মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কেউ বিষ খেলে কি করবেন



26লাইফ স্টাইল ডেস্ক: পরিবারের কারো সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ করে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে যে কেউ দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে৷ আবার কেউ মানসিকভাবে আঘাত পেয়ে রাগের বশবর্তী হয়ে জীবন ধ্বংসকারী কোন ওষুধ পান করতে পারে৷ এছাড়াও বড়দের অসতর্কতার কারণে বাচ্চারা ভুলবশত বিষপান করে। প্রায়ই বিষপানের রোগী পাওয়া যায়। যেমন- কীটনাশক পান করা, অনেক পরিমাণে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, কেরোসিন পান করা, ধুতরার বীজ খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া, কোনো ওষুধ ভুলক্রমে বেশি পরিমাণে খেয়ে ফেলা, বিষাক্ত মদ্যপান বা অতিরিক্ত মদ্যপান ইত্যাদি৷ বিষপানের রোগী দেখামাত্র বিষপানের ধরন সম্পর্কে আন্দাজ করা সম্ভব৷ সাধারণভাবে বিষপানের পর দেরি না করে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

• রোগী শ্বাস নিতে না পারলে তাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিতে হবে।
• সজ্ঞান রোগীকে সর্বপ্রথম একগ্লাস পানি বা দুধ পান করানো ভালো, কারণ এতে বিষ পাতলা হয়ে যায় ও বিষের ক্ষতির প্রভাব কমে আসে৷ শিশুদের ক্ষেত্রে আধা গ্লাসের মতো পানি বা দুধ রোগীকে পান করানো ভালো৷ অজ্ঞান রোগীকে তরল দেয়া যাবে না৷ তাকে সুবিধাজনক স্থানে শুইয়ে দিতে হবে।
• রোগীকে বমি করানো উচিত কি না, তা সিদ্ধান্ত নিতে হবে৷ কারণ সব বিষপানের পর বমি করানো যাবে না৷ রোগীর শরীরে খিঁচুনি থাকলে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রোগীকে বমি করানো যাবে না৷ কিছু বিষ যা প্রবেশের সময় মুখ, মুখগহ্বর ও অন্ননালীতে প্রদাহের বা দগ্ধতার সৃষ্টি করে অথবা ফুসফুসে প্রবেশ করে সংক্রমণের সৃষ্টি করে এরূপ বিষপানের রোগীকে কোনক্রমেই বমি করানো উচিত নয়৷ কারণ বমি করার সময় উল্লিখিত পদার্থগুলো পুনরায় ক্ষতিসাধন করে ক্ষতের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।

পোড়া ও ক্ষত সৃষ্টিকারী বিষ
• অম্ল বা এসিড।
• ক্ষার বা অ্যালকোহলিক।
• গৃহে ব্যবহৃত বিশোধক।
• গোসলখানা-টয়লেট-নর্দমা পরিষ্কারকারক বিশোধক।

প্রদাহ সৃষ্টিকারী বিষ
• কেরোসিন
• তারপিন তেল
• রঙ এবং রঙ পাতলাকারক দ্রব্য
• পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্য।

রোগী কোন ধরনের বিষ পান করেছে তা রোগীর মুখ, মুখগহ্বর ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করলে অতি সহজেই অনুমান করা যায়। পোড়া ও ক্ষত সৃষ্টিকারী বিষপানে রোগীর মুখ ও মুখগহ্বরে পোড়া ক্ষত বা ফোসকা দেখা যাবে। কেরোসিন জাতীয় বিষপানে রোগীদের শ্বাসে ওই দ্রব্যের গন্ধ পাওয়া যাবে।

৪ ঘণ্টার ভেতর বিষ খেয়ে থাকলে এবং জ্ঞান থাকলে রোগীকে বমি করানো যেতে পারে। মুখের মধ্যে আঙুল প্রবেশ করিয়ে বমি করানো যায়। খারাপ স্বাদযুক্ত ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম স্বল্প গরম দুধসহ বা স্বল্প গরম লোনা পানি পান করালে অনেকেরই সহজে বমি হয়ে যায়৷ তিতা কোন দ্রব্য মুখের মধ্যে দিয়েও বমি করানো যেতে পারে। বমি করানোর সময় বিশেষভাবে নজর দিতে হবে যেন বমিকৃত কোনো জিনিস বা পানীয় ফুসফুসে প্রবেশ না করে৷ এজন্য বমি করানোর সময় রোগীর মাথা নিচের দিকে ও মুখ পাশে কাত করিয়ে রাখতে হবে৷ হাসপাতালে রোগীকে বিষ অপসারণের ক্ষেত্রে রাইলস টিউবের (একটি বিশেষ নল) সাহায্যে করা যেতে পারে৷

বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ
কিছু বিষকে নিষ্ক্রিয় করার ওষুধ রয়েছে৷ রোগী কোন বিষ দ্বারা আক্রান্ত তা জানতে পারলে সেই বিষকে নিষ্ক্রিয় করা ওষুধ প্রয়োগ করে রোগীর অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব৷ এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে৷

কেরোসিনের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে
সাধারণত বাচ্চারা না বুঝে কেরোসিন তেল খেয়ে ফেলে৷ এ ধরনের রোগীর বমি, মুখ, শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রস্রাব ও কাপড় চোপড় থেকে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া যাবে৷ গলায় জ্বালাপোড়া ও ব্যথা থাকবে৷ পাতলা পায়খানা ও পেটে ব্যথা থাকবে৷ শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন ঘন হবে৷ বুকের মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দ হতে পারে, জ্বর থাকতে পারে৷ নাড়ি দুর্বল ও অনিয়মিত হতে পারে৷ এ ধরনের রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হবে৷ এই রোগীর স্টমাক ওয়াশ করা বা বমি করানো যাবে না । অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে, যাতে নিউমোনিয়া বা ফুসফুসে অন্য কোনো সংক্রমণ না হয়।

এসিড কিংবা ক্ষারের বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে
• রোগীকে বমি করানোর চেষ্টা করা যাবে না
• ক্ষতের ওপর প্রলেপ সৃষ্টি করে এমন খাদ্যবস্তু যেমন- দুধ, ডিমের সাদা অংশ খাওয়ানো যেতে পারে
• মুখ বা শরীরের কোনো অংশে এসিড অথবা ক্ষার পড়লে সেখানে প্রচুর পানি ঢেলে ধুয়ে ফেলতে হবে। এসিড খেলে অ্যান্টাসিড সাসপেনশন দেয়া যেতে পারে
• যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে
• ঘুমের ওষুধ বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে বমি করানোর চেষ্টা করতে হবে
• ঠিকমতো বমি করানো না গেলে স্টমাক ওয়াশ করানোর জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠাতে হবে।

প্রতিরোধের উপায়
আমাদের দেশের ক্ষেত-খামারে পোকা মারার জন্য অনেক ধরনের বিষ ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ এ ছাড়া কেরোসিন, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি দিয়ে বিষক্রিয়া ঘটতে পারে৷ দুর্ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া বেশিরভাগ বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব৷
বিষক্রিয়া চিকিৎসার চেয়ে এর প্রতিরোধ নিরাপদ এবং সহজ৷ নিজের ঘরবাড়ি, কর্মস্থলকে নিরাপদ রাখার জন্য কৃষক, কলকারখানায় ও মাঠে-খামারে নিয়োজিত কর্মী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, বাবা-মাসহ ছাত্রছাত্রী কিংবা ছেলেমেয়ে সবার ভূমিকা রয়েছে।

• যে কোনো ধরনের কেমিক্যাল বা রাসায়নিক সামগ্রী নিরাপদভাবে ব্যবহার ও নাড়াচাড়া করুন।
• রাসায়নিক সামগ্রী নিরাপদে রাখুন৷ ব্যবহার করে তা সরিয়ে নিরাপদে রেখে দিন৷ শিশুর নাগালের বাইরে কীটনাশক, ওষুধ ও পরিষ্কারকরণ সামগ্রী (ডেটল, স্যাভলন ইত্যাদি) রাখুন।
• আপনার প্রয়োজন নেই, এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থ ঘরে রাখবেন না।
• খাবার জিনিসের কোনো পাত্রে রাসায়নিক সামগ্রী রাখবেন না৷ ভুলবশত কেউ খাবার কিংবা পানীয় মনে করে খেতে বা পান করতে পারে।
• যথাযথ পরিমাণ ও যথাযথভাবে কীটনাশক, ওষুধ ও পরিষ্কারকরণ সামগ্রী ব্যবহার করুন৷ গায়ে আঁটা লেবেল পড়ে নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করুন৷ পড়তে না পারলে অন্য কারো সাহায্য নিন। লেবেলহীন পাত্র থেকে রাসায়নিক সামগ্রী ব্যবহার করা বিপজ্জনক। প্রয়োজনে দোকান থেকে লেবেলসহ সামগ্রী বদলিয়ে নিন।
• ওষুধ সেবন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে রেজিস্টার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত