর্যাদা স্থাপন করেছেন। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নামের পরিবর্তন হয়েছে যেমন মাছ চাষি কে বলা হত মাইমল, বর্তমানে বলা হয় ফিসারীর মালিক, চুল কাটার লোককে বলা হত নাপিত বর্তমানে বলা হয় পার্লার ব্যবসায়ী বা বিউটিসিয়ান, মোরগ ব্যবসায়ীকে বর্তমানে বলা হয় ফার্ম এর মালিক। এটা যুগের সাথে নামের পরিবর্তন হওয়ায় যুব সমাজ এগুলো পেশার সাথে জড়িত হচ্ছে।
সরকারও বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে যুবসমাজকে উদ্বুদ্ব করছে। আসল কথা হচ্ছে ইসলামে শ্রমের ব্যাপারে কোন পার্থক্য নেই। রাসুল (সাঃ) ও তার পরবর্তী চার খলিফা শ্রমের ব্যাপারে উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সে অনুসারে মানবজাতি চললে শ্রমিক সমস্যা ও সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টি হতো না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায় অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা শ্রমিককে ঘৃনা করে এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ধনীরা শ্রমিকের শ্রমকে পূজি করে আর বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করে, উর্ধতন কর্মকর্তারা দূর্নীতি করে শ্রমিকের হক নষ্ট করতেছেন, এতে করে শ্রমিকরা তাদের অধিকার হারাচ্ছে। তারা দূর্নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে এতে করে শ্রমিকরা হারাচ্ছে শ্রেষ্ট দৌলত ঈমান, আমরা যে ধর্মের লোক হইনা কেন সর্ব ধর্মে শ্রমিকের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সমাজের সবাই ধর্মের কথা বলে কিন্তু বাস্তবে নিজে আমল করে না। বিধায় লিখালিখি, বক্তৃতা, সেমিনার, সেম্পোজিয়াম এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এতে করে সমাজে কোনো উপকার আসছে না। সকল আদর্শের আদর্শ মানব জাতির শ্রেষ্ঠ নবী মোহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন “শ্রমিকের ঘায়ের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বে তার পাওনা দিয়ে দাও।” হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ তায়ালা চাইলে পৃথিবীর বাদশাহী দান করতে পারতেন কিন্তু তা না করে শ্রমিকের ভূমিকায় কাজ করাইয়াছেন।
বর্তমানে মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী বিশ্ব বাজারে গত ০৫ বছরে বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে আসছে। মূলত বিশ্ব মন্দার প্রভাবে বিশ্বে অনেক উন্নত দেশ উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যাহত হচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়েছে দেশের শ্রমবাজারে। এ পরিস্থিতিতে শ্রম-কুটনীতির মাধ্যমে নতুন বাজার খুজে বের করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। একই সাথে বিদেশ থেকে ভিসা সংগ্রহে অর্থনৈতিক প্রতিযোগীতা, ভূয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অদক্ষ শ্রমিককে বিদেশ পাঠানো, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অনিয়ম, রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনপ্রীতির কারণেও জনশক্তি রপ্তানিতে নৈতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমবাজার ঠিক করতে সরকারের সু-নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে বাস্তব প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা। তাই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম এদেশের লক্ষ কোটি প্রবাসীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা সহ তাদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি হয়েছে। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করে দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশের মাটিতে প্রয়োজনীয় শ্রমবাজার সৃষ্টি, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শ্রমের সাথে জড়িত শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন প্রদানে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এখনও চোখে পড়ে। অথচ প্রতি বছর ১লা মে নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয় বিশ্ব শ্রমিক দিবস। বলা হয় শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে বিভিন্ন প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কিন্তু বাস্তব সত্য যে, অদৃশ্য কারণে শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়ন হয় না বরং ধনী আরো ধনী, গরিব আরো গরিব হতে থাকে। আর ধনী গরীবের এ বিশাল ব্যবধান সামাজিক অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তুলে।
আল্লাহ প্রদত্ত রাসুল (সাঃ) নির্দেশিত সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থা গড়তে সবাইকে কাধে কাধ রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু আমরা যে অতীত ভূলে গেছি, তাই এত অশান্তি।আর এ ধারা অব্যাহত থাকলে সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাড়াতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদিও শ্রমবাজার নিম্নমুখী তার পরও সবার একটু চেষ্টায় তার উন্নতি সম্ভব। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা দরকার।

(লেখক : ব্যুরো চীফ, দৈনিক ভোরের পাতা)

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত