সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সিলেটের ৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে ১৯ নেতার লবিং



নুরুল হক শিপু ::আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে শাসকদল আওয়ামী লীগ। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেশের সকল বিভাগে প্রতিনিধি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী ২২ মার্চ সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সিলেট জেলার ৬টি আসনে প্রার্থী নির্ধারণ করতে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মনোনয়ন পেতে নানা কৌশলে তৎপরতা চালাচ্ছেন। সিলেটের ৬টি আসনে ১৯ জন মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। দলীয় মনোনয়ন না পেলে এঁদের মধ্যে কেউ কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হতে পারেন। কোনো আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে ওই আসনে আওয়ামী লীগের ফলাফল বিপর্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। এমন আভাস পাওয়া গেছে গত উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে।
আগামী সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ৬ আসনে ১৯ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় বিদ্রোহের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেউ কেউ এখনই বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন বলে হুংকার দিচ্ছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলা ও সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর ভরাডুবি ঘটে।
নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে দলের নেতাকর্মীদের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ অবস্থান নিলে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও সরকারের গত ৮ বছরের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যেতে নির্দেশনা দেন।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় সম্প্রতি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক আখতারুজ্জামান চৌধুরী জগলু এবং জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মুক্তাদীর আহমদ মুক্তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে তাঁদের প্রাথমিক সদস্য পদও স্থগিত করা হয়েছে।
সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের মাথায় এখন শুধু আগামী সংসদ নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনে সিংহভাগ আসন নিজেদের কব্জায় রাখতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন নেতারা। নির্বাচনকে সামনে রেখেই আগামী ২২ মার্চ দলের বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। তাই এখন থেকেই সংসদ সদস্য মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা দেশে-বিদেশে লবিং-তদবির করছেন।
সিলেট-১ : সিলেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন সিলেট-১। এ আসন থেকে যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনিই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচন থেকে এ ধারা চলে আসছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন চাইবেন। তবে চারজনের নাম শোনা যাচ্ছে। ওই চারজন থেকেই একজন শেষ পর্যন্ত হবেন দলীয় প্রার্থী। তাঁরা হলেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তাঁর অনুজ জাহিসংঘে সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. একেএম আবদুল মোমেন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, কেন্দ্রীয় সদস্য এবং সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এঁদের মধ্যে ড. মোমেনকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি অনুষ্ঠানে নিজে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই দিন অর্থমন্ত্রী তাঁর অনুজ ড. মোমেন সিলেট-১ আসনে প্রার্থী হবেন বলেও আভাস দেন।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী ২২ মার্চ দলের বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এখন আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নেত্রীর সিদ্ধান্তে কাজ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের কর্মী-সমর্থক ও সিলেটের মানুষের প্রত্যাশা সিলেট-১ আসনে আমি প্রার্থী হই। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমি রাজনীতি করি। তবে দল চাইলে সিলেট-১ আসনে আমি নির্বাচন করব। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে আমার কোনো মতামত নেই।
সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘আমার মা মৃত্যুর আগে সিলেটের মানুষের হাতে আমাকে তুলে দিয়েছিলেন। সিলেটের মানুষ আমাকে অন্তর থেকে ভালোবাসেন। এ ভালোবাসার প্রতিফলন মানুষ বার বার দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি দলের ছায়ায় রয়েছি। দলের সিদ্ধান্তই আমার কাছে সবচেয়ে বড়। দল আমাকে যেখানে যোগ্য মনে করবে, আমি সেখানেই কাজ করব।’
সিলেট-২ আসনে তিন চৌধুরীসহ ৬ জন : এ আসনে ৬ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থী দেখা যেতে পারে। বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ একাংশ নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে ‘চৌধুরী’ রয়েছেন তিনজন। এঁদের মধ্যে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এক নেতাও রয়েছেন। সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীই এ আসনে মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা। আর যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদ আনুয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সমর্থকেরা তাঁকে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী দেখতে চান। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা বেশ উজ্জীবিত। তবে এবার প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ওসমানীনগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আখতারুজ্জামান চৌধুরী জগলু নিজে সংসদ সদস্য প্রার্থী হবেন বলে গত সোমবার এক সমাবেশে ঘোষণা দেন। যদিও ইতোমধ্যে তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এছাড়াও এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আ.ন.ম. শফিকুল হক, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য এসএম নুনু মিয়া এবং বিশ্বনাথের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন। এঁদের মধ্যে মুহিবুর রহমান গত সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন।
সিলেট-৩ : দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের একাংশ নিয়ে গঠিত সিলেট-৩ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য হচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী। তিনি এ আসন থেকে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবারও তিনি মনোনয়ন চাইবেন। তবে তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক হাবীবুর রহমান হাবীব।
এঁদের মধ্যে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ গত সোমবার ফেঞ্চুগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা চেতনা বাস্তবায়ন মঞ্চের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বলেছেন, সিলেট-৩ আসনে আগামীতে সঠিক প্রার্থী না মিললে নেত্রীর অনুমতিক্রমে তিনি নিজে এ আসনে নির্বাচন করবেন।
সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী জানান, গত দুবারে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ করিয়েছি। জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতির ১৫ ভাগ কাজ এখনো বাকি আছে। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আবারো মনোনয়ন চাইবেন জানিয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দল ও নেত্রীর সিদ্ধান্ত অবশ্যই মেনে নেব। মনোনয়ন না পেলেও দলের প্রার্থীর জন্য কাজ করব।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক হাবীবুর রহমান হাবীব বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে মানুষের পাশে থেকে কাজ করছি। নৌকা প্রতীক নিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দলের মনোনয়ন চাইব। তিনি বলেন, গত নির্বাচনেও মনোনয়ন চেয়েছিলাম। দল এবার আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে আমি আশাবাদী। তিনি বলেন, মনোনয়ন পেয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে জনগণের সেবক হয়ে কাজ করাই আমার লক্ষ্য।
সিলেট-৪ : জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন ৩ জন। এঁরা হচ্ছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদ, গোয়াইনঘাট ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা মো. ফজলুল হক। এঁদের মধ্যে গত সংসদ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারুক আহমদ দলের বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচন করেছিলেন। আর অধ্যক্ষ মো. ফজলুল হক গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয় চেয়েছিলেন; কিন্তু পাননি। তিনি জানান, গত নির্বাচনে মনোনয়ন পাইনি। এবার দল আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে আমি আশাবাদী। তবে দলের যে-কোনো সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিয়ে দলের কর্মী হিসেবে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন।
সিলেট-৫ : কানাইঘাট-জকিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন দুজন। এঁরা হচ্ছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আহমদ আল কবির। এ দুজনের মধ্যে মাসুক উদ্দিন গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান। তবে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে তিনি নির্বাচনের আগে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন।
মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন বলেন, মানুষের সেবা ও এলাকার উন্নয়নের জন্য এবার তিনি মনোনয়ন চাইবেন। তিনি বলেন, দলের নির্দেশে গতবার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। এবার দল ও নেত্রী আমাকে মূল্যায়ন করবেন কলে আমার বিশ্বাস। তবে দলের স্বার্থে যে-কোনো সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেবেন।
সিলেট ৬ : গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৬ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তাঁর কর্মী-সমর্থক এবং দলের সিংহভাগ নেতাই এ আসনে ফের তাঁকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। সবার প্রত্যাশা পূরণে আগামীতেও শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর একাধিক ঘনিষ্ঠজন। তবে এবার এ আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন কানাডা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সারওয়ার হোসেন। তবে শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নৌকার মাঝি হবেন বলে দলের এককাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন।
বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের জন্য দলের সকল শ্রেণির নেতাকে কাজ শুরু করতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সিলেটের ছয়টি আসনের কোনো আসনেই বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে কেউ দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে কেন্দ্র কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে হাইকমান্ড থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত