মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আতঙ্কের চর থেকে স্বপ্নের স্বর্ণদ্বীপ গড়ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী



নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নোয়াখালীর স্বর্ণদ্বীপকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। প্রতিকূল এই স্বর্ণদ্বীপে শুধুই যে সামরিক প্রশিক্ষণই চলছে তা নয়, এর পাশাপাশি এখানে বেশ কিছু আর্থসামাজিক কাজও চলছে। একদিকে যেমন জমিতে ধানচাষ চলছে, তেমন এই মিলিটারি ফার্মগুলোতে পশুপালনও চলছে, যেখানে সম্পৃক্ত হচ্ছে স্থানীয় এলাকাবাসী।

২০১৩ সালে দ্বীপটি সেনাবাহিনীর আওতায় আসার পর এই এলাকা এখন জলদস্যু ও ডাকাতমুক্ত। এমন নানা কর্মকাণ্ডে নোয়াখালীর জাহাইজ্জারচরকে স্বপ্নের স্বর্ণদ্বীপ হিসেবে গড়ে তুলছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

স্বর্ণদ্বীপের একটি বাথানেই প্রায় দু’শ মহিষ আছে। প্রতিটি মহিষেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম। লাল চান, কালাচান, রঙবালা এসব নাম ধরে ডাকলেই সাড়া দেয় তারা। ভোর হলেই মহিষ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ২০০-২৫০ লিটার হয় মোট। একেকটা মহিষে ৫-৬ লিটার দুধ দেয়। খামারেই মহিষের দুধ থেকে তৈরি করা হয় পনির। মহিষের পাশাপাশি হাঁস ও ভেড়াও পালন করা হচ্ছে স্বর্ণদ্বীপে।

স্বর্ণদ্বীপজুড়েই রয়েছে এমন বেশ কিছু বাথান। আগামীতে পশু প্রজনন এবং দুগ্ধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে স্বর্ণদ্বীপকে ঘিরে।

বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর এম অ্যান্ড কিউ পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রি. জে. মামুন অর রশীদ বলেন, মিলিটারি ডেইরি ফার্মকে আমরা এক্সটেন্ড করে ‘সম্প্রীতি’ নামে একটা সমবায় করেছি। এখানে ২০টার মতো বাথান আছে। সেই বাথানগুলোকে আমরা একটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।

ভিয়েতনাম থেকে আনা সিয়াম কোকোনাট এর ১৫০০ চারা রোপন করা হয়েছে। এর নিচে চলছে মাছ চাষ। দ্বীপজুড়ে পরীক্ষামূলকভাবে ১৭ ধরনের ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। ধান চাষ হচ্ছে ১০ একর জমিতে।

ব্রি. জে. মামুন অর রশীদ আরো বলেন, ধান ও রবিশস্য চাষও আমরা ওখানে ‍শুরু করেছি। এখন খুব ছোট পরিসরে শুরু করেছি। মাস্টার প্ল্যান করে সেটা আরো বড় করে পুরো দ্বীপে বিস্তার করবো।

কৃষিকাজের বাইরে এ চর ঘিরে নানা কর্মকাণ্ড চলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে গড়ে তোলা হয়েছে সাইক্লোন শেল্টার। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে তৈরি করা হচ্ছে নতুন সড়ক। এখানে একটি ছোট পানি শোধনাগারও গড়ে তোলা হয়েছে।

মাত্র ৫ বছর আগেও নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা জাহাজ্জ্যার চর ছিল দুর্ধর্ষ সব জলদস্যুদের সশস্ত্র আস্তানা। বিভিন্ন নৌযান ও আশেপাশে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারীদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে আতঙ্কের জনপদে পরিণত করা হয় চরটিকে। সমতল থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন জাহাজ্জ্যার চরের দু’পাশে থাকা সুবর্ণচর ও সন্দ্বীপের মানুষের মুখে মুখে রয়েছে জলদস্যুদের নিয়ে নানা গল্প, নানা রটনা।

কোনো এককালে এখানে জাহাজডুবি হয়েছিল সেজন্য স্থানীয়রা নাম দিয়েছিলেন জাহাজ্জ্যার চর। তবে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই চরটি ছিল আতঙ্কের চর নামে পরিচিত। প্রায় আড়াই হাজার জলদস্যুর অবাধ বিচরণ ভূমি ছিল এই চরে। তবে এ মুহূর্তে সেসবই অতীত। চরটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন স্বপ্ন। নতুন আশা। রূপ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক মানে। নামকরণও করা হয়েছে নতুন ‘স্বর্ণদ্বীপ’। এখানেই গড়ে উঠছে সেনাবাহিনীর জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এ কারণে আতঙ্কের চর থেকে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে স্বর্ণদ্বীপের নাম।

২০১৩ সালে সরকারের পক্ষ থেকে চরটিকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। এরপর থেকেই চরটিকে নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সেনাবাহিনী। নানা প্রতিকূলতা আর বাধার মুখোমুখি হন তারা। আতঙ্কের চর থেকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তুলতে মূলত ৩ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে সেনাবাহিনী। এগুলো হচ্ছে-সেনা প্রশিক্ষণের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, চর রক্ষা করতে বনায়ন ও আশেপাশে থাকা স্থানীয় জনগণের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন। এর বাইরেও রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের জহির ঘাট থেকে ট্রলারে স্বর্ণদ্বীপে যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। নদীপথ ছাড়া চরে পৌঁছানোর বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। যোগাযোগের এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই অনেকটা দুর্বার গতিতে স্বর্ণদ্বীপকে গড়ে তোলার কাজ করছে সেনাবাহিনী। এরইমধ্যে সেখান থেকে প্রায় ২০ হাজার সেনা সদস্য উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

স্বর্ণদ্বীপের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে সেনাবাহিনীর চলাচল ও বাসস্থান (এমঅ্যান্ডকিউ) পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন অর রশীদ বলেন, নিঃসন্দেহে স্বর্ণদ্বীপকে প্রস্তুত করা আমাদের কাছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেছেন। সেনাবাহিনীর উৎকর্ষতা বাড়াতে চরটিকে বহুমাত্রিক প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সরকারের দিকনির্দেশনা মেনে এখানে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এদিকে চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে দুর্গম এ দ্বীপে তাঁবুতে অবস্থানের মাধ্যমে সেনা সদস্যরা তাদের যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসনের কাজ শুরু হয়। সেনাবাহিনী এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের যৌথ সহায়তায় এরইমধ্যে স্বর্ণদ্বীপে ২টি সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে। এসব শেল্টারে ২০ হাজার গ্যালন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং গ্রিন এনার্জির উৎস হিসেবে সোলার বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্যোগের সময় প্রতিটি সাইক্লোন শেল্টারে আনুমানিক ৫শ’ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। এগুলো চরে বসবাসরত ও অবস্থানরত সকলের জন্য উন্মুক্ত।

গত বছরের মে মাসে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সময় বাথান শ্রমিক ও জেলেসহ স্থানীয় জনগণ নবনির্মিত এই সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছিলো। শিগগিরই আরো তিনটি সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হবে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এছাড়াও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২টি লেক খনন করা হয়েছে। সুপেয় পানির জন্য ১ হাজার মিটার গভীর সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প খনন এবং বর্ষা মৌসুমে চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এদিকে স্বর্ণদ্বীপকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীর ভাঙা-গড়ার হাত থেকে রক্ষা করাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে সেনাবাহিনী। এ জন্য ৭২ হাজার একর স্বর্ণদ্বীপে বড় পরিসরে বনায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত দুর্যোগপ্রবণ। স্বর্ণদ্বীপকে এসব থেকে রক্ষা করতে সেনাবাহিনীর সীমিত বাজেট দিয়ে বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এরইমধ্যে ৬ হাজার ঝাউ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে সিড বোম্বিংয়ের মাধ্যমে ২ টন কেওড়ার বীজ বপন করা হয়েছে। এছাড়া ভিয়েতনাম থেকে আনা ডুয়ার্ফ প্রজাতির ১৫শ’ নারিকেল গাছের চারার সমন্বয়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তায় আদর্শ নারিকেল বাগান করা হয়েছে। এ বাগানের সঙ্গে মাছের খামার ও সবজি চাষ করা হচ্ছে।

স্বর্ণদ্বীপ ঘিরে সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ হলো আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য এরইমধ্যে স্থানীয় জনগণ ও সেনাবাহিনী সম্প্রীতি নামে একটি সমবায় গঠন করেছে। চরের বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো-ছিটানো স্থানীয় জনগণের মহিষ, গরু ও ভেড়ার বাথানগুলো দ্বীপের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র পরিসরে স্বর্ণদ্বীপে একটি ডেইরি প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এখানে বাথানগুলোতে পালিত মহিষ ও গরুর দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি দ্বীপে ভেড়া ও হাঁস পালনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রায় ৫০ বছর আগে দ্বীপটি জেগে ওঠে। এর পাশেই রয়েছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর সুবর্ণচর। সবমিলিয়ে দুর্গম দ্বীপ হিসেবে এটা পরিচিতি পেয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দ্বীপটিকে প্রশিক্ষণের জন্য উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি এখানকার জীব-বৈচিত্র্য ও পরিবেশের দিকে নজর রাখতে হচ্ছে। সূত্র: চ্যানেল আই

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত