বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সরকারদলের হয়ে, দলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেন মতিউর



সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি::২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তৎকালিন প্রধান বিরোধি দল বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল আগে থেকে নানা প্রশ্ন তুলেছিলো। এখনও এ নিয়ে প্রতিদিনই সমালোচনা করছে বিরোধীদলগুলো। নবম জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেওয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে এ রাজনৈতিক মহলের। গত সোমবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেন খোদ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (সুনামগঞ্জ-৪) ও বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান।জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন- তিন বছরে আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জগন্নাথপুর উপজেলায় মরহুম আবদুস সামাদ আজাদের তার ভাষায় ‘নাবলক’ ছেলে আজিজুস সামাদ ডনের কাছে ১০ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। পরে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। কীভাবে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন- “তা কেবল এমএ মান্নান এবং তৎকালীন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইয়ামিন চৌধুরী ছাড়া আর কেউ জানে না!” সোমবার বিকালে সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী স্কুলের মাঠে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়াম্যান নুরুল হুদা মুকুটকে দেয়া নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি এসব কথা বলেন।

আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতা, সাবেক দলীয় এমপি ও বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি মতিউর রহমানের মুখ থেকে এসব বক্তব্য শোনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনসহ জনমনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। দলীয় রাজনীতিবিদরা বলছেন- মতিউর রহমান বয়সের ভারে মুখে যা আসছে তাই বলছেন। বিরোধিরা বলছেন- এখন জনগণের বিশ্বাস হবে, আওয়ামী লীগের মুখে নিজেদের ভোট চুরির কথা শোনে। এরা কেমন রাজনীতি করে তাও বুঝবে জনগণ।

আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা, সাবেক দলীয় এমপি ও বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা সভাপতি মতিউর রহমানের মুখ থেকে এমন বক্তব্য শোনে সাধারণ মানুষ বলছে- তাহলে তো বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল যে এতদিন ধরে বলে আসছে- নির্বাচন সুষ্ট হয়নি। তাদের কথাই ঠিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন- “২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল আন্দোলন করেছিলো। তত্ত্ববধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেনা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। এখন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মতিউর রহমানের মুখের বক্তব্য শোনে মনে হচ্ছে তাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিলো।” জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়াম্যান নুরুল হুদা মুকুটকে দেয়া নাগরিক সংবর্ধনায় মতিউর রহমান জেলার মন্ত্রী-এমপিদেরে ইঙ্গিত করে বলেন- দল আজ দুইভাগে বিভক্ত। একদিকে ত্যাগী আর অন্যদিকে ভোগী। জেলা পরিষদ নির্বচনের মধ্যদিয়ে ভোগীদের বিদায়ঘন্টা বেজে গেছে। এখন থেকে এদের আর ভোগ করতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন- আমি যখন দেখেছি এই ভোগীরা দলকে গ্রাস করে রেখেছে তখন তৃণমূলে ত্যাগী নেতা জগলুল-মকুট-কালাম প্রমুখদের নিয়ে দলকে রক্ষার জন্য জন্য বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হই। মতিউর রহমান বলেন- আমার ভাগনা আর ভাতিজা আজ এককাতারে। তারা যদি কারো কান কথা না শোনে ঐক্যবদ্ধ থাকে তাহলে কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারবেনা। তাদের এই ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য নেতা-কর্মীদের নিকট থেকে দোয়া কামনা করেন তিনি। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানকে উদ্দেশ্য করে মতিউর রহমান আরো বলেন- আপনি আমার সামনে আসুন। পেছনে কথা বলতে চাই না।

তবে, আপনারা মনে রাখবেন- একাত্তরে আমরা যখন যুদ্ধের ময়দানে ছিলাম, মান্নান সাহেব তখন পাকিস্তানিদের হেফাজতে চাকরি করেছেন। এমএ মান্নানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে বলেন- আপনি কী করেছেন সুনামগঞ্জবাসীর জন্য? আমি অনেক কিছু করেছি। মতিউর বলেন- আসলে আপনি জনগণের কল্যাণে কাজ করে অভ্যস্ত নয়। সব সময় নিজের স্বার্থের চিন্তাই করেছেন। আমার সমালোচনা করার আগেই নিজের বিষয়গুলো ভাবুন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ নানা শ্রেণিপেশার কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন।

এর আগে গত ১০ জানুয়ারি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শান্তিগঞ্জে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের অনুষ্ঠানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মতিউর রহমানকে তুলোধুনা করেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। মতিউর রহমানকে ইঙ্গিত করে তিনি ওইদিন বলেন- ‘একজন নেতা প্রতিনিয়ত আমার বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জে বসে কথা বলছে। কুৎসা রটাচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এতদিন আমি ধৈর্য ধরে বসেছিলাম। সে এক উপ-নির্বাচনে পাশ করে এমপি হয়েছিল, সে মনে করেছে সে বিরাট কিছু হয়ে গেছে।’ প্রতিমন্ত্রী মান্নান মতিউরকে উদ্দেশ্য করে আরো বলেন- “সরকারের টাকা এনে সে নিজের নামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে।

সরকারি ইট-বালু, পাথরের কন্টাক্টারি করে কালো টাকা বানিয়েছে। আমি আপনাদের পাশে আছি। মরার আগের দিনও পাশে থাকবো। আমি দক্ষিণ সুনামগঞ্জের ডুংরিয়ার সন্তান, ডুংরিয়াতেই থাকব। ভৈরব থেকে এসে কৃত্রিম নেতা সাজবো না।” সাবেক সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানকে উদ্দেশ্য করে প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের এই বক্তব্যের পর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মতিউর রহমান গত সোমবার এমএ মান্নানের বক্তব্যের জবাব দেন। দীর্ঘদিন ধরে সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগে কোন্দল চলে আসছে। গত বছরের জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের পর থেকে এ কোন্দল প্রকাশ্যেরূপ নেয়। গত ২৮ ডিসেম্বরের জেলা পরিষদ নির্বাচনে মুকুট ও ইমনকে কেন্দ্র করে দ্বিধাভিবক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত