সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মোটরসাইকেলে বেঁচে থাকার স্বপ্ন!



15555180_10206239255179299_2028152322_oনিজস্ব প্রতিবেদক:হাওর বেষ্টিত এলাকা সুনামগঞ্জ । ছোটখাটো অসংখ্য জলাধারের সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে টাংগুয়ার হাওড়। পানি বন্দি এলাকা হওয়ার কারণে এক সময় অন্যান্য উপজেলার সাথে সুনামগঞ্জ জেলার যোগাযোগের একমাত্র ব্যাবস্থা ছিল নদিপথ । ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা লঞ্চ এগুলোই ছিল মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু বর্তমান সরকার আমলে পাল্টে গেছে চিরচেনা সেই দৃশ্য।
সুনামগঞ্জ সুরমা নদীতে ব্রিজ নির্মাণ হওয়ার কারণে সুনামগঞ্জ জেলার হাওর বেষ্টিত উপজেলার গুলোর সাথে মানুষের যোগাযোগ ব্যাবস্থার চিত্র বদলে গেছে পুরোটাই। স্থল পথেই এখন বেশি চলাচল করছেন সুনামগঞ্জবাসী। এই সুযোগে প্রায় তিন হাজার বেকার যুবকের কর্ম সংস্থানের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল। শুনতে অবাক লাগলেও মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন উপজেলার বহু তরুণ। এর সাথে সুনামগঞ্জ জেলার সঙ্গে জামালগঞ্জ, বিশম্বপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা উপজেলার জনগনের যোগাযোগ ব্যাবস্থাও হয়ে উঠেছে অনেক সহজ।

যেখানে পরিবারের বোঝা হয়ে ছিল হাজার হাজার বেকার যুবক তারা আজ স্বাবলম্বী। ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল এ যাত্রী পরিবহণ কর্ম হিসাবে বেছে নেওয়ায় আজ তারা মুক্ত হয়েছে রেকারত্বের অভিশাপ থেকে । একেকটি মোটরসাইকেল যেন হয়ে উঠেছে একেকটি পরিবারের জীবিকা নির্বাহের উপায় ।
সুনামগঞ্জ সুরমা নদীর ব্রিজ পার হলেই দেখা মিলে সারিবদ্ধ ভাবে করে রাখা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল। এখান থেকে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌছে দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছে শত শত যুবক। সিএনজি, রিক্সা, ইজিবাইক থেকে যাত্রীরা নামলেই এগিয়ে আসে মোটরসাইকেল চালকরা। যাত্রীর সাথে ভাড়া সংক্রান্ত আলোচনায় মধ্যস্থতার পর এখান থেকে বাইকে করেই যাওয়া যায় জামালগঞ্জ, বিশম্বপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা উপজেলাসহ আশপাশের যে কোন গ্রামে। এসব গ্রামে যাওয়ার রাস্তা কাঁচা হওয়ায় সাধারণত মোটরসাইকেল ছাড়া আর কোন ভারি যান সেদিকে যেতে পারে না । সেই সুযোগে মোটরসাইকেল এ যাত্রী নিয়ে যান চালকরা।
জামালগঞ্জ, বিশম্বপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা উপজেলায় সদরে দেখা যায় বিভিন্ন রাস্তায় মোড়ে বা পয়েন্টে পার্ক করে রাখা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল। কিছু টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন বাজারে বা গ্রামে পৌছে দেওয়াই তাদের কাজ । সুনামগঞ্জ থেকে জামালগঞ্জে যেতে যেতে আলাপ হয় মোটরসাইকেলের ড্রাইভার সজীবের সাথে।

কথায় কথায় উঠে আসে তার জীবনের গল্প। সে বলে ‘আগে আমি বেকার ছিলাম, আমার এক বন্ধু নিজের মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালাত। প্রায় সময় সে আমাকে বলত বেকার থেকে লাভ কি তোর তো সাইকেল আছে, ভাড়ায় চালা দিন শেষে অন্তত ১৫০/২০০ টাকা আয় হবে। কিন্তু আমার নিজস্ব গাড়ি ছিলো না তখন । যেটা ছিল সেটার মালিক ছিলেন বড় ভাই । পরে তাকে একদিন বললাম আমার পরিবার থেকে মোটরসাইকেল কিনে দেবে না। বন্ধুটি আমার কথা শুনে দুই দিন পরে আমাকে ফোন করে বলল তোর জন্য মোটর সাইকেল পেয়েছি। তার সঙ্গে আলোচনায় বুঝলাম প্রতি দিন খরচ বাদে মালিককে ২০০ টাকা দিতে হবে। প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই।
কয়েক দিন চালানোর পরে প্রতিদিন খরচ বাদে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বা কোন কোন দিন ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হত। কয়েক মাস রোজ হিসাবে চালানোর পরে আব্বাকে কোন মতে রাজি করিয়ে ১টি পুরাতন মোটরসাইকেল কিনি । বাবা ও আমার আগ্রহ দেখে কিনে দেন । ৮ মাস পরে আমার আয় দিয়ে পরিবার চালিয়েও কিছু টাকা সঞ্চয় হয়। এরপর পুরাতন মোটরসাইকেলটি বিক্রি করে ও জমানো কিছু টাকা দিয়ে নতুন এই বাইকটি কিনি। ৩ বছর হল আমি এই পেশায় আছি এবং আল্লাহর রহমতে ও আব্বা-আম্মা, ছোট ভাই-বোন নিয়ে মোটামোটি ভালই আছি।’

ভাড়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে এখানে কিছু কিছু জায়গায় নির্ধারিত ভাড়া আছে, তবে স্যন্ধার পরে সাধারণত কম ভাড়াতেই মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহণ করতে হয়। তাদের এখানে না থাকলেও কোন কোন এলাকায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ড্রাইভারদের সমিতিও আছে বলে জানায় সে।
সুনামগঞ্জে সজীবের মত আরো হাজারো তরুণের বেঁচে থাকার আশ্রয় হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল । এ যেন ভালভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নে এক টুকরো আশ্রয় ।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত