সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সীমার মাঝে অসীম আপনি



মোঃ কায়ছার আলী::“To die is to be luckier,” Walt Whitman, সৃষ্টি রহস্যময়। মানুষ সৃষ্টির সেরা। কেবলমাত্র মানুষেরই জ্ঞান, বুদ্ধি এবং বিবেক আছে। দেহ এবং আত্মা (রূহ) নিয়েই মানুষের জীবন। দেহ এবং আত্মা পৃথক হওয়া মাত্রই মৃত্যু। আত্মা প্রচন্ড শক্তিশালী। বিজ্ঞানের ভাষায় শক্তির বিনাশ নেই কিন্তু রূপান্তর আছে। মহাকালের অতি ক্ষুদ্র সময়ের জন্য মানুষ পৃথিবীতে আসে, আবার চলে যায়। এভাবেই চলছে, চলতেই থাকবে। কতদিন চলবে তা জানি না। অনিবার্য এবং চিরন্তন মৃত্যুর হাত থেকে কোন প্রাণীরই রেহাই নেই। কেউ মৃত্যুকে ভয় পায় আবার কেউ পায় না। চিরকালীন অনন্ত সুখের স্থান জান্নাতে যেতে চাইলে মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। বলা যায় মৃত্যু পৃথিবী এবং জান্নাতের মধ্যে একটি বাধা। কখন এবং কীভাবে কার মৃত্যু হবে তা কেউ জানে না। হতে পারে মাতৃগর্ভে, জন্মের সময়, শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে, বার্ধক্যে, রোগে, দুর্ঘটনায়, বন্দুকের গুলিতে, ফাঁসির মঞ্চে, বিষের পেয়ালায়, আগুনে পুড়ে, সলীল সমাধিতে অথবা অন্যভাবে। মৃত্যু সম্পর্কে লিখতে গেলে মনে পড়ে যায় আলফ্রেড টেনিসনের বিখ্যাত কবিতা “টিথোনাসের” সারমর্ম খানা। অমর কবিতায় তিনি লখেছেন প্রতিটি গাছের পাতার ধ্বংস আছে, তা মাটির সাথে মিশে যায়।
চির সবুজাভ রং হারিয়ে ফেলে। জলীয় বাষ্প ভারাক্রান্ত কান্নার সাথে মাটিতে মিলিয়ে যায়। নীল আকাশকে ঢেকে রাখা মেঘেগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরে যায়। মানুষ পৃথিবীতে আসে, মাটিতে জমি কর্ষন করে আবার এই মাটির নিচেই বিশ্রামে শায়িত হয়। কিন্তু টিথোনাসের মৃত্যু নেই। টিথোনাস ভালোবাসত সকালের দেবী অরোরাকে। সে অরোরার কাছে অমরত্ব চেয়েছিল এবং অরোরা তাকে অমরত্ব দান করেছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে, প্রাকৃতিক নিয়মে, জীবনের গতিময়তায় টিথোনাস ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হতে লাগল। সকালের দেবীর কাছে পৌঁছানোর জন্য শিশির সিক্ত সকাল, হিমেল বাতাস, কুয়াশার চাদরে ঢাকা প্রকৃতির এখন আর তার ভাল লাগে না। সাদা চুল আর শরীরের অক্ষমতা নিয়ে টিথোনাস তাকিয়ে থাকে মৃত্যুর অপেক্ষায়। কিন্তু হায়! টিথোনাস যে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরোধিতা করেছে। টিথোনাস ‘অমরত্ব’ চেয়েছে কিন্তু ‘চিরন্তন যৌবন‘ চায়নি। টিথোনাস এবার অরোরার কাছে তার ‘অমরত্ব’ ফিরিয়ে নিতে বলে। কিন্তু অরোরা সেটি ফিরিয়ে নিতে পারে না। কেননা গডের দেওয়া দান কখনো ফেরত নেওয়া যায় না। এক অকৃত্রিম, বিষাদময়, যন্ত্রনাদায়ক অবস্থায় টিথোনাসের দিন কোটে। টিথোনাস ঈর্ষা করে সেইসব সুখী লোকদের দেখে যারা মৃত্যু বরণ করে এবং কবরে শায়িত হয়। সে আবারো অরোরাকে আবেদন করে তাকে মুক্তি দিতে এবং মাটিতে পুনঃস্থাপন করতে। যাতে করে সে মৃত্যুর অমৃত স্বাদ গ্রহণ করতে পারে। মৃত্যু না হলে কি জীবনের মূল্য বোঝা যেত। বিচক্ষন, দুরদর্শী, স্মরণীয় এবং বরনীয় মহত মানুষেরা মৃত্যু আসার আগেই জীবনের প্রতিটি মুহুর্তকে গুরুত্ব দেয়। আবিষ্কার, সাহিত্য, জনসেবা, দেশ-স্বাধীন, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন বা অন্য কোন ভাবে তারা নিজেকে প্রস্ফুটিত করে।
কয়েক সহস্র বছরের গণতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক চীনের গোড়াপত্তন করেন মহান বিপ্লবী নেতা সান ইয়াত সেন। তার মৃত্যুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গভীর অনুরাগী মাও সে তুং বলেছিলেন “মৃত্যু অতি স্বাভাবিক নিত্য ঘটনা। তা যেন পাখির পালকের মত খসে পড়া অথবা গাছের শুষ্ক পাতার মত ঝরে পড়া। কিন্তু কিছু মৃত্যু আছে যা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয় যেন থাই পর্বত ধসে পড়ে।” ইসলাম ধর্ম মতে, মৃত্যুর পর তিনটি আমল মৃত ব্যক্তির আমলনামায় যোগ হতে থাকে। তাহলে কি মৃত্যু মানে সব শেষ? না মোটেই না। মানবসেবা বা জনসেবা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বেশি করা যায়। অর্থ দান, খাদ্য বিলানো, সেবা শুশ্রুষা করা, দুর্ঘটনায় আহত, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান, জনকল্যানে পথ-ঘাট, সেতু, হাসপাতাল, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নির্মান করে আবার দেশ ও জাতির প্রয়োজনে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অথবা শহীদ হয়ে মানবতার কাজ করা যায়। এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন তাঁদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ জনপদের এক মহান স্বাধীনতা সংগঠকের জীবনী আজকের লেখার আলোচ্য বিষয়। ২১শে অক্টোবর বন্ধবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের একাধিকবার তথা পনের বছর দায়িত্ব পালন করা সভাপতি, সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিরল-বোচাগঞ্জ এলাকার দুই দুই বার নির্বাচিত মাননীয় সংসদ সদস্য জননেতা খালিদ মাহমুদ চৌধুরী-এর গর্বিত পিতা জননেতা আব্দুর রৌফ চৌধুরীর নবম মৃত্যুবার্ষিকী।
২০০৭ সালের এই দিনে রাত নয়টায় তার নিজ বাসভবন বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ পৌরসভার ধনতলা গ্রামের চৌধুরীপাড়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা ভাষায় শোকাচ্ছাস বলে একটি শব্দ আছে। এর খুব বেশি ব্যবহার নেই। শব্দটির যুত সই ব্যবহার করার মত ঘটনা রোজ রোজ ঘটে না। কিন্তু সেদিন বিরল দৃশ্য হয়েছিল। জানাজায় মানুষের ভীড় আছড়ে পড়েছিল অন্য ভীড়ের উপর। জনগণের অফুরন্ত ভালোবাসার ভোলায় ভাসতে ভাসতে সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় তিনি শায়িত হলেন। চারদিকে আম, লিচু ও সুপারির গাছ। পারিবারিক গোরস্থানে অনেকগুলো কবর। পূর্বপার্শ্বে রাস্তা পার হলে একটা মসজিদ। আমার কাছে মনে হয় শান্তিতে ঘুমানোর জন্য একটা নিরিবিলি পরিবেশ। আমরা জানি চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকা মরহুম আব্দুর রৌফ চৌধুরী আর কোনদিন কথা বলবেন না। আর কখনো তাঁর কন্ঠে উচ্চারিত হবে না দুঃখিনী বাংলা মায়ের কথা। আর কোনদিন তাঁকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হবে না। আর কোনদিন সংগঠক হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে দেখা যাবে না। শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আর রাজপথে তাঁকে নামতে হবে না। বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার ২৩টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের পতাকাতলে জনগণকে সমবেত হওয়ার জন্য উদাক্ত আহ্বান আর শোনা যাবে না। আপনার বুক জুড়ে ছিল বঙ্গবন্ধু আর এদেশের মানচিত্র। আর হৃদয় জুয়ে ছিল আওয়ামী লীগ এবং জনগণ। সেদিন অপেক্ষায় ছিল অর্থাৎ ২২শে অক্টোবরের সকাল, দুপুর, বিকাল আর রাত। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সময় স্বাভাবিক গতিতে আজও চলছে। আপনার আনন্দের নাম মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, চেতনার নাম অসাম্প্রদায়িক শোষন মুক্ত বাংলাদেশ হয়তো ভবিষ্যত স্বপ্নের নাম ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ, নিম্ন মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ, পদ্মা সেতুসহ অনেক কিছু যা আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় আপনি ছিলেন রাজনীতির এক তারকা পুরুষ, নন্দিত রাজকুমার, সেই কিশোর বয়সে ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতি শুরু করে আমৃত্যু ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে যা পেয়েছেন তার চেয়ে বেশি দিয়েছেন দেশকে অর্থাৎ স্বাধীনতার সৈনিক হিসেবে মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে একটা স্থায়ী লাল সবুজ পতাকা। ১৯৩৭ সালের ২৮শে ডিসেম্বর তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত পবিত্র ভূমিতে (জন্ম এবং মৃত্যু একই স্থানে) একটি মাহেন্দ্র ক্ষনে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে পিতা সমাজ সেবক মৌলভী খোরশেদ চৌধুরী এবং মাতা আয়েশা খাতুন চৌধুরীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। মাটি ও মানুষের জন্য নিরলসভাবে গণমানুষের কল্যানে ঊনসত্তরটি বছর কাজ করেছেন। ১৯৬২ সালে পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন সরকারের জ্যৈষ্ঠ কন্যা রমিজা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৫২ সালে সিরাজগঞ্জ থেকে মেট্রিক অতঃপর ঢাকা কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পরবর্তীতে দিনাজপুর এসএন কলেজে বিএ পড়ার সময় ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নের সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় এবং সখ্যতা গড়ে উঠে। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনে তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ৭৫-র পরবর্তী সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে সামনের কাতারে নেতুত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহাম্মেদের পূর্বাঞ্চলীয় জোন এর তিনি দূত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের ৬ই জিসেম্বর বোচাগঞ্জ উপজেলা পাক হানাদার মুক্ত হয়।
একজন ভাল ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে এ অঞ্চলে তাঁর সুনাম ছিল। ১৯৮৯ সালে তিনি বোচাগঞ্জ উপজেলায় চেয়্যারম্যন নির্বাচিত হোন। ২০০২ সালে বিএনপি ও জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ১৫ই আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি পালন কালে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৯৯৬ সালে দিনাজপুর-১ আসনে (বীরগঞ্জ-কাহারোল) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। পরবর্তীতে ডাক তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে শোকাহত পরিবার, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি পালন করছে। আমি ও ব্যক্তিগতভাবে আপনার অবিনশ্বর আত্মার শান্তি কামনা করছি। পরিশেষে আপনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে যেভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিক সেভাবে আপনার একমাত্র পুত্র রংপুর বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। আপনার পরবর্তী তৃতীয় প্রজন্ম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব করে দেশ ও জাতির জন্য সুনাম বয়ে আনবে এমনটি আজ প্রত্যশা করছি। অনুভব বা প্রেরনায় আপনি যুগের পর যুগ বা শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকবেন। আপনার কবরের পাশে গেলে যেন আমার কবির সেই কালজয়ী উক্তিখানা মনে পড়ে। | ‘What you are, I was. What I am, you will be’.
লেখকঃ শিক্ষক, দিনাজপুর।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত