শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সেই রাতে তিন ব্যক্তিকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন তনুর বাবা



2নিউজ ডেস্ক: দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বুধবার রাতেই একই কবরে সোহাগী জাহান তনুকে দাফন করা হয়েছে। এসময় কুমিল্লার পুলিশ সুপার জানান, মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দকে প্রধান করে তদন্ত-সহায়ক একটি দল গঠন করা হয়েছে।

এদিকে মেয়েকে খোঁজার সময় তিন ব্যক্তিকে দৌড়ে যেতে পালিয়ে দেখেছেন সোহাগী জাহান তনুর বাবা, যাদের তিনি চেনেন না বলে জানিয়েছেন। গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার ভেতরে এই কলেজছাত্রীর লাশ পাওয়ার কিছুক্ষণ আগে ওই তিনজনকে দেখেন বলে সাংবাদিকদের জানান ইয়ার হোসেন। বাসার তিনশ গজ দূরে আরেকটি কোয়ার্টারে দুই স্কুলশিক্ষার্থীকে পড়াতে যেতেন তিনি। ২০ মার্চ সন্ধ্যায় ছাত্র পড়িয়ে ফেরার পথে খুন হন তিনি। খুনের আগে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সেনানিবাসের মধ্যে এই কলেজছাত্রী হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারাদেশে তোলপাড়ের মধ্যে বুধবার একদল সাংবাদিককে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখায় সেনা কর্তৃপক্ষ। সেখানে তনুর বাবা ইয়ার হোসেনও ছিলেন। তিনি সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন।

ইয়ার হোসেন বলেন, তার মেয়ে দুটি টিউশনি করতে প্রতিদিন বিকাল ৫টার দিকে অলিপুর স্টাফ কোয়ার্টারে যেতেন, ফিরতেন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে।

দুই কোয়ার্টারের মাঝের তিনশ গজ পথটি নির্জন বলে বাসা থেকে ৯০ গজ দূরের কালভার্টে গিয়ে প্রতিদিন তনুকে এগিয়ে আনতেন তার মা আনোয়ারা বেগম। তবে সেই সন্ধ্যায় মেয়েকে আনতে যাননি তিনি।

ইয়ার হোসেন বলেন, ২৬ মার্চ এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার আনতে যাওয়ার কথা ছিল তনুর। সেজন্য তনু মাকে বলেছিলেন, তিনি যেন দর্জির দোকানে গিয়ে মেয়ের জামাটি নিয়ে আসেন।

রাত ১০টার দিকে বাসায় ফেরার পর ইয়ার হোসেন মেয়ে এখনও ফেরেনি শুনেই খুঁজতে বের হন। তার সঙ্গে ছিলেন এলাকারই এক স্কুলশিক্ষক।

ইয়ার হোসেন বলেন, “আমি আর সেকান্দার স্যার কালভার্ট পেরিয়ে অলিপুরের চারতলা স্টাফ কোয়ার্টারের কাছে চলে যাই। সেখানে একজনকে রাস্তায় হাঁটতে দেখে বলি, কোনো মেয়েকে দেখছেন।

“ঠিক ওই সময় তিনজনকে অনেকটা দৌড়ি যেতে দেখি। ওই ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে সে বলে, এরা এখানকারই।”
ওই তিন ব্যক্তির কথা যাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাকেও চেনেন না বলে সাংবাদিকদের জানান তনুর বাবা। তনুকে যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, সেই পথ পেরিয়েই অলিপুর স্টাফ কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন ইয়ার হোসেন। তবে যাওয়ার পথে কিছু খেয়াল করেননি। মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে মিলিটারি পুলিশকে তা জানিয়ে ওই পথে ফেরার সময় কালভার্টটির কাছেই তনুকে পাওয়ার কথা জানান ইয়ার হোসেন। সেকথা বলতে গিয়ে ভারী হয়ে আসে তার কণ্ঠ।

“কালভার্টের পূর্বপাশে তনুর একটি স্যান্ডেল দেখতে পাই। এরপর পশ্চিমপাশে ঝোঁপের কাছে দেখি তার মোবাইল, একটু দূরে পাই ব্যাগ। আরও সামনে এগিয়ে দেখি তনুর পা দেখা যাচ্ছে।”

“তনু চেয়ে ছিল, কিন্তু কিছুই বলতে পারছিল না। তার নাক থেতলানো ছিল, মাথার কিছু চুল ছিল কাটা।” মিলিটারি পুলিশের সহায়তায় তনুকে সিএমএইচে নেওয়ার পর মারা যায় তনু। রাস্তায় কিছু বলেছে কি না- জানতে চাইলে ইয়ার হোসেন বলেন, “অচেতন ছিল, কোনো কথা বলতে পারেনি।”

উল্লেখ্য, ২০ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী তনুর লাশ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে পাওয়ার হাউসের অদূরে কালভার্টের পাশের ঝোপের মধ্যে পাওয়া যায়।

এদিকে তনুর লাশ তোলার পর কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন বলেছেন, তনু যে হত্যার শিকার তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তিনি মনে করছেন, তনুকে অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ ঝোপের মধ্যে এনে ফেলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে যে আলামত রাখা হয়েছে, তা সাজানো মনে হয়েছে। একই কথা তিনি বিবিসিকেও বলেছেন।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য এবং পারিপার্শ্বিক আলামত থেকে পুলিশ সুপার এ ধারণা করছেন বলে জানিয়েছেন। এ জন্য দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তে এ-সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন চেয়েছেন তিনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সব বিষয় স্পষ্ট হবে।

তনুর লাশ তোলার পর এ কাজে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে কথা বলে জানা গেছে, তার মাথার পেছনে জখমের দাগ আছে। নাক থেঁতলানো। কানের নিচে আঁচড়ের দাগ ও চুল কাটা।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রথম দফা সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্তে তনুর মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হয়নি। ওই দুই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তনুর মৃতদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না, কেবল নাক দিয়ে রক্ত বের হয় এবং কানের নিচে আঁচড়ের দাগ ছিল। চুল কাটা ছিল।

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেছেন, তিনি প্রথম যখন তনুকে উদ্ধার করেন, তখন তার মাথার পেছনে ও নাকে জখম দেখেছেন। এ ছাড়া তনুর জামার দুই বাহুর নিচের দিকে ছেঁড়া ছিল। তনুকে প্রথম দফা কবর দেওয়ার আগে যারা শেষ গোসল দিয়েছেন, এমন একজনও তনুর মাথার পেছনে ও নাকে জখম এবং কানের নিচের আঁচড় ও চুল এলোমেলোভাবে কাটা দেখেছেন।

প্রথম দফা সুরতহাল প্রতিবেদন করেছিলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম। তিনি গতকাল গণমাধ্যমের কাছে প্রথম দফা সুরতহাল প্রতিবেদনে মাথার জখমের কথা গোপন করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, ময়নাতদন্তের জন্য মাথার খুলি কাটতে হয়, হয়তো সেটাকে এখন জখম মনে হচ্ছে।

কিন্তু এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল অন্য সূত্রগুলো বলছে ভিন্ন কথা। ময়নাতদন্তের জন্য মাথার খুলির যে বরাবর কাটা হয়, সেটা আর পেছনের জখম ভিন্ন।

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন গতকাল জানিয়েছেন, তিনি মেয়েকে খোঁজার সময় ঘটনাস্থল থেকে তিন ব্যক্তিকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন। ওরা কারা, সেটা জানার জন্য তিনি তখন উপস্থিত এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন। এরপর একটু সামনে এগিয়েই মেয়ের লাশ দেখতে পান তিনি। ততক্ষণে ওই তিনজন দৃষ্টিরসীমার আড়ালে চলে যায়। এ তথ্য তিনি শুরুতেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম মনজুর আলমও স্বীকার করেন, তাকে তনুর বাবা একই কথা বলেছিলেন। আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তের জন্য তিনটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের প্রধান কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা। অন্য দুজন হলেন গাইনি বিভাগের প্রধান ডা. করুণা রানী কর্মকার ও ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক মো. ওমর ফারুক। তারা গতকাল বিকেলে তনুর দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করেন। ময়নাতদন্তের বিষয়ে এখনই কিছু বলতে রাজি হননি তারা।

এর আগে ২১ মার্চ প্রথম দফা ময়নাতদন্ত করেছিলেন একই মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগেরই একজন চিকিৎসক। ওই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তনুর মাথায় জখমের কথা আসেনি বলে অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে গতকাল প্রশ্ন করা হলে কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। আমরা আদালতের নির্দেশে মেডিকেল বোর্ড করে আবার ময়নাতদন্ত করছি।’
গতকাল সকালে মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে তনুর লাশ তোলা হয়।

এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ছিলেন আদর্শ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার। এ ছাড়া পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন, সিআইডির বিশেষ সুপার (এসএস) নাজমুল করিম খান, সিআইডির প্রধান কার্যালয়ের ক্রাইম সিন ইউনিটের (ফরেনসিক আলামত) সহকারী সুপার আবদুস সালাম, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধিসহ গণমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে আশপাশের গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়। স্থানীয় যাত্রাপুর এ কে উচ্চবিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে কবরস্থানের কাছে আসে। তারা তনু হত্যার বিচারের দাবিতে স্লোগান দেয়।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত