রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আইন উপেক্ষা করে তামাক কোম্পানির পক্ষে আইনমন্ত্রী



19নিউজ ডেস্ক : আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে তামাক কোম্পানিগুলোর পক্ষ নিয়েছে খোদ আইন মন্ত্রণালয়। কোম্পানিগুলোর দাবি অনুযায়ী তামাক পণ্যের প্যাকেটের নিচের অংশের পঞ্চাশ শতাংশ জায়গায় ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। অথচ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও এর বিধি অনুযায়ী সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাকপণ্যের প্যাকেটের উভয় পাশে উপরিভাগের ৫০ শতাংশে এমনভাবে মুদ্রণ করতে হবে যাতে তা স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোলে ঢেকে না যায়।

১৯ মার্চ থেকে এ আইনটি যখন কার্যকর হওয়ার কথা। ঠিক তার আগে ১৩ মার্চ সকালে খোদ আইনমন্ত্রী আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে তামাক পণ্যের প্যাকেটের নিচের অংশের ৫০ শতাংশ জায়গায় ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেয়ার ফাইলে স্বাক্ষর করেন। শুধু তাই নয়, বিষয়টি নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে তিনি ওইদিনই ব্যক্তিগত সফরে বিদেশ চলে যান। আর আইনটি কার্যকরের পরদিন অর্থাৎ ২০ মার্চ তিনি দেশে ফিরবেন বলে জানা গেছে।

তবে আইনমন্ত্রীর অনুমোদনের আগেই গত ১২ মার্চ বাংলাদেশ সিগারেট ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) কর্তৃক মোড়কের নিচের ৫০ শতাংশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সম্বলিত পোস্টার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তামাক বিক্রেতাদের কাছে দেখা গেছে। আর এতেই আইন মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ।

আর তামাক কোম্পানির পক্ষ নিয়ে শুধু দেশের আইন নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রীকেও উপেক্ষা করলেন আইনমন্ত্রী। কারণ, সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক সাউথ এশিয়ান স্পিকার’স সামিটের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধি অনুসরণ করে তামাকজাত পণ্যের মোড়কে ছবি সম্বলিত সতর্কবার্তা সংযোজন করার ঘোষণা দেন।

এদিকে আইনমন্ত্রীর এমন কাজে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো। এক বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ তুলে বলা হয়, আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে তামাক কোম্পানির সখ্যতা নতুন কিছু নয়। এর আগে তামাক কোম্পানির পরামর্শ অনুযায়ী নানা যুক্তি, নানা অজুহাতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩)এর বিধিমালা চূড়ান্ত করতে দুই বছর সময় নিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়। এবারও তারা তামাক কোম্পানিগুলোর সুবিধাকেই প্রাধান্য দিল। অথচ এই আইন এবং বিধিমালার ভেটিং করেছে আইন মন্ত্রণালয় নিজেই।

এছাড়া এই মন্ত্রণালয়ের একজন অতি ক্ষমতাধর উচ্চ পদস্থ আমলার ঘনিষ্টজন একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন। আর এজন্যই, আইনটি বাস্তবায়নের শেষ সময়ে এসে তামাক কোম্পানিগুলো মরিয়া হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে স্ট্যাম্প এবং ব্যান্ডরোল লাগানোর নির্দেশনা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ১০নং ধারার সাথে সংঘর্ষপূর্ণ, বিধায় তারা এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চায়।

এদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মোড়কের উপরের ৫০ ভাগে সচিত্র সতর্কবাণী মুদ্রিত করা হলে তা ব্যান্ডরোল দিয়ে ঢেকে যাবে। আবার সতর্কবাণীটি অক্ষুণ্ণ রাখতে তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটের পাশে লম্বালম্বিভাবে ব্যান্ডরোল লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি তথা যন্ত্রপাতিও তাদের কাছে নেই। তাই আইনজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংগঠন বিসিএমএ তামাকজাত দ্রব্যোর মোড়কের নিচের ৫০ ভাগ অংশে সচিত্র এ সতর্কবাণী মুদ্রণের দাবি তুলে।

যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশে সিগারেটের মোড়কের পার্শ্বদেশেই কোম্পানির ব্যান্ডরোল লাগানো থাকে। কারণ, তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে ছবিসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর গুরুত্ব সারাবিশ্বেই স্বীকৃত। গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক এক প্যাকেট সিগারেট ব্যবহারকারী একজন ধূমপায়ী সিগারেট কেনা ও ব্যবহার করার সময় দিনে কমপক্ষে ২০ বার, বছরে ৭ হাজার বার সিগারেটের প্যাকেটে ছাপানো ছবি দেখে থাকে। অর্থাৎ এটি এমন একটি কার্যকর এবং সরকারের জন্য সাশ্রয়ী পন্থা যা তামাক ব্যবহারের সময় প্রতিবারই ব্যবহারকারীকে তামাকের ক্ষতি সম্পর্কিত বার্তা প্রদান করতে থাকে।

এদিকে আইনমন্ত্রী তামাক কোম্পানিগুলোর পক্ষ নেয়ায় তার প্রতিবাদ জানিয়ে গত সোমবার সকাল থেকে রোডশো কর্মসূচি পালন করছে তামাকবিরোধী ১২টি সংগঠন। বিধিমালা অনুযায়ী মোড়কের উপরের ৫০ শতাংশে সতর্কবাণী বাস্তবায়নের দাবিতে তিন দিনব্যাপী চলা এ রোডশো আজ বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে। রোডশোতে অংশ নিয়েছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, এসিডি, ইপসা, সীমান্তিক, উবিনীগ, ইসি বাংলাদেশ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, নাটাব, প্রত্যাশা, এইড ফাউন্ডেশন ও প্রজ্ঞা।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত