শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

নবীগঞ্জে নির্মিত হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য স্মৃতিস্তম্ব



unnamed-20নবীগঞ্জ সংবাদদাতা:: ২৬শে মার্চ ১৯৭১ ভোর রাতে পাকিস্থানী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী তরুণ শিক্ষক, নবীগঞ্জের কৃতিসন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য স্মরণে স্মৃতিস্তম্ব নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ।

গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর নেতৃত্বে স্মৃতিস্তম্ভের স্থান নির্ধারণ করা হয়। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আগামী ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদ অনুদ্বৈপায়ন স্মৃতিস্তম্ভের উদ্ভোধন করা হবে।
নবীগঞ্জ সরকারী ডিগ্রী কলেজ ও শহীদ অনুদ্বৈপায়নের নিজ গ্রাম জন্তরীর ত্রিমূখী রাস্তার মিলনস্থলের পাশে নির্মিত হবে প্রস্তাবিত শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য স্মৃতিস্তম্ভ। উক্ত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলে নবীগঞ্জ বাসীর র্দীঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কর্তৃক শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে নিয়ে প্রকাশিত ডাক টিকেটকে প্রতিপাদ্য করে তৈরী করা হয়েছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের মূল নকশা।
স্মৃতিস্তম্ভের স্থান নির্ধারণী অনুষ্ঠানে শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্রাচার্য সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন শহীদ অনুদ্বৈপায়ন স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক, সাংবাদিক উজ্জ্বল দাশ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নবীগঞ্জ বাহুবল আসনের সাংসদ এম এ মুনিম চৌধুরী বাবু, নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জীতেন্দ্র দেবনাথ, নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সাবেক মেয়র অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম চৌধুরী, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা বেগম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান চৌধুরী, নবীগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র-১ এটিএম সালাম, পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু দাশ রানা, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ মিলু, নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক রেজাউল ইসলাম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি আমিনুর রহমান চৌধুরী সুমন, পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি ইকবাল আহমেদ বেলাল, সংস্কৃতিকর্মী নীলকন্ঠ দাশ সামন্ত নন্টি, সাংবাদিক মতিউর রহমান. শিক্ষক জয়ন্ত কুমার দাশ (সুবল) প্রমুখ।
স্বাধীনতার পর নবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তাঁর গ্রাম জন্তরী পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল অনুদ্বৈপায়ন সড়ক। কালের গর্ভে সেটি এখন কলেজ রোড নামেই অধিক পরিচিত। এখন আর কোথাও চোখে পড়েনা না অনুদ্বৈপায়ন সড়কের ফলক। নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কর্তৃক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের এই প্রচেষ্ঠাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নবীগঞ্জবাসী।
উল্লেখ্য, শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জন্তরী গ্রামে ১৯৪৫ সালের ৩১শে জানুয়ারি তাঁর জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা দিগেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন নামকরা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। নবীগঞ্জ যোগল কিশোর (জে.কে) হাই স্কুলের কৃতি ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অনুদ্বৈপায়ন ভট্রাচার্য। ১৯৬১ সালে স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণীতে অংক ও সংস্কৃতি বিষয় দুটিতে লেটার নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিকুলেশন (এস.এস.সি) উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ সালে এম.সি. কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে মেধা তালিকায় একাদশ স্থান অধিকার করে আই.এস.সি (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন।
১৯৬৬ সালে অনুদ্বৈপায়ন পদার্থবিদ্যায় প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অধিকারে বি.এস.সি সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফলিত পদার্থ বিদ্যায় প্রথম শ্রেনীতে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে এম.এস.সি. পাশ করেন। অনুদ্বৈপায়ন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নব প্রতিষ্ঠিত ফলিত পদার্থ বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। ১৯৬৮ সালের ১৪ই মার্চ ফলিত পদার্থ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন অনুদ্বৈপায়ন। আর একই বছরের ১লা জুলাই জগন্নাথ হলের সহকারী আবাসিক শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। শহীদ অনুদ্বৈপায়ন শিক্ষকতাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কলম্বো প্লানের বৃত্তি নিয়ে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ রাতে বিমানে উঠার সব ব্যবস্থা চুড়ান্ত ছিল। কিন্তু ভোর রাতে পাকবাহিনীর হাতে অন্যান্য মেধাবী ছাত্র – শিক্ষকের সাথেই নির্মমভাবে নিহত হন অনুদ্বৈপায়নের ভট্টাচার্য। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, অনুদ্বৈপায়ন ভট্রাচার্য শহীদ হওয়ার দু’ দিন আগে অর্থাৎ ( ২৪ মার্চ) নিজ জন্ম ভুমি নবীগঞ্জের জন্তরী গ্রামে এসেছিলেন। ২৬ মার্চ লন্ডন বিশ্ব বিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রী নিতে যাওয়ার জন্য বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে বিদায়ও নেন। এ সময় অনেকেই ঢাকায় না যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু তার স্বপ্ন এবং উচ্চতর ডিগ্রী গ্রহনের দিক বিবেচনা করে কাহারো বাধাঁ তাকে ধরে রাখতে পারেনি। তিনি ২৫ মার্চ ঢাকায় ফিরেন। ওই দিনই দিবাগত ভোর রাত ( ২৬ মার্চ ) পাকবাহিনীর বুলেটে তিনি শহীদ হন। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পর হলেও নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় উপজেলা পরিষদ উক্ত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত ও সাধুবাদ জানিয়েছেন নবীগঞ্জের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত