শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আমার দিন: ইনু ভাই, এই কালো কানুনটির প্রয়োজন আছে কি?



130910151440_hasanul_huq_inu_304x171_bbc_nocreditপ্রিয় ইনু ভাই,
মূল লেখায় যাওয়ার আগে ছোট একটা গল্প বলে নেই। ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির ঠিক পাশেই খুব পুরনো বিখ্যাত একটি শহর আছে, যার নাম ওকল্যান্ড। গত বছর একবার যেতে হয়েছিল ওই শহরে। ঢাকা থেকে কিছু অতিথি এসেছিলেন। তাদের দেখতে গিয়ে, ডিনার সেরে আড্ডা মেরে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুক ধড়ফড় করে উঠল। দ্রুত বিদায় নিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করলাম। ফিরব আরেক বন্ধুর বাসা স্যান হোজেতে।
আমি একা। গাড়িতে জিপিএস আছে। যেহেতু শহরটিতে আমি খুব একটা যাই না, তাই রাস্তাঘাট চেনার জন্য জিপিএসই ভরসা। বন্ধুর বাসার ঠিকানা আগেই ঢোকানো ছিল। সেটা ঠিক করে নিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করি। আমি বার বার ভাবছিলাম, কোনভাবে যদি হাইওয়ে ৮৮০-তে উঠে যেতে পারি, তাহলে আর ভয় নেই। বাকিটা আমি চিনি।
বিধি বাম হলে যা হয়। জিপিএস যেভাবে আমাকে ওকল্যান্ড শহর থেকে বের করে দিতে চাইছে, তার সবটিতেই ‘ডিট্যুর’ বসানো। রাস্তায় কাজ হচ্ছিল। তাই হাইওয়েতে ওঠার জন্য রাস্তাগুলোকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি সেই নির্দেশ ফলো করে যেদিকেই যাই, গিয়ে দেখি আরেকটা ‘ডিট্যুর’। আমি হাইওয়ের পাশ দিয়েই ঘুরছি, নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি শোঁ-শোঁ শব্দ করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু ওই হাইওয়েতে উঠতে পারছি না। রাস্তাগুলো অন্যদিকে প্রবাহিত করে দেয়া হয়েছে। জিপিএসের কাছে লাইভ ডাটা নেই। সে জানে না, রাস্তা সাময়িক পরবির্তন করা হয়েছে। তাই আমি যত দূর দিয়েই ঘুরে আসি, জিপিএস আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আরেকটি মুখে নিয়ে আসে, যার সামনে লেখা ‘ডিট্যুর’। কানাওয়ালা ধরলে যা হয়, আমারও হয়েছে একই অবস্থা।
বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে বার বার আমি নিজেকে আবিষ্কার করছি একটি পরিত্যক্ত শিল্প এলাকায়। রাস্তা জনমানবশূন্য। চারপাশে ঘুটঘটে অন্ধকার। আমার গাড়ির হেডলাইট যেন বাঘের চোখের মতো তাকিয়ে আছে ঘন কঠিন অন্ধকার জঙ্গলে। ভেতরে ভয় বাড়তে থাকে। এই নির্জন এলাকায় যদি আমি আক্রান্ত হই, তাহলে মৃত্যু অনিবার্য। ওকল্যান্ড হলো এমন একটি শহর যেখানকার কিছু এলাকায় দিনের বেলায় পুলিশ যেতে ভয় পায়। প্রতিমাসেই সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে মানুষ মারা যায়। এগুলো টিভিতে দেখে আমরা অভ্যস্ত। যে শহরের কিছু অংশে দিনের বেলাতেই নিরাপদ নয়, সে শহরের জনমানবহীন একটি পরিত্যক্ত শিল্প এলাকায় রাত বারোটার পর আমি একা, পথ খুঁজে পাচ্ছি না।
এর ভেতর গাড়ির জিপিএস কাজ করছিল না দেখে মোবাইলে ফোর-জি ব্যবহার করে গুগল ম্যাপ দেখে নেয়ার চেষ্টা করি। তাতে আমার মোবাইলের ব্যাটারি শেষের পথে। একবার ভাবলাম, পুলিশকে কল করি। কিন্তু পুলিশকে কল করতে ইগোতে বাধল। বন্ধু মুনিরকে ফোন করে বললাম, ‘তুই এক্ষুনি কম্পিউটারের সামনে বস। আমার লোকেশন থেকে দ্রুত ৮৮০-তে ওঠার ডিরেকশন দে।’ মুনির গুগল ম্যাপ দেখে দেখে আমাকে ডানে-বাঁয়ে যেতে বলে, আমি ওর নির্দেশ ফলো করে ৮৮০-তে উঠি বটে; তবে সেটা উল্টোদিকে এবং তার একটু পরেই আমার মোবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে যায়। এই যাত্রা বেঁচে গেলাম!
ইনু ভাই, বাংলাদেশে কি এমন কোন জায়গা আছে, যেখানে রাতে একা গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে ভয়ে শিউরে উঠতে হয়?
দুই.
প্রিয় ইনু ভাই, সম্প্রতি আপনার মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের সকল অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে বলেছে। অনলাইন নীতিমালার খসড়া গত ৬ আগস্ট ২০১৫ তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ওই খসড়ায় জাতীয় সম্প্রচার কমিশনের মাধ্যমে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো পরিচালনার কথা বলা হলেও এটি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তথ্য অধিদফতর এক তথ্যবিবরণীর মাধ্যমে অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করেছে, যার আবেদনের মেয়াদ আগামী ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫।
এই নিয়মের ভেতরে সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন ভার্সনকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য ‘নিউজপেপারস ওনার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (নোয়াব) এক বিবৃতিতে নতুন করে নিবন্ধন নয় বরং প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনার দাবি জানিয়েছে। নোয়াব মনে করে, ‘এই নীতিমালার সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকারসহ নতুন এই শিল্পের ভবিষ্যত জড়িত। তাই তাড়াহুড়ো না করে যৌক্তিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ও বাস্তবতার নিরিখে যে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।’ নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ছাপা পত্রিকাগুলো সরকারের সব রকম নিয়ম মেনে চলছে। সময়ের প্রয়োজনে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ছাপা পত্রিকাগুলোর অনলাইন সংস্করণ রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে দেশের পাঠক ছাড়াও প্রবাসী বাঙালীরা তাৎক্ষণিক দেশের খবরাখবর জানতে পারছেন। তাই এসব পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের জন্য আলাদা নিবন্ধন কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়; এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও নোয়াব মনে করে না।’
এখানে বলে রাখা ভাল যে, নোয়াব ছোট একটি ভুল করেছে। তারা দাবি করেছে সংবাদপত্রগুলো তাদের ছাপানো কাগজটিকেই অনলাইন ভার্সন করে থাকেন। বিষয়টি মোটেও তা নয়। প্রতিটি সংবাদপত্রের নিজস্ব আলাদা অনলাইন কার্যক্রম রয়েছে, যার সঙ্গে তাদের প্রিন্ট ভার্সনের মিল নেই। তারা তাদের ছাপানো কাগজকে অনলাইনে দেন ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি প্রিন্ট ভার্সনের বাইরেও তারা কনটেন্ট বা সংবাদ দিয়ে থাকেন। সেই হিসেবে তাদের অনলাইন ভার্সনগুলো অন্য যে কোন অনলাইনের মতোই। প্রিন্ট ভার্সনের বাইরে যে সংবাদ তারা পরিবেশন করে থাকেন, তার দায়-দায়িত্ব কে নেবে?
যদি সত্যি করেই বলতে হয়, আমি নোয়াবের কাছ থেকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা আশা করেছিলাম। তারা শুধু তাদের স্বার্থটুকুকেই দেখেছেন, তারা পুরো অনলাইন শিল্পটিকে দেখেননি। আমাদের বর্তমান বাংলাদেশে হয়ত কেউই নিজেরটা ছাড়া অন্যেরটা ভাবেন না। নোয়াব আর ব্যতিক্রম হবে কেন! তবুও বাংলাদেশের যে শিল্পটি তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কিংবা আহমেদুল কবিরের মতো লোকদের হাতে গড়ে উঠেছিল, সেই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষরা আরও বড় মাপের হবেন, আরও হৃদয়বান হবেন, আরও দূরদর্শী হবেন – সেটাই মনে মনে চাইছিলাম। আশা করেছিলাম তারা বাংলাদেশের আরও পাঁচ হাজারের বেশি ইন্টারনেট সাইটগুলোর কথা ভাববেন। আমার সব আশা পূরণ হবে, তার তো কোন কথা নেই, ইনু ভাই! তাই হয়ত এমন কষ্ট বুকে নিয়ে আপনাকে খোলা চিঠি লিখতে হচ্ছে!
তিন.
প্রিয় ইনু ভাই, ছোটবেলায় স্কুলে আপনাদের সময় দেয়ালপত্রিকা করার প্রচলন ছিল কিনা জানি না; তবে আমাদের সময় ছিল। বিভিন্ন স্কুলে দলে দলে ছাত্রছাত্রীরা তৈরি করত সেই দেয়াল পত্রিকা। আমার এখনও মনে আছে, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ার সময় আমাদের দেয়াল পত্রিকা করতে হতো। ছাত্ররা লেখা জমা দিত। সেই লেখা থেকে নির্বাচিত লেখাগুলোকে প্রকাশ করা হতো দেয়াল পত্রিকায়। সুন্দর হাতের লেখার ছেলেটি বড় মোটা কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ে দিনের পর দিন লিখত সেই লেখাগুলো। তার পাশে ইলাস্ট্রেশন। টুথব্রাশে দোয়াতের কালি লাগিয়ে কী এক অদ্ভুত উপায়ে তৈরি করা হতো এয়ার-স্প্রে। সেই হাল্কা কালির ছটায় জীবন্ত হয়ে উঠত আমাদের রঙিন পত্রিকা। তারপর সেটাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হতো প্রতিযোগিতায়। সেরা দেয়ালপত্রিকাকে পাঠানো হতো অন্য স্কুলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে।
সেই স্মৃতি মনে হলে এখনও রক্ত কেমন করে লাফিয়ে ওঠে। বন্ধুদের কালিমাখা হাত, পা, মুখগুলো এখনও চকচক করে ওঠে। স্কুলজীবন পার হয়ে যখন ঢাকা কলেজে এসেছি, তখনও আমরা দেয়ালপত্রিকা করেছি। তারপর যখন বুয়েটে এসেছি, তখনও কয়েকবার করা হয়েছিল। আজকে আমি যে টুকটাক লিখতে পারি, নিজের ভাবকে কিছুটা প্রকাশ করতে পারি, তার বীজ বুনা হয়েছিল সেই দেয়ালপত্রিকায়। হাতে করা সেই শিল্প যে দেখেনি, যে দেয়ালপত্রিকায় কাজ করেনি – তাকে সেটা লিখে বোঝানো যাবে না। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমার জীবনে দেয়ালপত্রিকা না থাকলে, আমি আজকের আমি হতাম না।
ইনু ভাই, আপনি কি খেয়াল করেছেন, আমাদের জীবন থেকে দেয়ালপত্রিকা উঠে যাচ্ছে? পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরীগুলো আর নেই। কিন্তু তাতে কি জীবন থেমে গেছে! মানুষের ক্রিয়েটিভিটি কমে গিয়েছে! মোটেও না। বর্তমানের ছেলেমেয়েরা তাদের মতো নানা বিষয় উপভোগ করছে। কিন্তু আপনি কি একটি বারের জন্য চিন্তা করে দেখেছেন, বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামে গ্রামে যে দেয়ালপত্রিকা হতো, সেটাকেই আমরা ডিজিটাল করতে যাচ্ছিলাম। আমি তো ভেবেছিলাম, আপনি যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেন, তখন এমন একটা স্বপ্নের কথাই বলেন। বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের প্রতিটি গ্রামে যদি একটি করে ডিজিটাল দেয়ালপত্রিকা থাকে, তাহলে মোট সংখ্যা হতো ৬৮ হাজার; যদি ৫টি করে হতো তাহলে ৩ লাখ ৪০ হাজার। আমাদের দেশে কি এত ইন্টারনেট সাইট আছে?
যে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলেন, যে দেশের রাষ্ট্রপতি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলেন, যে দেশের জাতীয় সংসদের স্পীকার জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কথা বলেন, যে দেশের তথ্যমন্ত্রী জ্ঞানভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখান, সেই ১৬ কোটি মানুষের দেশে সাড়ে ৩ লাখ ইন্টারনেট পোর্টাল নেই! তাহলে বর্তমান সময়ে জ্ঞান প্রবাহের আর কী মাধ্যম আছে একটু বলে দেবেন?
বাংলাদেশে এখন মাত্র হাজার পাঁচেক ইন্টারনেট সাইট আছে। তাতেই নাকি কারও কারও ঘুম হচ্ছে না। আর অন্যদিকে আমি স্বপ্ন দেখি, সাড়ে ৩ লাখ ইন্টারনেট পোর্টালের। ভুলটা আমারই হবে নিশ্চয়ই। নইলে, এত বড় গ্যাপ হবে কেন! ৩০ কোটি মানুষের দেশ আমেরিকাতে কত কোটি ইন্টারনেট সাইট আছে, তার হিসাব আপনার কাছে আছে নিশ্চয়ই। জ্ঞানচর্চা এবং তথ্যপ্রবাহ কি কেবল ধনী দেশের জন্যই প্রযোজ্য?
চার.
প্রিয় ইনু ভাই, এই নিবন্ধনের মূল লক্ষ্য হয়ত অসংখ্য ইন্টারনেট সাইটকে নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা একটা নিয়মের ভেতর আনা। যদিও বলা হচ্ছে, সরকারী বিজ্ঞাপন এবং সুযোগ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে এই নিবন্ধন কার্যকরী হবে; তবে যারা সরকারী সুবিধা নিতে চায় না তাদেরও এই নতুন নিবন্ধনের জন্য বলা হয়েছে। আর আপনি তো ভাল করেই জানেন যে, হাজার হাজার এই ওয়েবসাইটে সরকারী সুবিধা চাইলেও আপনি সবাইকে দিতে পারবেন না। এবং সবার হয়ত সেটা প্রয়োজনও নেই।
ইনু ভাই, আপনাকে আমি কাছ থেকে যতটুকু দেখেছি, তাতে আপনাকে আমার যতটা না বুয়েটের প্রকৌশলী মনে হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মনে হয়েছে সমাজবিজ্ঞানী। আপনার ভেতর একটা পরিষ্কার দর্শন আছে, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনি রাজনৈতিক মাঠে কেন কী বলেন, সেটা নিয়ে আমি লিখতে বসিনি। আমি দেখেছি, আপনি প্রযুক্তি সম্পর্কে যেমন পরিষ্কার ধারণা রাখেন, একই সঙ্গে সেই প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে কিভাবে প্রয়োগ করা যায় তা সম্পর্কেও পরিষ্কার দর্শন আপনার। তার সবকিছু হয়ত আপনি প্রয়োগ করতে পারছেন না। তবে যারা আপনাকে কাছ থেকে দেখেছে, তারা আপনার সেই জ্ঞানে মুগ্ধ হবে। আপনার মতো একজন সমাজবিজ্ঞানীকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, আমরা কি দেয়াল-পত্রিকাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতাম? কিংবা করতে চাইতাম? এমনকি তারা কী লিখল, সেগুলো নিয়ে এত মাথা ঘামাতাম?
একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আপনি জানেন যে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে তাদের ভাব প্রকাশের সুযোগ দিতে হয়। এটা হলো এক ধরনের ভেন্টিলেশন। এই ভেন্টলেশনটুকু না থাকলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে বলে মানুষ মনে করে এবং আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ওই দেয়াল পত্রিকাগুলোয় নানা ধরনের রাজনৈতিক ক্যারিকাচার, ঠাট্টা-তামাশা, কবিতা, ছড়া ইত্যাদি দ্বারা কত সমৃদ্ধ থাকত। তার সবকিছু কিন্তু আমরা সিরিয়াসলি নিতাম না। যদি আমরা তখনি গলা চেপে ধরতাম, তাহলে তাদের ব্রিদিং স্পেস নষ্ট হয়ে যেত। আমরা সেগুলোকে হাল্কাভাবে নিয়ে মানুষকে ব্রিদিং স্পেস দিয়েছি এবং তাতে সমাজে মঙ্গল হয় বলেই সমাজবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন।
আমি নিশ্চিত, আপনি বাংলাদেশের মানুষের গলা চেপে ধরার বুদ্ধি করছেন না। আপনি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন না। আপনি আসলে ভাল একটা মনিটরিং চাইছেন, যেন ব্রিদিং স্পেসের নামে কেউ সমাজের ক্ষতি না করে, সমাজকে উসকানিমূলক কিছু না করে ফেলে; সমাজে অস্থিরতা তৈরি না করে। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্বও সেটা করা। কিন্তু বর্তমান যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেটাকে আমি মনিটরিং বলতে পারি না; সেটা আরেক ধরনের নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে, শুধু ক্ষমতাশালী ওয়েবসাইটগুলো টিকে থাকবে; বাকিগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। যেই সরকার সারাদেশে ৩ লাখের ওপর ওয়েবসাইট করে আরেকটি ক্রেডিট নিতে পারত এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আরেকটি সাধুবাদ নিতে পারত, কার বুদ্ধিতে আপনারা ঠিক উল্টোপথে যাচ্ছেন আমার মাথায় ঢুকছে না। গুটিকয়েক মানুষ অন্যায় করবে বলে পুরো সমাজকে তার শাস্তি ভোগ করতে হলে তো বিপদ, তাই না?
ইনু ভাই, ৫ হাজার ওয়েবসাইট নয়, ৫ কোটি ওয়েবসাইটও খুব সহজেই মনিটর করা সম্ভব। পরের সেকশনে আমি লিখে দিচ্ছি।
পাঁচ.
প্রিয় ইনু ভাই, মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলতে হয় এমন একটা কথা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। আমি নিশ্চিত আপনি তাতে বিশ্বাস করেন না। আপনি সমস্যার ভাল সমাধান চান। আমি আপনার অবগতির জন্য কিছু বিষয়ের অবতারণা করছি, যা আপনাকে এবং বর্তমান সরকারকে সাহায্য করতে পারে।
ক) বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট গণমাধ্যম (বা সংবাদ মাধ্যম) বলে আলাদা কোন বিষয় নেই। এটা বাংলাদেশের কিছু মাথা মোটা মানুষ অজ্ঞানতার কারণে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে প্রতিটি ওয়েবসাইটই একেকটি গণমাধ্যম। কিছু সাইট সংবাদ পরিবেশন করে, কিছু সাইট চাকরির সংবাদ দিয়ে থাকে, কিছু সাইট বিনোদন দেয়, আবার কিছু সাইট কেনাকাটার সুবিধাসহ নানা ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু সাইট বেশকিছু সেবা একত্রে মিলিয়ে দেয় – যেমন ইয়াহু, এমাজন, ফেসবুক ইত্যাদি। এরা তাদের গ্রাহককে বিভিন্ন রকমের সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। তাদের কিছু কিছু অংশ হয়ত সংবাদও পরিবেশন করে থাকে। কিন্তু গণমাধ্যম সবই। যে ওয়েবসাইট চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে, সেখানে মিথ্যা চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিলে যেমন অপরাধ, আবার একটি নিউজ সাইটে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে কাউকে ব্ল্যাকমেল করাটাও অপরাধ। কোন্ অপরাধটি বড়, সেটা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে বোঝা যাবে। কিন্তু চাকরির বিজ্ঞাপনের ওয়েবসাইটটিও গণমাধ্যম। তাই সংবাদকর্মী থাকলেই সেটা গণমাধ্যম আর সংবাদকর্মী না থাকলে সেটা গণমাধ্যম নয় – এটা সঠিক নয়। ফেসবুক এবং টুইটারে একজনও সংবাদকর্মী নেই; কিন্তু তারা এই গ্রহের সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম। সকল ওয়েবসাইটই কোন না কোন ফর্মে সংবাদ পরিবেশন করে থাকে যা সমাজের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই যদি নিবন্ধন করতে হয়, তাহলে সবাইকেই করতে হবে। আর নইলে বিশেষ কিছু এলাকাকে নিবন্ধনের জন্য বললে একধরনের কালো নিয়ম চালু হবে।
খ) আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, ইন্টারনেটে তথ্য (কিংবা সংবাদ) প্রকাশের জন্য প্রথমেই একটি ডোমেইন নিবন্ধন করতে হয়। সেখানে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সকল তথ্য দিয়েই নিবন্ধন করতে হয় এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যে কেউ চাইলেই একটা ওয়েবসাইট খুলে চালাতে পারে না। তাকে নিজের পরিচয় দিয়েই কাজটি করতে হয়। বাংলাদেশে এই কাজটি করে থাকে বিটিসিএল (ডট বিডি)। বাংলাদেশের বাইরে যারা ডোমেইন চালাতে চান, তারা সেই দেশের আইন মেনে সঠিক পরিচয় দিয়ে ডোমেইন নিবন্ধন করে থাকেন। এই পৃথিবীতে একটি ডোমেইনও পাওয়া যাবে না, যার মালিকের নাম ঠিকানা এবং তার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম আমরা জানি না। বাংলাদেশসহ প্রতিটি দেশের নিয়ম হলো, ওই ডোমেইনের অধীনে যত তথ্য থাকবে, তার দায়দায়িত্ব ওই নিবন্ধনকারীর। ব্যক্তিগত জীবনে আমার নিজের নামে অনেক ডোমেইন কেনা রয়েছে, যেগুলোয় কোন কিছু হলে আমাকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জবাবদিহি করতে হয়। আমরা কেউ আইনের বাইরে নই, মনিটরিংয়ের বাইরে নই। প্রযুক্তিগত এত সুন্দর এবং কার্যকরী ব্যবস্থা থাকার পরেও কেন আবার একটি নিবন্ধন লাগবে? এটা কি হাস্যকর একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে না? আপনি যখন কাউকে একটি ডোমেইন কেনার অনুমতি দিচ্ছেন, তখনই তো আপনি তাকে সেটা পরিচালনা করার লাইসেন্স দিয়ে দিচ্ছেন। ওখানে হলফনামায় তাকে অনেক কিছু স্বাক্ষর করতে হয়, যা আপনাকে আর নতুন করে করতে হবে না। তাহলে তাকে দুইবার লাইসেন্স নিতে হবে কেন! উন্নত বিশ্বে তো এটা করতে হয় না। টিভি-রেডিও লাইসেন্স নিতে হয় তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে, আর ইন্টারনেট ওয়েবসাইটের লাইসেন্স নিতে হয় বিটিসিএল থেকে – পানির মতো পরিষ্কার। আপনার যদি কাউকে ধরতে হয়, বিটিসিএলের ওই ডাটাবেজে হাত দিলেই তো পেয়ে যাচ্ছেন। তাহলে বিষয়টিকে এভাবে জটিল করে বিতর্কিত (এবং হাস্যকরও বটে) একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন কেন!
গ) এবার মনিটরিংয়ের কথা বলি। আপনি তো মাত্র ৫ হাজার ওয়েবসাইট নিয়ে চিন্তিত। সঠিক পদ্ধতি বসালে ৫ কোটি ওয়েবসাইটকেও প্রতিমুহূর্তে মনিটর করা যায়। এটা কোন ইস্যুই না বরং দেয়ালপত্রিকা কিংবা আন্ডারগ্রাউন্ড প্রকাশনাগুলোকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। ইন্টারনেটে লুকিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। যেই ওয়েবসাইটে আপত্তিকর কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য পাবেন, সেটার মালিককে শো-কজ করলেই তো হলো। যদি ওই ওয়েবসাইটে বেনামে কেউ কিছু লিখে থাকে, তার দায়দায়িত্বও পড়বে নিবন্ধনকারীর ওপর; কারণ তিনিই ওই সুযোগ করে দিয়েছেন। আর এটা যে বাংলাদেশের জন্য আলাদা নিয়ম তা নয়। এটাই পুরো বিশ্বের নিয়ম। মূলত, আপনি তো সেটাই চাইছেন। সেই টুলস তো আপনার কাছে আছেই।
তাই নতুন করে আর নিবন্ধন করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এরপরেও যদি সেটা করেন, তাহলে এই পৃথিবীর বুদ্ধিমান মানুষরা আপনাদের বুদ্ধি এবং জ্ঞানের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তুলতে পারে!
ছয়.
প্রিয় ইনু ভাই, লেখাটি অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে। আরও কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল, পত্রিকার পাতায় জায়গার অভাবে লিখলাম না। তবে প্রথমেই যে আপনাকে ওকল্যান্ড শহরের গল্পটা বলেছিলাম, তার প্রসঙ্গটা টেনে শেষ করি।
ইনু ভাই, বাংলাদেশে এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে রাতে একা গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে ভয়ে শিউরে উঠতে হয়; কিন্তু আমেরিকাতে আছে। লস এ্যাঞ্জেলেস শহরে, খোদ নিউইয়র্কে এমন জায়গা আছে যেখানে আত্মাটুকু নিজের হাতে নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু তারপরেও সবাই আমেরিকায় গিয়ে থাকতে চায়; নিজেকে নিরাপদ মনে করে। আপনার সঙ্গে যারা রাজনীতি করেন তাদের ছেলেমেয়েদের দেখুন। তারা আমেরিকাকেই নিরাপদ মনে করছেন। আমি তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বলতে পারব, সারাবছর আমেরিকাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়, বাংলাদেশে তত হয় না। ওকল্যান্ড শহরের মারামারি কেন পাশের শহর সিলিকন ভ্যালিকে প্রভাবিত করে না? কেন মানুষ আতঙ্কিত হয় না?
এর মূল কারণ হলো, ওই দেশের প্রশাসন তাদের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোকে আলাদা করে ফেলেছে। তারা পুরো সমাজে সেটা ছড়িয়ে দেয়নি। যারা মারামারি করে, তাদের চিহ্নিত করে এমনভাবে আলাদা করে রেখেছে যে, ওই এলাকার বাইরে অন্য নাগরিকরা নিরাপদ। কিন্তু আমরা সেটা পারিনি। আমরা ভয়টাকে পুরো দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছি। কিছু মানুষ সন্ত্রাস করে, আর পুরো দেশের মানুষ তার জন্য ভোগে।
ইনু ভাই, আপনিও সম্ভবত একই কাজ করতে যাচ্ছেন। একটা ভয় পুরো তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানুষের ওপর ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। আমরা কয়টা ওয়েবসাইটকে নিয়ে চিন্তিত বলতে পারেন? একটিও না। তবুও একটা কালাকানুন করতে হবে! ইনু ভাই, আপনি কি একটি বারের জন্য দেখলেন না, এই হাজার হাজার ওয়েবসাইট যারা চালায় তারা ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর মানুষ হয়ে উঠছে। তারা সেই রিমোট এলাকাতে বসেই শিখে ফেলেছে কিভাবে একটা ডোমেইন রেজিস্ট্রেশন করতে হয়, কিভাবে হোস্টিং করতে হয়, কিভাবে সাইট পরিচালনা করতে হয়। এই জ্ঞানটুকু আছে বলেই তারা সেই গ্রামে বসেও আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে পারে। কাজটি তারা মাত্রই শিখেছে বলে অনেকে ভুল করে ফেলে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দেখবেন তারা আরও পূর্ণতা পাচ্ছে। আর আপনি সেই প্রক্রিয়াটুকুকে বন্ধ করে দিতে চাইছেন! কার বুদ্ধিতে!
প্রিয় ইনু ভাই, আমি আগেই বলেছি, আপনাকে আমার টিপিক্যাল প্রকৌশলীর ধ্যান-ধারণার মানুষ যেমন মনে হয় না, তেমনি আপনাকে প্রচলিত ধারার পুরনো চিন্তার মানুষও মনে হয়নি। একজন ভাল রাজনীতিবিদের সফলতা হলো তার কিছু সিদ্ধান্ত পরের সমগ্র জাতিকে উপকৃত করে। আপনার এই সিদ্ধান্তটি পুরো জাতির ওপর একটি ‘ভয়’ চাপিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি জানি না, আপনার মতো একজন প্রজ্ঞাবান মানুষকে কে বা কারা এমন বুদ্ধি দিয়ে উল্টোপথে পরিচালিত করতে পারে!
তাই আপনার প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ রইল, আপনি অতি সত্বর এই কালো নিয়মটি বন্ধ করে দেবেন এবং বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামে কিভাবে সাড়ে তিন লাখ ওয়েবসাইট বানানো যায়, সেই লক্ষ্যে মাঠে নেমে যাবেন। আপনার মুখেই শুনেছি, মানুষকে অন্ধকারে রাখাটা বিপদ; মানুষ আলোতে বেশি নিরাপদ। আপনি মানুষকে আলোতে আনার ব্যবস্থা করুন, অন্ধকারে নয়।
ভাল থাকবেন, ইনু ভাই। এই কথাগুলো আমি আপনার অফিসে গিয়েও বলে আসতে পারতাম। তবে পত্রিকায় লেখার যেহেতু একটা রীতি আছে, তাই সেটা কাজে লাগালাম। ছোট ভাই হিসেবে হয়ত অনেক উল্টাপাল্টা লিখে ফেলেছি। সেগুলো বড় ভাই হিসেবে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। এখানে আমার নিজের কোন স্বার্থ জড়িত নেই। এই দেশের কোটি কোটি মানুষ জ্ঞাননির্ভর, তথ্যনির্ভর সমাজে বেড়ে উঠুক, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই বিশ্বের নাগরিক হয়ে গড়ে উঠুক – এটুকুই চাওয়া। সেটা তো আপনারও চাওয়া- তাই না?
লেখক:জাকারিয়া স্বপন, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত