সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সুরঞ্জিতের শোকে অশ্রু ঝড়ছে ভাটি অঞ্চলের মানুষের



জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী:: ভাটি বাংলার এক সময়ের অবহেলিত জনপদ কালনী নদীর পাড়ের গ্রাম আনোয়ারপুরে ১৯৩৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জন্ম হয়। জন্মের প্রায় দু’মাস আগেই বাবা চলে যান পরপারে। একমাত্র মায়ের ভালবাসা ও আদর স্নেহে বেড়ে ওঠা সুরঞ্জিত ১২ বছর বয়সে মাকেও হারান। জন্মের আগে বাবা হারা ও ১২ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে সরঞ্জিত দুঃখের অকূল সাগরে ভেসে যান। এর পর থেকে এলাকার মানুষ তাকে ‘দুখু সেন’ বলে ডাকতো। নিজে দুঃখ কষ্টের মধ্যে বেড়ে ওঠায় এলাকার গরিব-দুঃখী ও মেহনতি মানুষের কষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। এক সময় তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং তাদের বুকে টেনে নেন। দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে শেখান অবহেলিত হাওর অঞ্চলের মানুষকে। এতে করেই সবার নয়ন কাঁড়তে সক্ষম হন সুরঞ্জিত। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদয় করতে সুরঞ্জিত সেনকে সংসদ প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল দিরাই-শাল্লার মানুষ।
৭৮বছর পূর্ণের ৪ দিন আগে ৫ ফেব্রুয়ারি আত্বীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি সহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিজ এলাকাসহ সর্বস্তরের মানুষকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে ভাটি জনপদের মানুষজন অভিভাবক হারিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন। দিরাই-শাল্লার মানুষজন তার রেখে যাওয়া স্মৃতি বিজড়িত বসত বাড়িতে মনের টানে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় জমান। মৃত্যুর পরের দিন নিজ বাড়িতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। প্রিয় মানুষটির স্মৃতি খুঁজতে প্রতিদিনই তার বাড়িতে আসছেন সর্বস্তরের মানুষ। তার শেষকৃত্য স্থান এক নজর দেখার জন্য লোকজন আসেন। এসময় স্মৃতিময় দৃশ্য দেখে অনেককেই মনের অজান্তে নিরবে-নিবৃতে কাঁদতে দেখা গেছে। সুরঞ্জিতের শেষ স্মৃতিগুলো দেখতে আসা পার্শ¦বর্তী মখছদপুর গ্রামের পঞ্চাশউর্দ্ধ মহিলা খেলাপুতি নাথ স্মৃতিচারণ করে কেঁদে কেঁদে বলেন, বাবুর মতো ভলো ও বড় মনের মানুষ আর হবেনা। তিনি সব সময় আমার খোঁজ-খবর নিতেন। বিপদ-আপদ ও সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন। এখন আমার খবর কে নিবে। বাবুর মৃত্যুতে আমি অভিভাবক হারা হয়েগেছি। কালনী নদীর তীরবর্তী দিরাই পৌরশহরের আনোয়রপুর গ্রামের দুলু-বালি মেখে, সুখে-দুঃখে, হেঁসে-খেলে বড় হওয়া সুরঞ্জিত প্রতিটি মুহুর্ত সহপাঠিদের সাথে মিলে মিশে কাটিয়েছেন। তার আচার-আচরন ও চারিত্রিক গুনে সহপাঠিরা ছিল তার প্রতি আকৃষ্ট। সহপাঠীদের নিয়ে কালনী নদীতে নৌকা বেয়ে ও সাঁতার কেটে বেড়াতেন তিনি। স্কুল জীবন থেকেই অভিনব তার কথা-বার্তায় সবাই মুগ্ধ হতো। যে কারো সমস্যায় পাশে দাঁড়াতেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাতেন ছোট বেলা থেকেই। এক সময় ধিরে-ধিরে সুরঞ্জিত আতœীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ এলাকার মানুষের মন জয় করতে থাকেন। মানুষও তাকে ভালবাসতে শুরু করে। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই সব শ্রেণী পেশার মানুষের প্রতি ভালবাসা দেখিয়েছে। সেই অগাদ ভালবাসার কথা আজও ভূলতে পাড়ছেন না এলাকার মানুষ। ভাটি বাংলার সিংহপুরুষ হিসেবে খ্যাত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর এসব মানুষ অভিভাবক হিনতায় ভোগছেন।
সুরঞ্জিতের পিতা চিকিৎসক দেবেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত দুটি বিবাহ করে ছিলেন। প্রথম স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ১ মেয়েকে কলকাতায় থাকতেন। দ্বিতীয় স্ত্রী সুমতি বালা সেনগুপ্ত থাকতেন দিরাইয়ের আনোয়ারপুরে। দ্বিতীয় স্ত্রী সুমতি বালার গর্ভে জন্ম নেন একমাত্র সুরঞ্জিত। মাতৃগভে থাকার ৮ মাস সময়ে পিতা সুরঞ্জিতের পিতা দেবেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত মারা যান। বাবার ¯েœহ থেকে বঞ্চিত দুঃখি সন্তান মায়ের আদর ¯েœহে বড় হতে থাকেন। যখন দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র তখন হঠাৎ দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে মা’ও মারা যান। মা মারা যাওয়ার পর ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার ছোট সুরঞ্জিতকে তার বড় বোন কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানে তার মন বসেনি, মাতৃভুমি ও এখানের মানুষের টানে আবারো চলে আসেন পৈতৃক বাড়ী আনোয়ারপুরে। পিতা-মাতা হারা সুরঞ্জিত বাল্যকাল অনেকটা দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই পার করেছেন। দুঃখ-কষ্টের সাথে যুদ্ধ করে বেড়ে ওঠা সুরঞ্জিত তখনই দুখু সেন হিসাবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেন। সুরঞ্জিতের অনেক আশা-আখাংকা অপূর্ণ থাকলেও নিজ হাতে লাগানো চন্দন গাছের কাঠ ব্যবহার করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মাধ্যমে তার শেষ আশা পূর্ণকরা হয়েছে। তার নিজ হাতে লাগানো চন্দন গাছের কাঠ দিয়ে দাহ করার আশা ব্যক্ত করে ছিলেন মৃত্যুর আগে। বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান, সাবেক মন্ত্রী, সিলেটিদের মধ্যে বর্ণাঢ্য রাজনীতির শেষ উজ্জল নক্ষত্র, ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শেষকৃত্যের স্থানটি বর্তমানে বাঁশের ব্যাষ্টনি দিয়ে সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে। এ স্থানটি পরবর্তীতে পাঁকাকরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত করা হবে বলে জানিয়েছেন দিরাই উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, ইউপি চেয়ারম্যন আছাব উদ্দিন সরদার। পারিবারিক উদ্যোগে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকেশ^রী মন্দিরে ও ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের এলজি হলে তার শ্রাদ্ধ অনুষ্টান অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে নিজ পৈতৃক বাড়িতে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি। ঢাকায় অনুষ্টান শেষে পরবর্তিতে এখানে শ্রাদ্দ অনুষ্টানের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন পারিবারিক কেয়ারটেকার সুজিৎ চক্রবর্তী।
রোববার দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের গ্রামের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় শত-শত লোকের উপস্থিতি। বাউয়ান্ডারী দেয়ালের ভিতরে দু’তলা একটি বাড়ি। দালানের নিচ তলায় উপজেলা আ.লীগের দলীয় কার্যালয়। উপর তলায় রয়েছে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর বাসভবন। বাড়ীর সামনের অংশে ও পিছনের বিরাট অংশ জোড়ে রয়েছে ফলজ-বনজ এবং ঔষধী গাছের বাগান। নিজ হাতে রোপনকৃত এসব গাছ মানুষের কাছে স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আতœীয়-স্বজন, পড়া-প্রতিবেশী, দলীয় নেতা কর্মীসহ সর্বস্তরের শত শত মানুষ বাড়িতে লাগানো গাছ ও শেষকৃত্য স্থান দেখতে আসেন। এবং স্মৃতি গুলোর দিকে চেয়ে-চেয়ে তাদের প্রিয় নেতার স্মৃতিচারণ করতে দেখা যায় অনেককেই। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সমবয়সী মনোরঞ্জন রায় বলেন, শৈশবে সবার সঙ্গে মিলে-মিশে খেলাধুলা করতেন। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সব সময় দেখা যেত দাদা বাবুকে। স্কুল জীবন থেকেই বিভিন্ন মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতেন তিনি। ঐহিহাসিক ঘটনা নিয়ে সাজানো নাটক সিরাজ উদ-দৌলা ও মোহন লাল চরিত্রে অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছিলেন সেই সময়েই। দিরাই করিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আছাব উদ্দিন সরদার বলেন, সেন বাবু ১৯৭০ সালে ন্যাপ থেকে কুড়ে ঘর প্রতীক নিয়ে যখন প্রথম সংসদ নির্বাচন করেন আমার বয়স ১৮ ছিল। ঐ নির্বাাচনে নৌকার ধাড় টেনে-টেনে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে নিয়ে গেছি নির্বাচনী প্রচারে। তখন থেকে দেখেছি তিনি রসিক মনোভাব নিয়ে সহজেই মানুষের মন জয় করতে পারতেন।
রফিনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজুয়ান হোসেন খাঁনের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, সেন দা সব সময় প্রত্যান্ত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের খবর রাখতেন। তার মৃত্যুতে আমাদের আশার আলো নিবে গেছে। চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পাই। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাড়ীর কেয়ারটেকারের দায়িত্বে থাকা সুজিত চক্রবর্তী বলেন, ৬বছর ধরে স্যারের এখানে কাজ করছি। স্যার আমাকে সাথে নিয়ে বাড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছে রোপন ও পরিচর্যা করতেন। প্রায় ৬ বছর পূর্বে স্যারের নিজ হাতে বাড়ীর আঙ্গীনায় চন্দন গাছ রোপন করে ছিলেন। সেই চন্দন গাছ দিয়েই স্যারের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। এসময় দিরাই-শাল্লার প্রত্যান্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নারী-পুরুষ এসে স্মৃতিচারনসহ কান্না-কাঠি করতে দেখা গেছে। স্থানীয় হারুনুর রশিদ, নারায়ন চক্রবর্তী, ময়না মিয়া, সুধীর বৈষনব, ছাদিকুর রহমানসহ আগত লোকজন বলেন, সদ্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভালবাসার টানে আমরা এখানে এসেছি। রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি গুলো মধ্যেই এখন আমরা দাদাকে খুজছি। এ স্মৃতি গুলোই আমাদের শেষ শান্তনা।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত