সোমবার, ১২ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

একজন সুলতানা দেশের টানে বাংলাদেশে



1437742117প্রবাস ডেস্ক ::
‘আমার ঘরটি ছিল বেড়ার দুই রুমের। পাশে গ্রামের রাস্তা। শীতকালে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগতো। লোকজন প্রায়ই বাড়ির সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করতো। বলতে পারবেন ঘরটি এখন আছে কি না?’- কথাগুলো বলেই চোখের জল বেয়ে পড়ছিল সুলতানার। গত ৭ই ফেব্রুয়ারি পরিবারের স্বজনদের খোঁজে তিনি গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার খাগরিয়াতে।

সেখানে একটি বাড়িতে ঢুকে তিনি এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন লোকজনের কাছে। ভালো বাংলা বলতে পারেন না। তবুও এই ভাষা শুনলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। যখনই কোনো সুসংবাদে ভাসে বাংলাদেশ, তখনই হাজার হাজার মাইল দূরের এক দেশে বসে তার মন ভরে উঠতো খুশিতে। উদাস হয়ে যান ক্ষণিকের জন্য। কোথায় যেন অদ্ভুত একটা টান আছে দেশটির সঙ্গে। গ্রামের মেঠোপথ, শীতকালে দৌড়ে পুকুরে ঝাঁপ দেয়া, কাপড় কাঁচা, ফসলি খেতে কাদা মাখা পায়ে এপারওপার ঘুরে বেড়ানো সবকিছুই ঝাঁপসা হয়ে আসে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর মাত্র ৫ বছর বয়সে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডের এক দম্পতি। এরপর জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর যখনই জানলেন তিনি একজন বাংলাদেশি, তখনই আর ঘরে থাকতে পারলেন না। নাড়ির টানে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর ছুটে এসেছেন সেখান থেকে বাংলাদেশে। পরিবারের স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুলতা তাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তুলছিল বছরের পর বছর। জানেন বাবা-মা বেঁচে নেই। বেঁচে নেই সেই দাদিও। যিনি ডাচ দম্পত্তির হাতে তাকে দত্তক দিয়েছিলেন। তার পরও যদি কেউ বেঁচে থাকেন পরিবারের!

সেই রাস্তার ধারের জরাজীর্ণ ঘরটি। পুকুরটি। বাজার। কিংবা যদি পাওয়া যায় তারই পরিবারের কোনো সদস্যকে! বুকে জড়িয়ে ধরার বাসনা যেন ঘনীভূত হতে থাকে বিমান থেকে পা দেয়ার পর। সুলতানা ভ্যান ডি লিস্ট। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডাচ নাগরিক। ১৯৭৯ সালে শিশু অবস্থায় তিনি চলে গিয়েছিলেন প্রিয় দেশ ছেড়ে। অভাবের তাড়নায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তার ভরণপোষণ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করা দাদি রহিমা খাতুন।

শেষমেষ মেয়েটির বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে এক এনজিও কর্মকর্তার মাধ্যমে বিনা শর্তে তাকে তুলে দেন ডাচ্‌্‌ দম্পত্তির হাতে। তারা নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়ে লালনপালন করেন মেয়ের মতো। বিয়ে দেন। পড়ালেখায় শিক্ষিত করেন। সুলতানার সঙ্গে পরিবারের স্বজনদের খুঁজতে এসেছেন তার স্বামী নেদারল্যান্ডের নাগরিক ডিজাইনার ইউরি জেকব। সঙ্গে ছিল ১০ বছরের ছেলে নোয়া আবেদ নাবিলা জেকবস। কিছু স্মৃতি আর এফিডেভিট করা কাগজের একটি কপি বুকে জড়িয়ে বাংলাদেশে এসেছেন এই নারী। কিন্তু টানা দুই দিন চষে বেড়িয়েও খুঁজে পাননি তার স্মৃতির সঙ্গে মিল থাকা কোনো কিছুর।

অনেকে তাকে নিজেদের মেয়ে বলে দাবি করেন। কেউ কেউ বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তিনি তাদের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। সুলতানার যেন কিছুই মিলে না। মা-বাবার নাম মনে নেই। মনে নেই কোথায় জন্মেছেন। গ্রামের নাম-ঠিকানা চেনেন না। এফিডেভিট করা কাগজের ছোট্ট একটি ঠিকানা তাকে টেনে এনেছে নেদারল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের দোহাজারীতে জন্মেছেন সুলতানা। ব্যস এতটুকু। এরপর স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো। গত ৫ই ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় সুলতানা যান তার শৈশবের এলাকায়। সকাল ১০টা থেকে চষে বেড়ান দোহাজারী রেলস্টেশন, বেগম বাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। এখানকার স্টেশনের কথা তার মনে আছে। ৫ বছরের স্মৃতিতে দাদির সঙ্গে বাজারে আসতেন সেটিও স্পষ্ট ভাসছে। খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ স্টেশনের গায়ে দোহাজারী নামফলক লেখা দেখে তিনি দৌড়ে যান। আঙুল দিয়ে স্বামীকে দেখান ‘ইয়েস আই গট ইট।’

এরপর সেখানে কিছুক্ষণ চোখের জল ফেলেন। স্টেশন ভবন এলাকার কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন সুলতানা। আকারে ইশরায় বোঝানোর চেষ্টা করেন, তার বয়োজ্যেষ্ঠ সেই দাদির মুখের বর্ণনা। কিন্তু না কেউই যেন তার স্মৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। বেগম বাজার এলাকায় একটি পুকুর দেখে সুলতানা কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তখন তার স্বামী ইউরি জেকব চোখের জল মুছে দেন। সুলতানা তখন তার ১০ বছরের ছেলেকে দেখিয়ে বলেন, এই পুকুরের মতো আরেকটি পুকুরে আমি কাপড় কেঁচেছি। সাবান লাগাতাম। দাদি আমাকে খুব বকা দিতেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দৌড়ে লাফ দিতাম পানিতে। ৭ই ফেব্রুয়ারি আগের দিনের চেয়ে আরও বেশি আশা নিয়ে সুলতানা এবার গেলেন দোহাজারীর আরও বেশ কয়েকটি এলাকায়। পার্শ্ববর্তী সাতকানিয়ার খাগরিয়া এলাকাতেও তিনি স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়েছেন। রেলস্টেশনের পাশে আবদুস সালাম নামের এক ব্যক্তির মাটির ঘর। স্বামী, সন্তান নিয়ে সুলতানা সেখানে কিছুক্ষণ বসে কী যেন ভাবেন।
পরে সুলতানাকে একটি পরিবার তাদের সন্তান বলে দাবি করেন। মরহুম ইয়াকুব আলীর বাড়ি বলে সেখানে পরিচিত পরিবারটি। এই পরিবারের ছেলে মোহাম্মদ হোসেন, মেয়ে রোকসানা, ছোট ছেলে সেলিম সুলতানাকে দেখে তাদের হারিয়ে যাওয়া বোন বলে উল্লেখ করেন।

জানান, সে তাদের বোন মমতাজ সুলতানা। যে ৫ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সুলতানা বলেন, এই বাড়ির কোনো স্মৃতি তার মনে নেই। পরিবারের লোকজনের কথাও খুব একটা জানেন না। দোহাজারীর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বেগ বলেন, সুলতানার কাছে আরও কিছু তথ্য থাকলে হয়তো তার পরিবারের কেউ বেঁচে আছে কি না তা জানা যেতো। যেহেতেু সে বাবা-মার নাম জানে না তাই কিছুটা কঠিন। তবে আমরা স্থানীয় লোকজন তাকে সহযোগিতা করবো।

তিনি আরও বলেন, রেলস্টেশনের কাছে গিয়ে সুলতানা চিহ্নিত করতে পেরেছেন ৩৭ বছর আগে সে এখানে এসেছিল। তার দাদি এখন বেঁচে আছেন কি না তা কেউ জানেন না। দোহাজারী থেকে ঢাকায় ফেরার পথে চট্টগ্রামের ফয়স লেকে কিছু সময়ের জন্য কথা হয় সুলতানা ভ্যান ডি লিস্টের সঙ্গে। ‘কাউকে তো পেলেন না। খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এতে কী একটু মন খারাপ হচ্ছে না?’ -প্রশ্ন করতেই কিছুটা চিন্তিত সুলভে সুলতানা বলেন, কাউকে পেলাম না। এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এসে যে দুই দিন আমি গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছি, তাতে আমি নিজের দেশকে অন্যরকম জানার সুযোগ পেয়েছি। সেটা কী রকম? জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রামে গ্রামে যেসব বাড়িতে গিয়েছি সবাই আমাকে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। হয়তো বাংলাদেশের মানুষ বলেই সম্ভব। আবার কখন আসবেন? -জানতে চাইলে সুলতানা বলেন, আসবো। শিগগিরই।

বাংলাদেশি হয়ে জন্মেছি। দেশকে কখনোই ভুলবো না। আমি গর্বিত। নিজের পরিবারের কাউকে খুঁজে পাইনি তো কী হয়েছে। এদেশের মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি। তা কোনো দিন ভুলবো না। বাংলাদেশকে কি ভোলা যায়? কথায় কথায় সুলতানা জানান, পেশায় তিনি একজন স্কুলশিক্ষিকা। দত্তক দেয়া তার দাদির নাম রহিমা খাতুন। দাদার নাম কদম আলী। সালটি ছিলো ১৯৭৯। থিয়া ও ক্রিস নামের ওই দম্পতিকে বাবা-মা মনে করে তাদের পরিবারে বড় হতে থাকেন তিনি। ইংরেজি শিখলেও বাংলা ভাষার প্রতি তার রয়েছে অগাধ আগ্রহ। বাংলাদেশের স্লোব নামের একটি এনজিও সংস্থার মাধ্যমে তিনি এখানে এসেছেন। দত্তক শিশুদের নিয়ে কাজ করা সেখানকার এই সংগঠনের সঙ্গে শাপলা নামের আরেকটি সংগঠনের কার্যক্রম রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই স্বজনদের খুঁজতে আসা। সুলতানার সঙ্গে বাংলাদেশে আছেন ইসমাইল শরীফ নামের স্লোবের কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অনেকেই সুলতানাকে নিজের মেয়ে বলে দাবি করেছে। তবে কোনো কিছুই মিলে না তার সঙ্গে। কিছু মিললে হয়তো ডিএনএ টেস্ট হতে পারতো।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত