বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকদের চোখে ঘুম নেই, কষ্টের অনুভূতিগুলো তাই ফেসবুকের পাতায়…



মারুফ হাসান ::সংবাদের খোঁজে সাংবাদিকরা ছুটেন দিক-দিগন্তে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলস পরিশ্রমে দেশবাসির সামনে তুলে ধরেন ঘটনা-দুর্ঘটনা। তাদেরকে বলা হয় জাতির বিবেক। একজন সাংবাদিক তাঁর লিখনিতে অনিয়ম, অন্যায়, দুর্ণীত, কুসংস্কার তুলে ধরেন । এতে মানুষ হন সচেতন। দেশ হয় সুন্দর।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকার ‘আতিয়া মহলে’ গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে জঙ্গি নিধন অভিযান চলানো হচ্ছে। সেই সংবাদ সংগ্রহে সিলেটের গণমাধ্যমকর্মিরা যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তা প্রসংশার দাবি রাখে। জঙ্গি অভিযানের সংবাদ সংগ্রহে প্রথম দিন থেকেই সাংবাদিকরা তৎপর ছিলেন। তাইতো দেশবাসি জানতে পারলেন সিলেটে জঙ্গি আস্তানার খবর। চতুর্থদিনের অভিযান শেষেও সেই সংবাদকর্মীরা দেশবাসিকে জানালেন সর্বশেষ আপডেট।
কেন্তু প্রতিমুহূর্তের এই সংবাদ সংগ্রহ করতে সাংবাদিকদের অনেক কষ্ট, ত্যাগ আর লাঞ্ছনা সইতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া তাদের সেই স্মৃতিময় অনুভূতি শেয়ার করেছিলেন ফেসবুক ওয়ালে।
জঙ্গি নিধন অভিযানের খবর সংগ্রহ শেষে বাড়ি ফেরা পথে ২৫ মার্চের বোমা হামলায় ক্ষতবিক্ষত হবার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পান সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকরামুল কবির। অনুভূতি প্রকাশ করেন ফেসবুকে। তিনি লিখেন, আলহামদুলিল্লাহ। এক মিনিটের ব্যবধানে বেঁচে আছি।
সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ রেনু ২৫ মার্চ ফেসবুকে লিখেছেন, সিলেটের শিববাড়িতে জঙ্গি আস্তানায় সেনা বাহিনীর নেতৃত্বে চলছে অপারেশন টোয়ালাইট। বাহিরে ঝড় বৃষ্টি। বিপাকে পেশাগত দায়িত্ব পালনে এলাকায় থাকা সাংবাদিকরা। আমাদের এই অবস্থায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কুটি স্যানেটারীর আফজাল হোসেন। বন্ধ থাকা দোকান খুলে দিয়ে বসার স্থান করে দেন। ঝড় বৃষ্টির কবল থেকে সাময়িক রক্ষা পান সাংবাদিকরা। যদিও সেখান থেকেও নিরাপত্তার অজুহাতে সরিয়ে দেয়া হয় আমাদের।
005দৈনিক প্রথম আলোর সিলেট ব্যুরো প্রধান উজ্জল মেহেদী ২৫ মার্চ তাঁর ফেসবুকে লিখেন, বিস্ফোরণ গুলির শব্দে আজ সারা দিনই কাঁপছিলাম। নিজেদের যুদ্ধ-সাংবাদিক মনে হয়েছিল। শেষে এসে আক্রান্ত কি সাংবাদিক?… আক্রান্তের অনেক কাছে ছিলাম আজ সন্ধ্যারাতে।…
দৈনিক সবুজ সিলেটের বার্তা সম্পাদক ছামির মাহমুদ ২৫ মার্চের বোমা হামলা থেকে অপ্লের জন্য বেচে যান। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে ফেসবুকে লিখেন, অল্পের জন্য রক্ষা পেলাম আমরা কয়েক জন সাংবাদিক। সেনাবাহিনীর প্রেস ব্রিফিং শেষে ফেরার পথে আতিয়া মহলের পাশেই বোমা হামলায় দুই পুলিশ সদস্য ও এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হয়েছেন, র‍্যাব ও পুলিশ, আমার সহকর্মী ফটোসাংবাদিক আজমল আলীসহ গুরুতর আহত হয়েছেন আরো ৪০ জন। তবে আমি, উজ্জ্বল ভাই, আনিস মাহমুদ অল্পের জন্য রক্ষা পাই। আল্লাহ সহায় হোন সবার প্রতি। সকলকে হেফাজত করুন। যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত সুস্থতা আর নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
004সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারী এবং নিউজ২৪-এর সিলেট ব্যুরো প্রধান নবেল চৌধুরী লিখেছেন, টানা সাড়ে ৪৩ ঘন্টা পর ঘরে ফেরা। ভোরে আবার দেখা হবে মর্জিনা। দেখা হবে শিববাড়ির আতিয়া মহলে।
সাংবাদিক খালেদ আহমদ ঘটনা প্রবাহে প্রশ্ন রেখেছেন, আমাদের শিশুদের জন্য এই শহর নিরাপদ তো? দোয়া করেছেন। বলেছেন, হে আল্লাহ্ সিলেটকে হেফাজত করুন, জঞ্জিরা (জংলি ) যেন কোন ক্ষতি করতে না পারে।
সময় টিভির সিলেট প্রতিনিধি এমএ আহাদ ২৫ মার্চ রাতে লিখেছেন, প্রিয় বাংলাদেশ, তোমার বুকে বড়ই অনিরাপদে আছি গো! একটি বাসায় আশ্রয় নিতে পেরেছি এখন! ২৬ মার্চ লিখেছেন একটি সুন্দর সকালের অপেক্ষায় আরেকটি নির্ঘুম রাত। তাঁর শুভাকাঙ্খীরা নির্ঘুম-ক্লান্ত ছবি পোস্ট করতে ভুলে যাননি।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর সিলেট প্রতিনিধি সুয়াইব হাসান ২৭ মার্চ লিখেছেন, অনেক হলো। সারাদিন রাস্তার পাশে প্রচন্ড গরম, ক্ষুধার জ্বালায় জলেছি। এখন অন্ততঃ একটু রেস্ট নিতে পারি যদি,,,।
চ্যানেল ২৪-এর সিলেট প্রতিনিধি গুলজার আহমেদ ২৫ মার্চ তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, জীবনের ভয়াভহ দুটি দিন পার করলাম, তবে সম্পুর্ন. ভাল ও সুস্থ এবং নিরাপদ আছি সৃষ্টিকর্তার কল্যানে..সেনাবাহিনীর প্রেস ব্রিফিং শেষে ফেরার পথে বোমা হামলার শিকার …. তিনশ গজ দুরে থাকায় অল্পের জন্য রক্ষা পেলাম আমরা কয়েক জন সাংবাদিক তবে এক সাংবাদিক সহ গুরুতরো আহত সাতজন, কিন্তু পরক্ষনেই খবর পাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সহ মারা যান চারজন। খুবই দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক।
তিনি আরো লিখেছেন, দিনে গুলি আর গ্রেনেডের আঘাতে জান শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম, মানুষের হুড়মুড়ি খেয়ে বার বার ৭/৮ জনের স্তুপের নিচে চাপা পড়ে আমি আর আমার অফিস সহকারী শরীরে ব্যাথা – টানা ৪৮ ঘন্টা রাস্তায় এক পোষাকে সময় কাটানো এবং সহকর্মীদের নিয়ে প্রতিটা সময় আতংকের মধ্যে থাকার অভিজ্ঞতাটা সত্যি জীবনের দুর্লভ অর্জন । তবে সঙ্কা এখনো শেষ নয় কারণ বহুতল ভবনে আটকে পড়া সাধারণ মানুষ উদ্ধার হলেও এখনও নিরাপদ নয় পাঠান পাড়া এলাকার মানুষ । এখনো জঙ্গিরা সদর্পে প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । অপারেশন টোয়াইলাইট সফল হোক এই প্রত্যাশা রইল । আর স্থানীয় বাসিন্দারা আরেকটু সতর্ক হলে নিজেরাই বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন বিষয়টা যেন মাথায় রাখেন সবাই ।
পরে অন্য একটি স্ট্যাটাসে গুলজার লিখেন, স্বাধীনতা দিবসে জঙ্গি বিরুধী অপারেশনের নিউজ করতে হচ্ছে-স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সত্যিই লজ্জাজনক । আসুন না আমরা নিজেরা সচেতন হই সাথে আমাদের আশেপাশের মানুষ জনকেও সচেতন করে তুলি। কেবল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীই দায়িত্ব পালন করলে হবে না আমাদের সবারই দায়িত্ব আছে দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তোলার।
003এনটিভির সিলেট প্রতিনিধি মারুফ আহমদ ২৪ মার্চ ফেসবুকে লিখেছেন : রাত ১২ টা। এখনও শিববাড়ি। বাইরে সোয়াট আর সেনাবাহিনীর চলছে তৎপরতা। আর জঙ্গিরা কি করছে জানা নেই!
একাত্তর টেলিভিশনের সিলেট ব্যুরো প্রধান ইকবাল মাহমুদ সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি সেবার চেষ্টা করেছেন তিনি ২৫ মার্চ ফেসবুকে একটি সহযোগিতার আহবান জানিয়ে লিখেন, প্রচুর রক্তের প্রয়োজন। প্লিজ হৃদয়বানরা আসুন ওসমানী হাসপাতালে। শুধু ইকবার মাহমুদ নন আরো অনেক সংবাদকর্মী আহতদের জন্য মোবাইল ফোনে রক্ত দানে অনেককেই উৎসাহিত করেছেন। নিজে দিয়েছেন রক্ত।
সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারে একটি চরম কঠিন সময় পার করছি; -এমন মন্তব্য শেষে সবার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন সিলেটে চ্যানেল আইয়ের সাদিকুর রহমান সাকি।
জঙ্গি অভিযান নিয়ে বাকরুদ্ধ বাংলানিউজ২৪-এর সিলেট প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন লিখেছেন, কিছু দুঃসহ স্মৃতি অবর্ণনীয়।
শিববাড়ির যেই পুলিশের চেক পোস্টে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেই পথ দিয়ে প্রেসব্রিফিং শেষে বেরিয়ে আসছিলাম আমরা কজন সাংবাদিক। স্পট থেকে অল্প দূরে অবস্থানকালীন সময়ে এই বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। আল্লাহ আপনার অপার শুকরিয়া আমাদের রক্ষা করার জন্য। সুস্থ আছি, ভালো আছি। এভাবেই ফেসবুকে শুকরিয়া আদায় করলেন দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকার রিপোর্টার নূর আহমেদ।
দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার আলোকচিত্রী হুমায়ূন কবীর লিটন ২৬ মার্চ তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন : শরীর আর চলছে না। হাত-পা ব্যাথা করছে । দু- চোখে কেবল ঘুম। ১০-১১ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এমন কঠিন কাজের অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে । শিববাড়িতে জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহলে’ চালানো অপারেশন টোয়াইলাইট এর ছবি সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকতা জীবনের ভয়াভহ ৩টি দিন পার করলাম। আগামী কালের ভাল সংবাদের আশার আজ ঘুমিয়ে পড়লাম সবাই দোয়া করবেন ।
শনিবারের মোবা হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান গণমাধ্যম কর্মীরা। ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে এটিএন বাংলার সিলেট প্রতিনিধি মুনসি ইকবার লিখেছেন, গত কাল সন্ধ্যায় আক্রান্ত স্থলের কাছেই ছিলাম আমরা অল্পের জন্য সবাই বেঁচে ফিরলাম। দোয়া করবেন সবাই।
তাঁর এই লেখার জবাবে মিনহাজ মিরাজ নামের একজন লিখেছেন, সিলেটের প্রিয় সংবাদকর্মী বড় ভাইয়েরা, গত দু’দিন ধরে আপনারা আহার, নিদ্রা ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খুব কষ্টে সময় পার করছেন শুধু মাত্র জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য। দোয়া করি সবাই অভিযান সফল হয়ে আসবেন। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে আবেদন, আপনারা যাতে সুস্থ শরীর নিয়ে অভিযান সফল করেন। সব সময় যে যেখানেই আছেন একটু সেইভে থাকার চেষ্টা করবেন।
দৈনিক যায়যায় দিনের সিলেট ব্যুরো প্রধান কাইয়ূম উল্লাস লিখেছেন, অল্পের জন্য বেঁচে গেলাম। শিববাড়ি পাঠানপাড়ার শাহিন মিয়ার বাড়িতে উদ্ধারকৃত ৭৮ জন মানুষের জবানবন্দি ও সেনাদলের ব্রিফিং শেষ হয়েছে। ওই বাড়ির রাস্তা দিয়ে মেইন সড়কে আসছিলাম। গোটাটিকর দাখিল মাদ্রাসার সামনের সড়কে চেকপোস্টে পাবলিকের ছদ্মবেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। ২০০ গজ দূরে ছিলাম। ফোনে কথা বলে আসছি। প্রথমে ভেবেছিলাম সারাদিনের মতো শব্দটি ওই ভবন থেকেই এসেছে হয়তো। কিন্তু না । পরমুহুর্তেই একজন লোক উল্টোদিক থেকে এসে রক্তাক্ত হাত পা দেখিয়ে বলছে, মোর শরীরে বোমা পড়ছে। রাস্তায় আরও ৪জন পড়ে আছে’ দেখলাম, তার হাতে স্প্লিন্টার বিঁধেছে। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ দূরে দৌড়ে সরে গেলাম। এর খানিক পর দেখলাম, একজন লোককে কোলাপাঁজা করে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিচ্ছেন পথচারীরা। লোকটি মারা গেছে বলে জানা গেছে। থ্যাংকস আল্লাহ।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়িতে জঙ্গি নিধনের সংবাদ সংগ্রহে সিনিয়র সাংবাদিকদের অনেকেই দিনরাত পেশাগত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট করেছেন একটু বসবার সুযোগ পাননি। এলাকার খাবার দোকানগুলো বন্ধ থাকায় অনেককেই খুদা নিয়ে ঘুরতে হয়েছে পুরো শিববাড়ি। বাসায় এসে খাবার খাবেন কিংবা একটু ঘুমাবেন এমন ভাবনা মনে আসলেও তা আমলে নেননি সাংবাদিকরা। কারণ একটাই, যদি তাঁর অনুপস্থিতিতে ঘটে যায় কোনো বড় ঘটনা। সংবাদ সংগ্রহ থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কায় ঘুম নেই তাদের চোখে, কষ্টের অনুভূতিগুলো তাই ফেসবুকের পাতায়…

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত