রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

তিনটি দিবস ও নারীর অবদান একই সূত্রে গাঁথা



rural-woman-624x351মীর সাহিদুল আলম:
এক.
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর গ্রামীণ নারী দিবস, ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস ও ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য নিরসন দিবস নানা আয়োজনে পালন করে। এই তিনটি দিবসের সাথেই নারী, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে গ্রামীণ নারী নিরলস শ্রম দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। তবে প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো তারই জীবন থেকে যায় দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এরকম প্রেক্ষাপটে এই তিনটি দিবসের তাৎপর্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি-বেসরকারি নানা পর্যায়ে তাই দিবসগুলো গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়।
মানুষের ক্ষমতাহীনতা, প্রান্তিকতা ও দরিদ্রতা দূর করার প্রত্যাশায় ‘খাদ্য, জীবন ও পৃথিবী’র সমৃদ্ধি ও বিকাশের স্লোগান নিয়ে ২০১১ সাল থেকে খাদ্য অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ন্যায্যতার দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠন অক্সফ্যাম তার সহযোগী সংগঠনসমূহকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী “গ্রো ক্যাম্পেইন”এর আওতায় এই দিবসসমূহ পালন করে থাকে।
‘গ্রো’ অক্সফ্যামের একটি আন্তর্জাতিক প্রচারিভিযান, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা, কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি, কৃষিতে ও ভূমিতে নারীর অধিকারভিত্তিক প্রবেশগম্যতা এবং বাজার ব্যবস্থায় নারীর যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ‘কৃষিতে আর ভূমিতে সমঅধিকার: ঘোষিত হোক উন্নয়নের নতুন অঙ্গীকার’ স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশে ১৩ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে এই সপ্তাহ পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেখানে অক্সফ্যাম ও এর সহযোগী সংগঠনসমূহ সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।
দুই.
একজন গ্রামীণ নারী প্রতিদিন ১৬-১৮ ঘণ্টা কৃষিকাজসহ গার্হস্থ্য অন্যান্য কাজে নিয়োজিত থাকেন, কিন্তু তাদের গণ্য করা হয় অনেকটা মজুরিহীন শ্রমিকের মতো, অর্থাৎ পুরুষ কৃষকদের সহযোগী মাত্র। মজুরি বৈষম্য, খাদ্য নিরাপত্তায় অবদানে স্বীকৃতি ও ভূমির মালিকানা না থাকাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যান বাংলাদেশের নারী কৃষক।
কৃষির প্রাথমিক উপকরণ হচ্ছে ভূমি। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের (এফএও) প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নারীর মালিকানাধীন কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৩.৫ শতাংশ। প্রায় ২০ বছর পর এ জমির পরিমাণ হ্রাস পেয়ে ২ শতাংশে নেমে এসেছে। ভূমির মালিকানা না থাকায় বেশিরভাগ নারী কৃষক বরাদ্দকৃত সার, নগদ সহায়তা, কৃষিঋণ এবং অন্যান্য সরকারি ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হন।
খাদ্য নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় জায়গাটি হলো খাদ্য উৎপাদন যা আসে কৃষি থেকে। বিবিএস-এর ২০১৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের পুরুষ শ্রমশক্তির ৪১.৭ শতাংশ ও নারী শ্রমশক্তির ৫৩.৫ শতাংশ কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তৈরি পোশাক শিল্পের চাইতেও কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি।
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও সিডও সনদের মতো আন্তর্জাতিক সনদগুলোতে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও কৃষিতে এর প্রতিফলন নেই, তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগও নেই। বাংলাদেশের সংবিধানেও নারী-পুরুষের সম-অধিকারের কথা বলা হয়েছে কিন্তু কার্যতঃ নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে সাম্প্রতিককালে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা ও বন্যায় অনেক দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। বছরে বিশ্বের ১০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি হ্রাস বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাকে দিন দিন হুমকির মধ্যে ফেলছে। এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে তাই ‘বদলে যাচ্ছে জলবায়ু, বদলাচ্ছে খাদ্য ও কৃষি’।
বিশ্বে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূরীকরণের জন্য সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টি মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য নিরসন দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘের পর্যবেণে বলা হয়, দেশে দেশে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্য এক জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা, যার উদ্ভব জাতীয় ও আঞ্চলিক পরিসরে। দারিদ্র্য বিমোচনের কোনো একক উপায় নেই। এ জন্য প্রয়োজন দেশকে স্বীয় অবস্থা বিবেচনা করে নিজস্ব কর্মসূচি নির্ধারণ। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা দানের মাধ্যম তাদের এ সমস্যা উত্তরণে সাহায্য করা।
তিন.
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ক্ষমতাহীনতা, প্রান্তিকতা ও দরিদ্রতার অন্যতম শিকার ক্ষুদ্র, মাঝারি ও প্রান্তিক চাষি, বিশেষভাবে নারী। যদিও সরকার ইতিমধ্যে ক্ষুধা দূর করার কথা বলছে, কিন্তু এখনও তা প্রকটভাবে বিরাজ করছে। ক্ষুধা সৃষ্টির কারণগুলো দূর করতে না পারলে সরকারের ক্ষুধা দূরীকরণ কর্মসূচি স্থায়ী হবে না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মানুষের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বৈষম্য ও বঞ্চনার অন্যতম কারণ। সে কারণে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং সরকারের উন্নয়নের নীতিমালা ‘রূপকল্প ২০২১’, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও জাতীয় বাজেটে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের কর্মসূচি গ্রহণের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতি-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তাতে সম্পদ পিরামিড আকারে কতিপয় ব্যক্তির নিকট পুঞ্জিভূত হচ্ছে। এই সীমাহীন বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রতিবাদ গড়ে উঠছে। সুতরাং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের তাগিদ শুধু নয়, স্থায়িত্বশীল ক্ষুধা দূরীকরণ কর্মসূচি গ্রহণের লক্ষ্যে মানুষের ক্ষমতাহীনতা, প্রান্তিকতা ও দরিদ্রতা দূর করার কর্মসূচিও গ্রহণ করতে হবে।
চার.
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দারিদ্র্য নিরসনে গ্রামীণ নারীর জীবনমান উন্নয়নের বিকল্প নাই। এসব একই সূত্রে গাঁথা। কৃষিকাজসহ গার্হস্থ্য অন্যান্য কাজে ঘরে-বাইরে নারী যে শ্রম দেয় তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি আজ সময়ের দাবি। এজন্য ‘কৃষি আর ভূমিতে’ নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য নীতি-কাঠামোর পরিবর্তনসহ আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন দরকার।
*লেখক: গণমাধ্যম গবেষক ও উন্নয়নকর্মী, সমষ্টি

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত