সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আজ ‘দোলযাত্রা’ বা ‘হোলি’



37নিউজ ডেস্ক: আজ হোলি। হোলি বা দোলযাত্রা হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার শুরু হয়। এই দোলযাত্রায় সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়।

হোলি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি অন্যতম উৎসব যা সাধারণত ‘হোলিকা’ নামে পরিচিত। চৈত্র মাসের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হোলি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। একে দোল পূর্ণিমাও বলা হয়। এই উৎসবের পৌরণিক ইতিহাসও চমকপ্রদ। যুগ যুগ ধরে হিন্দু সম্প্রদায় হোলি উৎসব পালন করে আসছে। এই হোলি উৎসবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিনটি পালন করে থাকে। পৌরাণিক কাহিনীগুলোর দিকে ফিরে তাকালে এই হোলি উৎসবকে ঘিরে দুইটি উল্লেখযোগ্য কাহিনী প্রচলিত। একটি প্রহ্লাদ ও হোলিকার কাহিনী এবং অন্যটি রাধাকৃষ্ণের কাহিনী। হোলি মূলত বসন্তের উৎসব হলেও হোলিকে রংয়ের উৎসবও বলা হয়ে থাকে।

প্রহ্লাদ ও হোলিকা কাহিনী
দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুলে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে হোলিকার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি।

রাধাকৃষ্ণ কাহিনী
এটাও বেশ প্রচলিত। হিন্দু অবতার শ্রীকৃষ্ণ একদিন বৃন্দাবনে রাধা এবং তার সখীদের সঙ্গে খেলা করছিলেন। সে সময় হঠাৎ শ্রী রাধা এক বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখী হয়ে লজ্জিত হন। শ্রীকৃষ্ণের মাথায় তখন একটি বুদ্ধি আসে। তিনি রাধার লজ্জা ঢাকতে এবং বিষয়টি তার সখীদের কাছ থেকে আড়াল করতে রাধা এবং তার সখীদের সাথে আবীর খেলা শুরু করেন। তাদের সবাইকে আবীর দিয়ে রাঙিয়ে দেন। শ্রীকৃষ্ণ-শ্রীরাধা এবং তার সখীদের এই আবীর খেলার স্মরণে হিন্দু সম্প্রদায় এই হোলি উৎসব পালন করে থাকে বলে প্রচলিত।

অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক। বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’,। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে। শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে উচ্চ একতা থাম বানিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয়। পরের দিন রঙ খেলা। বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম। আর একে বলা হয় ‘চাঁচর’। এই চাঁচরেরও অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে। দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন ‘চাঁচর’ উদযাপনকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

অনেক ধর্মীয় উৎসবেই আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি ও রীতির প্রভাব দেখা যায়, হোলিও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার দোলযাত্রায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতির প্রাধান্য পায়। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন পূর্বভারতে আর্যরা এই উৎসব পালন করতেন। যুগে যুগে এর উদযাপন রীতি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন।

দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও জৈমিনি মীমাংসায় রঙ উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। এমনকি আল বিরুনির বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসব পালন করতেন।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত