বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সাকার যত ফাঁকা বুলি…



saka2নিউজ ডেস্ক:: বিভিন্ন সময় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও দম্ভোক্তি করে সমালোচিত হন যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। স্পর্শকাতর নানান বিষয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসি-ঠাট্টা-তামাশা করে বিএনপির এই নেতা নিজের বিকৃত রুচির পরিচয়ও তুলে ধরেছেন।

সাকা চৌধুরীর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ থেকে রেহাই পাননি তার নিজ দলের প্রধান খালেদা জিয়াও। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন তিনি।

দাম্ভিক সাকা চৌধুরী বিচারের প্রতিটি পর্বে নিজের অতীত ও বর্তমান নিয়ে বড়াই করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিকেও করেছেন কটাক্ষ। অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা তার স্বভাবেরই অংশ।

সাকা চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর।

একই বছরের ২৯ অক্টোবর খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেন তিনি। রায় পড়ার শুরু থেকেই কখনো উচ্চ, কখনো বা নিম্ন স্বরে, হাসি-তামাশা করে কটূক্তি করেছেন সাকা চৌধুরী। রায় পড়া শুরুর এক ঘণ্টা পর আদালতকে রায় পড়া বন্ধ করতে বলেন তিনি।

রায়ের দিন বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো পড়ার দরকার নেই, এগুলো তো গত দুদিন ধরে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে।’ পরে হাসতে হাসতে বলেন, ‘যেটা পড়া হয়নি সেটা পড়েন, পড়ে চলেন বাড়ি যাই।’ এ সময় এক মিনিট বন্ধ রাখার পর আবারও রায় পড়া শুরু করেন বিচারক।

যখন চারটি অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর তখন কাঠগড়ায় বসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে ওঠেন সাকা। উচ্চস্বরে বলেন, ‌‌‌‌‌‘এ রায় মন্ত্রণালয় থেকে এসেছে। ইন্টারনেটে অনেক আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। সেজন্য আইন মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ।’

বিচারপতি রায়ের কপি পড়তে পড়তে তার অপরাধের বর্ণনার সময় সাকা চৌধুরী বলে ওঠেন, ‘ফাঁসির আদেশ দিয়ে দাও। মাওলানা সাঈদীর মতো ব্যক্তিকে তোমরা ফাঁসি দিয়েছ। আমি তো বড় গুনাহগার ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে।’

রায় পড়ার সময় জোহরের নামাজের আজান দিলে বিচারকরা রায় পড়া বন্ধ করলে সাকা চৌধুরী বলে ওঠেন, ‘সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা-বিশ্বাস বাদ দিয়ে এখন বসে বসে আজান শুনছেন?’

রায়ের এক জায়গায় বিচারপতি আনোয়ারুল হক সাকাকে পাঁচবার নির্বাচিত এমপি বললে কাঠগড়া থেকে চিৎকার করে তিনি বলেন, ‘আমি ছয়বারের এমপি। লাখ লাখ মানুষ আমার পক্ষে রায় দিয়েছেন। আজ এখানে এ তিনজন আর কী রায় দেবেন!’

রায় পড়ার সময় নূতন চন্দ্র সিংহকে বিশিষ্ট ব্যক্তি বলা হলে নিম্নস্বরে সাকা চৌধুরী ঠাট্টা করে বলেন, ‘এ্যাঁহ… বিশিষ্ট ব্যক্তি?… (প্রকাশ অযোগ্য), তিনি ওষুধ বেচতেন না, মদ বেচতেন।’

বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম দিকে ২০১১ সালে ট্রাইব্যুনালের বিচারককে হুমকি দিয়ে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘চোখ রাঙাবেন না’। ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ শুনানি চলাকালে এজলাসকক্ষেই প্রকাশ্যে এ হুমকি দেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তাকে। সাকা চৌধুরী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দুই বছর জেলে রাখছস, বাইর হইয়া নেই।’

ট্রাইব্যুনালে স্কাইপি কথোপকথন বিষয়ে চেয়ারম্যান, অপর দুই বিচারপতি এবং প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমকে নিয়ে অবমাননা ও মানহানিকর নানা আবেদন করেন সাকা চৌধুরী।

বিভিন্ন সময়ে প্রসিকিউটরদের হেয় করে কথা বলেছেন তিনি। প্রসিকিউটরকে বলেছেন, ‘পার্সিকিউটর’। ট্রাইব্যুনালে নয় দিনের সাফাই সাক্ষ্যের পুরোটাই ইংরেজিতে দেন সাকা চৌধুরী। এর সপক্ষে নিজেকে বাঙালি নয়, চাটগাঁইয়া বলে দাবি করেন তিনি। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাকে বলেন, ‘আপনি বাংলায় সাক্ষ্য দিলে এত সময় লাগত না। তার চেয়েও বেশি কথা বলতে পারতেন।’ জবাবে সাকা চৌধুরী বলেন, ‘আমি বাংলায় সাক্ষ্য দিতে পারব না, ইংরেজিতেই দেব। কারণ, আমি বাঙালি না, চাটগাঁইয়া। বাংলায় তো আমি ভালো বলতে পারতাম না। টেকনিক্যাল প্রবলেম হতো।’

এ সময় ভাষার প্রতি চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলে ওঠেন, ‘আমার মাতৃভাষা বাংলা নয়, চাটগাঁইয়া।’ ট্রাইব্যুনালের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে-বসে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও বাক্যবাণ ছুড়ে এজলাসকক্ষের পরিবেশ বেশ কয়েকবার উত্তপ্ত করে তোলেন সাকা চৌধুরী।

এর আগে সংসদে সাকা বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার এদেশে নতুন এক ধরনের ডিজিটাল মেশিন আবিষ্কার হয়েছে, যার একপাশ দিয়ে রাজাকার ঢুকিয়ে দিলে, অন্য পাশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বের হয়। আর সেই মেশিনটির নাম ডিজিটাল আওয়ামী লীগ মেশিন।’ সংসদে বক্তৃতার এক পর্যায়ে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি তো চোদনা হয়ে গেলাম।’ স্পিকার এমন অশ্লীল কথা না বলার অনুরোধ করলে তিনি জবাব দেন, ‘আমি আবারও চোদনা হয়ে গেলাম।’

সাকার আপত্তিকর মন্তব্যের শিকার হয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলায় নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, ‘আমি গ্রেনেড মারলে সেটা তো মিস হতো না।’ শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা দাবি করে তিনি বলেন, ‘ছাত্রজীবনে শেখ মুজিব আমার বাবার শিষ্য ছিলেন।’

নিজ দলের প্রধান খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করেও দলের ভেতর ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন সাকা। তারেকের কর্মকাণ্ডে খালেদার নিরব সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে সাকা বলেন, ‘আগে কুকুর লেজ নাড়াত, এখন লেজ কুকুরকে নাড়ায়।’

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) মহাসচিব পদে সাকাকে একবার প্রার্থী করা হলে সমালোচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তার উত্তরে সাকা বলেছিলেন, ‘বাবু ওআইসি নিয়ে কথা বলার কে? ওনাকে ওআইসি নিয়ে কথা বলতে হলে আমি ছোটবেলায় যে জিনিসটা কেটে ফেলে দিয়েছি আগে ওই জিনিসটা কেটে ফেলতে হবে। তারপর বাবুকে ওআইসি নিয়ে কথা বলতে বলেন।’

এমনকি একবার আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের একটি বক্তব্যের জবাবে সাকা বলেন, ‘তিনি কেরানীগঞ্জের একজন প্রমোদবালক এটা কি আমি কখনো বলেছি?’ প্রতিমন্ত্রীকে বিকৃত নামে ডাকারও ধৃষ্টতা দেখান এ যুদ্ধাপরাধী।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত