রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মে দিবসের ইতিবৃত্ত ও আজকের প্রেক্ষাপট



dbf0c45b0422142df81e294e4642e5b7মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : পৃথিবীর মেহনতি মানুষের জন্য আজকের দিনটি খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ। কারণ এই দিনটির মাধ্যমে তারা তাদের কাজের প্রকৃত স্বীকৃতি পেয়েছে। এই দিনটিকে পাওয়ার জন্য মানুষ নিজের জীবন রক্ষার জন্য, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদ-সংগ্রাম করেছে মালিকদের বিরম্নদ্ধে। যুগে যুগে দেশে দেশে সমাজে খেটে-খাওয়া শ্রমিক শ্রেণী ও মেহনতি মানুষ দেশ-জাতির উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখেছে। কেননা যে কোনো দেশের উৎপাদন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে তারাই বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। আবার তারাই সবচেয়ে বেশি শোষিত-বঞ্চিত হয়েছে। নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে সবচেয়ে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে এসব অসহায় গরিব শ্রমিক শ্রেণী। নির্যাতিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষ তাদের অধিকার রক্ষা ও দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছে বছরের পর বছর। তারা সংগ্রাম করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করেছে। যে কোনো পেশাজীবী মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ে কোনো রক্তপাত যে বৃথা যায় না, ইতিহাসে তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রমাণ এ মহান মে দিবস। এরই ধারাবাহিকতায় শ্রমিক শ্রেণী আশার আলো খুঁজে পেয়েছে।
এ মহান মে দিবস হচ্ছে পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের বিজয় নিশান। এ কারণে মে দিবস বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে অত্যনত্ম তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ আত্মত্যাগের এক বিরাট ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাদের সুমহান আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে স্বীকৃতি পেয়েছে শ্রমের মর্যাদা। শ্রমজীবী মানুষের কাছে ‘সিলভিস’ একটি কিংবদনিত্ম নাম। সিলভিস ছিলেন লোহা ঢালাই শ্রমিকদের তরম্নণ নেতা। তার নেতৃত্বে ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন সর্বপ্রথম আমেরিকায় দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি করে। মিল মালিকরা তাদের দাবি অগ্রাহ্য করলে মালিকদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘাত বাধে। অনেক শ্রমিক নিহত হলে মিল মালিকরা তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। আর সে থেকেই পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে।
শ্রমের মর্যাদা রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে রক্ত দিয়েছে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ। তাই দিনটি শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের মহান দিন। নিজেদের জীবন দিয়ে তারা তাদের দাবি আদায় করেছে। তবুও প্রভুদের কাছে শোষকদের কাছে তারা মাথানত করেনি। মানুষের দাবি বা অধিকার ড়্গুণ্ন হয়, তখন মানুষ প্রতিবাদে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রক্ত দিয়ে সে দাবি প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্বে এর অনেক নজির রয়েছে। তবে মহান মে দিবস তার অন্যতম। শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান বিষয় ছিল শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ। অর্থাৎ শ্রমিকরা তাদের মজুরির বিনিময়ে দৈনিক কত ঘণ্টা শ্রম দেবে, তা নির্ধারণ ছিল না।
শ্রমিকরা দৈনিক যত পরিশ্রম করত, মজুরি দেয়া হতো তার চেয়ে কম। তাই শ্রম নির্ধারণ ও শ্রমের বিনিময়ে যথার্থ মজুরির দাবিই ছিল শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান বিষয়। ইতোমধ্যে মে দিবস পেরিয়েছে ১২৬ বছর। এত বছর পরও শ্রমিকরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। আজো সমাজে তাদের অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো দেশে দেশে শ্রমিক শোষণ চলছে।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে চায়। এ নিয়ে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় দ্বন্দ্ব দেখা যায়। তাছাড়া আমাদের দেশে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। এসব নারী ও শিশু বিভিন্ন কল-কারখানা, বিশেষ করে গার্মেন্ট শিল্পে তারা বেশি কাজ করে থাকে। অথচ আমাদের সংবিধানে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। তথাপি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেও তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই আবার জীবনঝুঁকির মধ্যেও পড়ে যাচ্ছে। মারাও যাচ্ছে অনেক শ্রমিক।
বাংলাদেশের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারণে তারা শারীরিক-মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। শিক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা হচ্ছে বঞ্চিত। এসব শিশু স্নেহ-ভালোবাসার অভাবে এক সময় অপরাধ জগতে পা বাড়ায়। তাছাড়া প্রায় প্রতি বছর গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোয় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব দুর্ঘটনায় অনেক নারী-পুরম্নষ-শিশু মারা যায়। দুর্ঘটনায় যেসব শ্রমিক মারা যায়, তাদের পরিবারের রম্নটি-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তারা চোখেমুখে অন্ধকার দেখে। সমাজে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের বেতন-ভাতাদি তো বাড়ছে না। ফলে সমাজের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত নাগরিকের জীবনের মতো তাদের জীবনেও নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়, হতাশা। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টর ও সংস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিটি পেশার মানুষ ও শ্রমিককে তাদের প্রাপ্ত মর্যাদা ও অধিকার দিতে হবে।
আসলে আমরা শ্রম বা শ্রমিকের মর্যাদা বুঝেও বুঝতে চাই না। একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসাথ এসবই একজন শ্রমিকের প্রাপ্য। আর এটাই হচ্ছে শ্রমিকের প্রকৃত মর্যাদা। একুশ শতকে এসে শ্রমিকরা এর কতটুকু মর্যাদা বা অধিকার ভোগ করছে? বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ শ্রমিকরা এ দেশের সম্পদ। তাদের কারণেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। এ কারণে তাদের অবহেলার চোখে দেখা ঠিক নয়।
শ্রমের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দৃঢ় ঐক্য ও আপসহীন শ্রমিক আন্দোলনের বার্তা নিয়ে আসে মহান মে দিবস। বর্তমান সরকার দেশের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী/কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর কল্যাণে স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিলেও আশানুরূপ ফলাফল শ্রমিকরা পায়নি। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২৮% শহরে, ৭২% গ্রামে বাস করে। গ্রামে বসবাসরতদের প্রায় অধিকাংশ কৃষি বা কৃষিজ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিধায় দেশের ৪৭% শ্রমশক্তি সরাসরি কৃষি এবং ৮০% প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষি সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত। বাকিরা শিল্প-সেবাসহ অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। দেশের অর্থনীতির আকার, খাত ও প্রকৃতি সম্প্রসারণমুখী হলেও তা শিল্পমুখী না হওয়াতে অধিকাংশ শ্রমশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত তথা কৃষিনির্ভর শ্রম বাজারের বেড়াজালে ঘুরপাক খাচ্ছে। শিল্পখাতে শিশুশ্রমের হার হ্রাস পেলেও এই খাতে নারী শ্রমশক্তির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ দেশের জিডিপি, নারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, বেকারত্ব, হ্রাসে জন্মনিয়ন্ত্রণ, বাল্যবিবাহ, অপুষ্টি, দারিদ্র্য অশিক্ষার হার হ্রাসে ব্যাপক অবদান রাখছে। তবে কৃষিখাতে তথা গ্রামীণ জনপদ ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ও অবস্থান বৃদ্ধির হার উৎসাহব্যঞ্জক হলেও শিশু শ্রম হ্রাসের হার সনেত্মাষজনক নয়। ২০ বছর আগেও দেশের অর্ধেক নারী জনশক্তির প্রায় ৮৫% অন্দরবাসিনী বা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে থাকলেও রাজনীতি, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, সংবাদ মাধ্যম, শিল্পে-বাণিজ্যে স্থাপিত সেবা খাতসহ অন্যান্য গুরম্নত্বপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ভারি কাজে (নির্মাণ, মাটিকাটা) তথা আমাদের শ্রম বাজারে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ও উপস্থিতি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে দেশের শ্রম প্রশাসন ও শ্রম ব্যবস্থাপনাকে শুধু পুরম্নষবান্ধব নয় নারী বান্ধব হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিগত ও আইনি কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন সাধনের কোনো বিকল্প নেই। কারণ কর্মজীবী নারীদের এখন শুধু সাধারণ শ্রমিকের মতো করে নয়, নারীদের দৈহিক, মানসিক প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি তাদের জীবনের কিছু অনস্বীকার্য দিকগুলোকে বিবেচনায় রেখে নীতি ও আইনের উপযুক্ততা সম্পর্কে সিদ্ধানেত্ম উপনীত হতে হবে। নারীরা কখনো শ্রমিক, কখনো সাধারণ মা, কখনো গর্ভবতী নারী, কখনো দুগ্ধজাত সনত্মানের মা, কখনো গৃহিণী। পুরম্নষের চেয়ে নারীদের শোভন কর্মপরিবেশসহ পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেশি হলেও দেশে যে সমসত্ম সেক্টরে শ্রম আইনের অবস্থান দুর্বল বা অনুপস্থিত সেসব সেক্টরেই নারী শ্রমিকদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বেশি। যে কারণে অন্যায্য মজুরি, অনিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা, পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিসহ অন্যান্য ন্যায্য প্রাপ্যতার সঙ্কটে দেশের নারী শ্রমিকরাই বেশি ক্ষত-বিক্ষত ও ক্ষতিগ্রসত্ম হচ্ছে। এছাড়াও সংখ্যার অনুপাতে দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ ও অবস্থান ভীষণ দুর্বল।
বর্তমান সরকার বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে শ্রমিক কল্যাণ ও অধিকার বাসত্মবায়নের ক্ষেত্রে কিছু যুগানত্মকারী ও সাহসী সিদ্ধানত্ম জাতিকে উপহার দিলেও শ্রমিকরা এখনও সুফল ভোগ করতে পারেনি। বিশেষ করে সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা ও মজুরি ৮০%-১০০% বৃদ্ধি করা, বেসরকারি খাতের গার্মেন্টসহ ১৫টি সেক্টরে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা, পে-কমিশন ও মজুরি কমিশনের ঘোষণা একসঙ্গে বাসত্মবায়ন করা, চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা, চার বছরে সরকারি খাতে প্রায় ৫.৫০ লাখ, প্রবাসে ১৪ লাখসহ সারাদেশে প্রায় ৬০ লাখের অধিক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, ওএমএস, ফেয়ার প্রাইজ কার্ড, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প গ্রহণ, কর্মজীবী মায়েদের জন্য মাতৃত্ব কল্যাণ ভাতার ব্যবস্থা করা, সারাদেশে প্রায় ১৩,৫০০ হেলথ কেয়ার ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র খেটে খাওয়া অসহায় মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া, বিনামূল্যে বই ও উপবৃত্তির মাধ্যমে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সনত্মানদের শিক্ষা সহায়তা দেয়া, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা ঠএউ, ঠএঋ, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ ৮০% ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় বরাদ্দ করা, ন্যাশনাল সার্ভিস স্কিম চালু, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ সহায়তাসহ দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া, শিশু শ্রম নিরসনে শিশু শ্রমনীতি প্রণয়ন, গৃহ শ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা, জাতীয় শ্রমনীতি প্রণয়ন, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন’ ২০০৬-এর সংশোধন, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর সংশোধন, শ্রম প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো, আনত্মর্জাতিক শ্রম বাজারের সম্প্রসারণ ও সুষ্ঠু সংরক্ষণসহ তত্ত্‌বাবধানের ব্যবস্থা করা, কল্যাণকর নিরাপদ অভিভাসনের জন্য প্রবাসী ব্যাংক স্থাপনসহ বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি।
শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন-২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর সংশোধনী কার্যক্রমের গতি সনেত্মাষজনক না হলেও কার্যক্রমটি পথভ্রষ্ট হয়নি, বরং শুরম্ন থেকেই এই কার্যক্রম সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধ দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালে দেশের শ্রম আইন প্রণয়নের কাজ হাতে নেয়া হয়েছিল এবং ২০০৬ সালে একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শ্রম সম্পর্কিত ৫০টি আইন বাতিল করে ত্রুটিপূর্ণ ৩৫৪ ধারা বিশিষ্ট সীমাবদ্ধ ও দুর্বল একটি শ্রম আইন তৎকালীন সরকার জাতীয় সংসদে পাস করেছিল। ফলে ওইদিন সংসদ থেকেই আইনটিকে কালো আইন হিসেবে আখ্যায়িত করে দ্রম্নত পুনর্বিবেচনার দাবি পুনঃউত্থাপিত হয়। বিগত নির্বাচনে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অঙ্গীকার ছিল আইনটি যুগোপযোগী করার। এ অঙ্গীকার বাসত্মবায়নের সরকার শুরম্নতেই শ্রম প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে শ্রম আইন সংশোধনের যে কমিটি গঠন করেছে তার কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং কাজটি যত দ্রম্নত শেষ করা যাবে, শ্রম সেক্টরে তত দ্রম্নত একটি জাতীয় আইনের অগ্রগতি সাধিত হবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে, শ্রম আইন সংশোধন হলেই কি দেশে শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ কর্মের জন্য আইনি কাঠামো বিনির্মাণের কাজ শেষ হয়ে যাবে? আমি তা মনে করি না। তারপরও বৃহত্তর শ্রমিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণমূলক অনেক কর্মকৌশলের কাজ বাকি থেকে যাবে, যা পূরণের জন্য সংশোধিত আইনের বাসত্মবায়নসহ নতুন আইন ও নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাবে।
বাহ্যিকভাবে দেখা না হলেও দেশের অধিকাংশ শ্রমশক্তির উপস্থিতি বা অবস্থান এখন অপ্রাতিষ্ঠানিক/অসংগঠিত খাতে বিদ্যমান। শতকরা হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ৯২% এবং ৮% সংগঠিত বা প্রতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। যেহেতু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত শ্রম আইনের দ্বারা সুরক্ষিত নয় সেহেতু সরল হিসেবে বলা যায়, দেশের অধিকাংশ শ্রমশক্তিই শ্রম আইনের প্রতিকার বা সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।
সেখানে দেশের মোট শ্রমশক্তির সবচেয়ে দুর্বল, অদক্ষ ও অসচেতন (নারী-শিশু-অদক্ষ) অংশের অবস্থান। ১৯৯৬ সালের হিসাবে দেখা গেছে, দেশের মোট শ্রমজীবীর ৩২% আত্মকর্মসংস্থান, বেতনবিহীন পারিবারিক শ্রমজীবী ১৮% দৈনিকভিত্তিক মজুরিতে নিয়োজিত, ১৩% বেতন/মজুরি কাঠামোর আওতায় নিয়োজিত থাকে। আরেক হিসাবে দেখা গেছে, কৃষি, বনজ ও মৎস্য খাতে কর্মরতদের প্রায় ৯৮% অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আওতায়। ২০০৮ সালে প্রকাশিত বিবিএসের লেবার কোর্স সার্ভের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের মোট শ্রমশক্তি ৪.৯৬ কোটির মধ্যে ৩.৭৩ কোটি পুরম্নষ এবং ১.২৩ কোটি নারী যাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োগ পায় পুরম্নষ শ্রমশক্তির ১৩.৪০% এবং নারী শ্রমশক্তির ৮.৭১% মোট ১২.২৯%। পক্ষানত্মরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োগ পায় পুরম্নষ শ্রমশক্তির ৮৬.৬০% এবং নারী শ্রমশক্তির ৯১.২৯% মোট ৮৭.৭১%। দেশের অন্যান্য এলাকায় ঢাকা শহরের চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বেশি শ্রমশক্তি নিয়োগ পায় যার অনুপাত যথাক্রমে ৮ঃ৬। ২০০৮ সালে ওখঙ-এর ১টি প্রতিবেদনে দেখা যায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রম আইনের সুরক্ষা না থাকায় নারী শ্রমিকরা পুরম্নষের তুলনায় ২১% কম মজুরি পায়। কিন্তু পুরম্নষের চেয়ে তাদের কর্মঘণ্টা বেশি যা দিনে ১৬ ঘণ্টা হওয়ায় তারা অবসর নেয়ার সময়ই পায় না। ওই প্রতিবেদনে নারী শ্রমশক্তির কাজের অর্থনৈতিক মূল্য ৭০-৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বলে উলেস্নখ করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৫০ কোটি শ্রমশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত রয়েছে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে প্রায় ৬০% এর অধিক শ্রমশক্তি এ খাতে কর্মরত থেকে মোট উৎপাদনের (এউচ) প্রায় ৪০% জোগান দিয়ে থাকে। প্রতিযোগিতাময় বিশ্বের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত এখন একটি গণতান্ত্রিক দেশের জাতীয় অর্থনীতির অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ সেক্টরে কর্মরত শ্রমশক্তির মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ চিনত্মা অত্যাবশ্যকীয় রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ খাতের গুরম্নত্ব এবং অসিত্মত্ব আরো ব্যাপক বিধায় কোটি কোটি শ্রমশক্তিকে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের চিনত্মা এখন সময়ের দাবি।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে দেশের প্রায় অধিকাংশ শ্রমশক্তি তাদের জীবনের মূল্যবান শ্রমের আইনগত সুরক্ষা পায় না। এ কারণে শ্রম আইন প্রণয়নের পরিচালনার পাশাপাশি আইনের সুফল বা প্রতিকার কিভাবে এ আইনের ভোক্তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া যায় সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের একটি গুরম্নত্বপূর্ণ কর্তব্য। দেশে দারিদ্র্যের হার কমে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে, গড় আয়ু বাড়ছে, মাথাপিছু আয়ের হার বাড়ছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই কারণে মানুষের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সার্বিক সক্ষমতা উলেস্নখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কারণে দুর্বল মানুষ সবল, অসচেতন মানুষ অধিকার সচেতন হয়ে নিজেদের দেনা-পাওনার হিসাবের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। সব ধরনের কাজের সঙ্গে লিঙ্গ, বর্ণ ও শ্রেণী নির্বিশেষে শ্রমশক্তির সম্পৃক্ততা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধির হার অত্যনত্ম আশাব্যঞ্জক হলেও কাজের মজুরি ও অন্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বিরাজ করছে তা অগ্রহণযোগ্য এবং উদ্বেগজনক। এ বৈষম্য দূরীকরণের জন্য আইনগত কাঠামো প্রণয়ন করা এবং তা কার্যকরের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। তাই দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের জন্য ন্যূনতম অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা আইনগতভাবে নিশ্চিত করতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

(লেখকঃ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট)

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত