মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

৪০০ ফাঁসি দেওয়া এক জল্লাদের জীবন



full_1224233654_1448964092নিউজ ডেস্ক: ১৯৬৫ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মৃত্যুদণ্ডের বিধান স্থগিত করার পর ব্রিটেনে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে দেশটিতে প্রচুর মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলানো হতো।
১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত ব্রিটেনে ফাঁসি কার্যকরের জন্য সবচেয়ে পরিচিতি পাওয়া জল্লাদ ছিলেন আলবার্ট পিয়েরপেয়ন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির দু’শতাধিক যুদ্ধাপরাধী ও ব্রিটেনের অনেক কুখ্যাত খুনিসহ চার শতাধিক লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন তিনি।
আলবার্টের কাছে ফাঁসি দেওয়ার কাজটা ছিল পারিবারিক পেশার মতোই। তার বাবা-চাচাও ছিলেন সরকারের তালিকাভুক্ত জল্লাদ। বাংলাদেশে জল্লাদ হয়ে থাকেন ভয়ংকর কোনো খুনি বা দাগী আসামি।
কিন্তু আলবার্ট তেমনটা নয়। তার পেশা ছিল ফাঁসি কার্যকর করা। বিনিময়ে পেতেন অর্থ। পাশাপাশি মুদি ও মদের দোকানও ছিল আলবার্টের।
তার জন্ম ১৯০৫ সালে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে। ক্লাসে একদিন শিক্ষার্থীদের নিজের লক্ষ্য লেখতে বলেন শিক্ষক।
সবাই দ্রুত লিখতে শুরু করলেও আলবার্ট কী হতে চান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে জল্লাদ হওয়ার বিষয়টি জীবনের লক্ষ্য হিসেবে লেখেন।
আলবার্ট বাপ-চাচার পথ অনুসরণ করে জল্লাদ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করার সুযোগ পান ১৯৩২ সালে। এ কাজের জন্য ব্রিটিশ সরকার তার সাক্ষাৎকার নেয়। পরে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্স করেন। তারপর সহকারী হিসেবে জল্লাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
জল্লাদের কাজ কড়া গোপনীয়তার রক্ষা করতেন আলবার্ট। এমনকি তার স্ত্রীকেও এ ব্যাপারে বলেননি। তবে পরে সেটা বুঝতে পেরেছিলেন তার স্ত্রী।
আলবার্ট প্রধান জল্লাদ হিসেবে প্রথম ফাঁসি দেন ১৯৪১ সালে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ফাঁসি কার্যকরে অত্যন্ত দক্ষ তিনি। তবে বলতেন, তাদের অপরাধ যাই হোক দণ্ড কার্যকরের সময় তাদের সঙ্গে সবসময়ই সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতেন।
ফাঁসি দেওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত শান্ত থাকতেন, তার আচরণ ছিল নম্র এবং ব্যাপারটা সেরে ফেলতে পারতেন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।
মৃত্যুর আগে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের কারাগারে যেতে হতো বিকেল ৪টার দিকে। সেখানে আমাদের গভর্নরের সঙ্গে দেখা হতো, তার সঙ্গে কথাবার্তা সেরে নিতে হতো। এরপর ফাঁসির নানা আয়োজন সম্পন্ন করা, ফাঁসির মঞ্চটি প্রস্তুত করা, এসব করতে হতো।’
দণ্ডিত ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকরে কত সময় লাগে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা নির্ভর করে কোন কারাগারে ফাঁসিটা হচ্ছে। কোনো কারাগারে কনডেমড সেল থেকে ফাঁসিমঞ্চ খুবই কাছে, কোনোটাতে হয়তো তা জেলের আরেকপ্রান্তে। এমনও হয় যে ফাঁসির ব্যাপারটা মাত্র ১৬ সেকেন্ডে শেষ হয়ে যায়।’
ব্রিটেনের সবচাইতে কুখ্যাত খুনিদের ফাঁসি দিয়ে এক নম্বর জল্লাদ হিসেবে ইতিমধ্যে নাম লিখিয়েছেন আলবার্ট।
তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকার যখন ঘোষণা করলো যে প্রায় ২০০ দণ্ডিত নাৎসি যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য তাকে জার্মানি নিয়ে যাওয়া হবে তখন ব্রিটেনে তার খ্যাতি আরো ছড়িয়ে পড়ল।
আলবার্ট সবসময় জোর দিয়ে বলতেন, ‘মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কোনো রকম আবেগ প্রকাশ করতাম না।’
একবার একজন পরিচিত লোকের ফাঁসি কার্যকর করেছিলেন। তার মদের দোকানের ক্রেতা হিসেবে আসতেন তিনি। আলবার্ট বিষয়টি জানতেন না। ফাঁসি কার্যকর করতে গিয়ে লোকটি তাকে চিনে ফেলেন।
১৯৫৬ সালে আলবার্টের সঙ্গে পারিশ্রমিকের পরিমাণ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবাদ হয়, তিনি পদত্যাগ করলেন। আর কখনো ওই চাকরিতে ফেরেননি।
জল্লাদের কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পর আলবার্ট তার মদের ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৯২ সালে মারা যাওয়ার আগে গড়ে যান ইতিহাস।
আলবার্ট পিয়েরপেয়ন্ট তার পেশাদার জল্লাদের জীবনে চার শতাধিক লোককে ফাঁসি দিয়েছিলেন। তার মধ্যে নারী, পুরুষ, তরুণ, বৃদ্ধ সব রকমের মানুষ ছিলেন।
খবর বিবিসির।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত