বুধবার, ৬ মে ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ বৈশাখ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

১০ মাসে ৪ হত্যা মিশনে জঙ্গি শফিউল



15নিউজ ডেস্ক : বয়স মোটে ২০ বছর। এর মধ্যে নৃশংস জঙ্গিপনায় হাত পাকিয়েছে শফিউল ইসলাম ওরফে ডন ওরফে সোহান। অন্তত তিনটি সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় অংশ নিয়ে একজন হিন্দু পুরোহিত, একজন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণকারী ও দুই পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সে। অবশ্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীতে তার বিরুদ্ধে আরও একটি হত্যা মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে শফিউল বলেছে, সে তার ওস্তাদের অ্যাসাইনমেন্টে শোলাকিয়ায় হামলা চালায়। তবে কে তার ওস্তাদ তা এখনও অজানা রয়েছে।

সে একটি মাদ্রাসার ছাত্র আর বাড়ি দিনাজপুর জেলা ঘোড়াঘাটে। আর এরই মধ্যে পুলিশ জেনেছে শোলাকিয়া হামলার আগেই পঞ্চগড়ে পুরোহিত যজ্ঞেশ্বরকে আর কুড়িগ্রামে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী হোসেন আলীকে গলাকেটে হত্যা করেছে এই তরুণ জঙ্গি।

এত অল্প বয়সে কেনো এমন জঙ্গি হয়ে ওঠা তা এখন খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। অনেকের কাছে বিষয়টি অবাক ঠেকছে, কেন আর কার প্ররোচনায় শফিউল জঙ্গি হয়েছে। তার মাদ্রাসা কানেকশন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলেও পুলিশ পরিবারকেও দায়ী করছে।

এরই মধ্যে জঙ্গি শফিউল ইসলাম সোহানের বাবা জামায়াত নেতা হাই প্রধানকে গ্রেফতার করেছে দিনাজপুর পুলিশ। গত রোববার ঢাকার সাভার এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পারিবারিকভাবে সহিংস কার্যক্রমের ইতিহাস রয়েছে শফিউল ও তার বাবা হাই প্রধানের। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে জ্বালাও পোড়াও, হত্যা, হামলা, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের যেসব ঘটনা বিএনপি-জামায়াত করেছে তার সাথে সক্রিয় ছিলেন এই হাই প্রধান। একাধিক মামলার এজাহারভুক্ত আসামিও তিনি। ওদিকে তার ছেলে শফিল দাখিল পাশ করার পর গত আড়াই বছর ধরেই নিখোঁজ ছিলো। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকেই জঙ্গি দলে রয়েছে এই শফিউল।

এর মধ্যে তার হাতেই সংঘঠিত হয় অন্তত চারটি হত্যা মিশন। আর ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলার উদ্দেশ্যেই সে সেখানে হাজির হয়। পথে বাধা পড়ায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে কুপিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে তারা। ওই হামলার ঘটনাস্থল থেকেই তাকে আটক করা হয়।

গত ৭ জুলাই ঈদের দিন সকালে শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাতের ২৫০ মিটার দূরে পুলিশের ওপর বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে দুই কনস্টেবলসহ নিহত হয় ৪ জন।

গ্রেফতার হওয়ার পর শফিউলের অতীতের সকল কুকীর্তি সামনে আসতে থাকে। পঞ্চগড় পুলিশ নিশ্চিত করেছে শ্রী শ্রী সন্ত গৌড়ীয় মঠের পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর, ৫০, হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি এই শফিউল। সেটি ছিলো এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। এর এক মাস পর ২২ মার্চ শফিউল ও তার সঙ্গীদের হাতে খুন হন ১৯৯০’র দশকে খ্রীষ্টধর্মগ্রহণকারী হোসেন আলী,৬৮।

সবগুলো হামলাতেই শফিউলের অংশগ্রহণ ও তার নৃশংসতার তথ্য এখন পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে তিনটি কিংবা তারও বেশি কিলিং মিশনে শফিউলকেই কেনো পাঠানো হয়েছে, আর তার ওস্তাদই বা কে সে বিষয়গুলোই এখন গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

পঞ্চগড়ে পুরোহিতকে হত্যার সময় মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে গিয়ে দুই ভক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তাদের ওপরেও গুলি চালায় শফিউল। ওই হামলায় তার সঙ্গে ছিলো আরও দুই জঙ্গি রাজিবুল মোল্লাহ ২৫, ও মোহাম্মদ নজরুল, ২৬।
পঞ্চগড়ে আরও দুটি মামলা একটি বিষ্ফোরণ অপরটি অবৈধ অস্ত্র মামলাও দায়ের রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কুড়িগ্রামের ঘটনায় শফিউলের নাম এসেছে ঘটনাস্থল থেকে আটক এক জঙ্গির জবানবন্দি থেকে। সেবার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলো ৮ থেকে ১০ জন। প্রাথমিকভাবে যাদের সবাইকে জেএমবি সমস্য হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। উল্লেখ্য কুড়িগ্রামে আলী হোসেন হত্যায় জড়িত থাকার কথা শফিউল নিজেই শিকার করেছে। শোলাকিয়া হামলায় আহত হওয়ার পর অাটক শফিউল রয়েছে ময়মনসিংহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সেখানেই জিজ্ঞাসাবাদে সে শিকার করেছে এই হত্যায় জড়িত থাকার কথা। শিগগিরই ওই ঘটনারও চার্জশিট দিতে যাচ্ছে পুলিশ।

ওদিকে র্যাবের কাছে তথ্য হচ্ছে, গত অক্টোবর থেকে এই পর্যন্ত চারটি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো শফিউল। শোলাকিয়া ছাড়া বাকি তিনটি ঘটনাই ঘটেছে উত্তরবঙ্গে।

জিজ্ঞাসাবাদের সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান, আটক ও নিহত জঙ্গিদের মধ্যে এই শফিউলই সর্বকনিষ্ঠ। আর নৃশংসতার দিক থেকে সেই সবচেয়ে এগিয়ে। বিষয়টি বিষ্ময়কর। এত কম বয়সে মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে তিনটি কিংবা তারও বেশি হত্যা মিশন চালানো আর তাতে সক্রিয় অংশ নেওয়ার বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

শোলাকিয়া হামলায় জঙ্গি সন্দেহে জাহিদুল হক তানিম নামে যে যুবককে আটক ও দশ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তার ২৪ বছর আর আবির নামে যে জঙ্গি নিহত হয়েছে তার বয়স ২৩ বছর।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত