শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবস



জহিরুদ্দীন মো. ইমরুল কায়েস ::আজ বিশ্ব ভ্যালেনটাইনস’ ডে বা বিশ্ব ভালবাসা দিবস। এছাড়াও এদিনকে অনেকে ফিস্ট অব সেন্ট ভ্যালেনটাইন ডে- নামে অভিহিত করে থাকেন। প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী এদিনটি পালিত হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষত খ্রিস্টানরা ভ্যালেনটাইনস’ ডে-কে নিয়ে বেশি মাতামাতি করেন। এশিয়া তথা আমাদের দেশেও ভ্যালেনটাইনস’ ডে নিয়ে মাতামাতির কমতি নেই। ফেসবুক, টুইটারের যুগে এ দিনটিকে নিয়ে শহর-গ্রাম এখন সমানভাবে মাতোয়ারা। ভ্যালেনটাইনস ডে-তে বিশ্বব্যাপী ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ তাঁর ভালবাসার মানুষটির নিকট ভ্যালেনটাইন কার্ড বিনিময় করে।
ভালবাসা দিবসের মাহাত্ম্য বিশ্লেষণ করার আগে যাঁকে ঘিরে এ দিবসটি আবর্তিত হয়েছে তাঁর স্মৃতি একটু স্মরণ করা যাক। ২৬৯ সালে ইতালীর রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেনটাইন‘স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। খ্রিস্টানদের ধর্ম প্রচারের অভিযোগ এনে ঐ সময়কার রোমান সম্রাট তাঁকে বন্দি করেন। বন্দী থাকাকালীন সময়ে তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সুস্থ করে তোলেন। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক সেন্ট ভ্যালেনটাইনসের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তৎকালীন রোমান সম্রাট ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
এর দুই শত বছর পরে রোমানদের শাসন যখন নিভু নিভু, ঠিক সে সময়টির সুযোগ নিয়ে ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউ প্রথম জুলিয়াস ভ্যালেনটাইনস্‌ এর স্মরণে ১৪ ফেব্রয়ারিকে ভ্যালেনটাইনস’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে ধর্মোৎসব, জন্মদিন পালনের ক্ষেত্রে ভোগের বিষয়টি থাকে মূখ্য। খ্রিস্টীয় এই চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন দেশ এ দিবসটিকে কয়েকশত বছর আগে নিষিদ্ধও করেছিলো। যেমন- লুইস (ষোল) এর আমলে ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার ভ্যালেনটাইনস’ ডে নিষিদ্ধ করেন। এছাড়া ইংল্যান্ড, অষ্ট্রিয়া ও জার্মানিতে ও বিভিন্ন সময় এ দিবসটি পালন নিষিদ্ধ করা হয়। তবে, কালের পরিক্রমায় বর্তমানে পাশ্চাতেওই এ দিবসটি অত্যন্ত জমকালোভাবে পালিত হয়। এ দিবসটির অতীত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়েছে। ভাষা-জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সারাবিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তার সাথে সারাবিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। অমর প্রেমিক সেন্ট ভ্যালেনটাইন’ আজ থেকে প্রায় ১৮০০ বছর আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর এ অমর কাহিনী ’ভালবাসা’ পূজারী মানুষদের নিকট এখনো কিংবদন্তী হয়ে আছে। সত্য কাহিনীর বিশুদ্ধ ভালবাসা সেন্ট ভ্যালেনটাইনের জীবনে যেমন বিরল নয়, তেমনিভাবে নিখাদ ভালবাসার প্রেমিক-প্রেমিকার জুটিও নিকট অতীতেও দুর্নিরীক্ষ নয়। আমরা লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ, সেলিম-আনারকলি, প্যারিস-হেলেন, ক্লিওপেট্রা-মার্ক এ্যন্থনি, নেপোলিয়ন-যোসেপাইন এর কথা জানি। শাহজাহান-মমতাজের ভালবাসার কীর্তি নিয়ে আগ্রার তাজমহল এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালবাসার জন্য এ পৃথিবীতে অনেক অসাধ্য সাধন হয়েছে তেমনিভাবে আবার অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহও সৃষ্টি হয়েছে শুধুমাত্র এ ভালবাসার কারণে।
তবে ভালবাসার কারণে সম্ভবতঃ সবচেয়ে বেশী সমৃদ্ধি ঘটেছে জগৎব্যাপী বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যসম্ভার। কবিরা প্রেমে না পড়লে বা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত না হলে বা ভাবনার জগতে ডুব না দিলে এত গান, এত কবিতা, এত উপন্যাস লেখা মনে হয় কখনো সম্ভব হতো না। বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ কবি সেক্সপিয়রের অমর কালজয়ী সৃষ্টি রোমিও-জুলিয়েট। যুগের পর যুগ তাঁর এ কালজয়ী লেখাটি প্রেমিক যুগলদের মনে দাগ কেটে যাচ্ছে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভালবাসার কথা আমরা পেয়েছি। কবিগুরুর হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া কাদম্বরী ও মৃণালিনী দেবী এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-যাকে রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছেন বিজয়া-র কথা আমরা জানি। বিদ্রোহী কবির জীবনে ঝড় তুলেছিলেন নার্গিস, ফজিলুতেন্নেসা ও প্রমীলা। এই দুই কবির জীবন ও শিল্পের ক্যানভাসে প্রেমের যে বাণী বিধৃত হয়েছে তা কালজয়ী হয়েছে।
আপনি যাকে ভালবাসেন আর সে ভালবাসা আপনি যেখানেই প্রকাশ করেন না কেন সেটি কোন না কোনভাবে আপনার প্রেমিক-প্রেমিকা বা প্রণয়ী-প্রণয়িনীর তা বোধগম্য হবেই। প্রেমিকের লেখাগুলো সংশ্লিষ্ট প্রেমিকার কাছে বার্তা আর বার্তাগুলো কাব্যরসিকদের কাছে কবিতা-গান কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে কালের পরিক্রমায় মহাকাব্যে পরিণত হয়। এভাবে সৃষ্টি হয় সাহিত্য। ভালবাসা নামক শব্দকে কোনভাবেই ব্র্যাকেট বন্দি করা উচিত নয়। আসুন, দু’হাত ভরে আমরা ভালবাসা দিই, আর বুক ভরে ভালবাসা গ্রহণ করি। ভালবাসা দিবসে জগতের সকল মানবের প্রতি ভালবাসা আর লাল গোলাপের শুভেচ্ছা।
লেখক : প্রাবন্ধিক

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত