রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ভারতের কাছ থেকে ১৯৪ একর জমির দখল পেলো বাংলাদেশ : পাল্লাথল সীমান্তে নতুন ছিটমহল সৃষ্টির আশংকা



imagesনিউজ ডেস্ক:: ভারত সীমান্তবর্তী মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার বিরোধপূর্ণ ও অপদখলীয় ভূমির শান্তিপূর্ণ সমাধান হলেও নতুন ছিটমহল সৃষ্টির আশংকা দেখা দিয়েছে।
জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী (১২০ একর) এবং পাল্লাথল (৩৬০ একরের মধ্যে ৭৪ একর) সীমান্তে বিরোধপূর্ণ ও অপদখলীয় ১৯৪ একর জমির মালিকানা পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে সরেজমিনে পাল্লাথল চা বাগানের ১৩৭০/৩ নং সাবপিলার ও ১৩৭১/৬ নং খুঁটির মধ্যবর্তী জমি ভারতীয় জমিতে রূপান্তরিত হওয়ায় বাগানের ৩ ও ৪নং সেকশনে যেতে ভারতীয় ২০০ মিটার জমি এবং নো-ম্যানস ল্যান্ডের ১৫০ মিটার জমির ওপর দিয়ে যেতে হবে। ফলে সৃষ্টি হবে আরেকটি নতুন ছিটমহলের। প্রায় ৩০ হাজার চারা ও চা গাছ ধ্বংস হওয়ার আংশকা দেখা দিয়েছে। হ্রাস পাবে চা’র উৎপাদন। আর এতে সরকার হারাবে বিপুল অংকের রাজস্ব।
রেডকিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী, চা বাগানের ক্ষতি হয় এমনভাবে কোনো সীমানা নির্ধারণ না করে এর পাশ দিয়ে সীমানা নির্ধারণের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ১৯৭৪ সালের বিরোধীয় ভূমির সীমানা নির্ধারণে উভয় (ভারত-বাংলাদেশ) সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যে প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়, তাতেও আদিবাসী অথবা এসব বিরোধীয় ভূমিতে অবস্থিত জনগোষ্ঠির কোনো ধরণের উচ্ছেদ কিংবা ক্ষতি সাধন না করে এর পাশ দিয়ে সীমানা নির্ধারণের উল্লেখ ছিল। কিন্তু পাল্লাথল চা বাগান এলাকার সীমানা নির্ধারণে তার কোনোটিই প্রতিফলিত হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে এসব চিত্র ও ভবিষ্যতে আরেকটি ছিটমহল সৃষ্টির আভাস লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট টি কোম্পানীর এ চা বাগানটির অভ্যন্তরে থাকা পূর্ব-পুরুষের শশ্মান, খাসিয়াদের গোরস্তান এবং পানজুম, ছায়াবৃক্ষ ভারতীয় অংশে চলে যাওয়ার আশংকায় চরম হতাশায় রয়েছে এ দুই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠি। বাগানে আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বাঙালি পরিবারও রয়েছে। জমিটি ভারতের অংশে চলে যাওয়ায় বড়ো ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন এখানকার বসবাসকারীরা। কেননা বাগানের পানজুমই তাদের আয়ের একমাত্র উৎস।
এ ব্যাপারে পাল্লাথর চা বাগানের মালিক রিয়াজুর রহমানের সাথে আলাপ করলে তিনি তার বাগানের ক্ষতির কথা উল্লেখ করলেও নতুন কোনো ধরণের মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে চা-কর এসোসিয়েশনে বিষয়টি তিনি উপস্থাপন করেছেন। সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় নিতে সহানুভূতিশীল হবে বলে তিনি আশা করছেন।
ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার ডেকা এর সাথে মুঠোফোনে (৯৪৩৫১০৭৫১৪) যোগাযোগ করলে তিনি জানান, বাংলাদেশ এবং ভারতের উচ্চপর্যায়ে চুক্তিটি সম্পাদন হয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে এ নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তবে এ নিয়ে তিনি কোনো ধরণের মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমান ধর্মসচিব আব্দুল জলিল জানান, উভয় সরকারের উচ্চপর্যায়ে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। তবে পাল্লাথলের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। সুযোগ পেলে বিষয়টি নিয়ে তিনি উচ্চমহলে আলাপ করবেন বলে জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী সীমান্তে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে। এখন সেখানে নতুন করে সীমান্ত খুঁটি স্থাপন হবে। আর পাল্লাথলে সীমান্ত খুঁটি স্থাপনের স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে। সেখানে অপদখলে থাকা অংশ থেকে প্রায় ৭৪ একর ও ১২০ একরসহ সর্বমোট ১৯৪ একর জমি বাংলাদেশ পেয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ জরিপ দল সম্প্রতি লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী সীমান্তে সীমানা চিহ্নিতকরণ ও সীমান্ত খুঁটি স্থাপনের স্থান নির্ধারণের কাজও সম্পন্ন করে।
ভূমি রেকর্ড জরিপ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী সীমান্তের ১৩৯৭নং প্রধান খুঁটি থেকে ১৪০০ নং প্রধান খুঁটির ১নং আর.আই (ভারত অংশের খুঁটি) ও ২নং আর.বি (বাংলাদেশ অংশের খুঁটি) খুঁটির মধ্যবর্তী এলাকায় কোনো সীমান্ত খুঁটি নেই। সেখানকার প্রায় ১২০ একর জায়গার মালিকানা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জায়গাটি বাংলাদেশের দখলে রয়েছে।
লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী গ্রামে ৭০টি পরিবার বসবাস করে। ওই সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলা। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ জরিপ দল বিরোধপূর্ণ ওই জায়গাটি জরিপ করে। জরিপ কাজ শেষে যৌথ জরিপ দল নির্দেশক মানচিত্রে (ইনডেক্স ম্যাপ) স্বার করে। এরপর সীমান্ত প্রটোকল চুক্তি স্বারিত হয়।
চুক্তিতে বলা হয়, সীমান্ত খুঁটি না থাকায় লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী (আসাম), পশ্চিমবঙ্গের দইখাটা ৫৬ ও ত্রিপুরার মুহুরি নদী-বিলোনিয়া সীমান্তে সীমানা চিহ্নিত করার কথা বলা হয়। এর পরিপ্রেেিত লাঠিটিলা- ডোমাবাড়ীতে সীমানা চিহ্নিত করে সীমান্ত খুঁটি স্থাপনের স্থান নির্ধারণ করা হয়।
গত ২৮ ডিসেম্বর ভূমি রেকর্ড জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল জলিল সীমান্ত খুঁটি স্থাপনের জন্য বাজেট বরাদ্দ করে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেন।
সীমানা চিহ্নিত করার দায়িত্বে থাকা চার্জ অফিসার ও ভূমি রেকর্ড জরিপ অধিদপ্তরের কানুনগো আবদুল হক জানান, লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী সীমান্তে সীমানা চিহ্নিত করার পর বাংলাদেশ ১২০ একর জমি পেয়েছে। লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী গ্রামটি ওই জমির ভেতরেই পড়েছে। নতুন সীমানায় সীমান্ত খুঁটি স্থাপনে স্থান নির্ধারণের কাজও সম্পন্ন হয়ে গেছে। সেখানে বাংলাদেশ অংশে ১৪টি সীমান্ত খুঁটি স্থাপন করা হবে। এখন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এসব খুঁটি স্থাপন করা হবে।
সূত্র আরও জানায়, বড়লেখা উপজেলার পাল্লাথল সীমান্তে ৩৬০ একর জায়গা বাংলাদেশের অপদখলে ছিল। যৌথ জরিপে ওই সীমান্তের ১৩৭০ নং প্রধান সীমান্ত খুঁটির ৩নং উপ-খুঁটি থেকে ১৩৭১ নং প্রধান সীমান্ত খুঁটির ৬নং উপ-খুঁটির ভেতরে ৫৮ দশমিক ৪৪ একর এবং ১৩৭২ নং প্রধান সীমান্ত খুঁটি থেকে ১৩৭৩ নং প্রধান সীমান্ত খুঁটির ২নং উপ-খুঁটির ভেতরে ১৫ দশমিক ৬৫ একর জমি বাংলাদেশ পেয়েছে। সেখানে নতুন সীমান্ত খুঁটি স্থাপনের জন্য স্থান নির্ধারণে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ জরিপ দল কাজ সম্পন্ন করেছে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান পাল্লাথল ও লাঠিটিলা-ডোমাবাড়ী সীমান্তে খুঁটি স্থাপনে বাজেট বরাদ্দের চিঠি পাবার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, যতো দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট এলাকায় খুঁটি স্থাপনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্য কোনো বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত