রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

এই কাদামাটির ঘরেই দিবসরজনী পার করেন শ্রমিকরা



জালাল আহমদ:: স্পষ্টই গণনা করা যাচ্ছে বুকের হাড়গুলো! শার্টহীন নগ্ন শরীরজুড়ে দারিদ্র্যের গাঢ় প্রলেপ, যা তাকে আলাদা করে রেখেছে সবার থেকে। এর সাথে রয়েছে ক্লান্তির বিন্দু বিন্দু বিস্তৃত ঘামও। তার শরীরের এই কালচে-তামাটে রঙটি যতো না তার আপন শরীরের নিজস্ব রঙ, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি ইঙ্গিতবাহক-বছরের পর বছর ধরে তীব্র রোদে পুড়ে যাওয়া দারিদ্রপিষ্ট চা শ্রমিকদের জীবনের প্রতিটি অজানা অধ্যায়ের। যে চা শ্রমিকদের শ্রমে নির্মিত আমাদের আয়েশে পান করা ‘চা’ প্রতিটি চুমুকে অতুলনীয় অনুভূতির জন্ম দেয় সেই শ্রমিকরাই বাসস্থান সংকটের শিকার। একটি ঘরে মাঝারি আকারের ঘরে গাদাগাদি করে আট-দশ জনের এই বেশ ভালো থাকা!
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত ফিনলে চা কোম্পানীর লাখাইছড়া চা বাগানের শ্রমিক আমিন ভূমিজের একটি মাটির ঘর তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে তিনি একা নন, রয়েছেন একজন কারিগরও। তিনি কারিগরের সহযোগি হয়ে নিজের ঘর তৈরির কাজে নেমেছেন। সম্প্রতি লাখাইছড়ার মেডিক্যাল লাইনে গিয়ে এই দৃশ্য দেখা গেলো।
মাটির ঘর একটি পরিবেশবান্ধব গৃহ। স্থাপনাশৈলীতেও এর রয়েছে ব্যাপক ভিন্নতা ও চাহিদা। পর্যটকদের অস্থায়ী অবাসন হিসেবে এটি ধীরে ধীরে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু চা শ্রমিকদের এই মাটির ঘরগুলো তেমন নয়! এগুলোতে কোনোক্রমে দিবসরজনী পার করা মাত্র! এই কাদামাটির ঘরেই চা শ্রমিকদের ঠাঁই! একদিন বা একমাস নয়; বছরের পর বছর! যুগের পর যুগ! তবে কেউ কেউ পাকাঘরে বসবাসের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। অবশ্য তা হাতেগোনা।
ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা ঠিকঠাক করতেই আমিন এবং তার ঘর তৈরির কারিগর লজ্জার হাসি হেসে ততোক্ষণে শার্ট পরে ফেলেছেন। পুনরায় তাদের শার্ট খুলিয়ে পাঁজরের হাঁড়গুলোর ছবি তুলে বাহবা নিতে একদমই মন মানলো না। বাগান থেকে ঘর তৈরির কোনো সাহায্য পাওয়া যায় কি-না? এ প্রশ্নের উত্তরে আমিন ভূমিজ কিছুটা হতাশার সাথে জানালেন, কোম্পানী থেকে মাত্র কিছু টিন আর দরজা দেয়া হয়। অতিরিক্ত টিনগুলো, মাটির দেয়াল এবং কারিগর নিয়োগ সব নিজের ক্রয় এবং জোগাড় করতে হয়। মাটির ঘর নির্মাণের খরচ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার এ ঘরটি ছয় ফুট এবং পনের ফুটের। এ ঘরটিতে আমার প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
মাটির ঘর তৈরির বিষয়ে কারিগর অরুণ মহালি জানালেন, প্রথমে মাটি খুঁড়ে ড্রেন তৈরি করতে হয়। তারপর সেই ড্রেনে নতুন মাটি দিতে হয়। যে কোনো মাটি হলে হবে না; হতে হবে আঁঠাজাতীয় মাটি। তারপর ধীরে ধীরে কাদামাটি ভরে ভরে দেয়াল তুলতে হয়। প্রায় দু’মাস সময় লাগে। তিনি আরও জানালেন, একেকটা মাটির ঘর তৈরিতে নয় ফুট করে পাঁচ-ছয় বান টিন লাগে। এক বান সমান আটটি টিন। ভালোমতো ঘর তৈরি করলে একটি মাটির ঘর প্রায় পঞ্চাশ থেকে সত্তর বছর পর্যন্ত টেকসই হয়। এসব কথা বলতে বলতে এক সময় থেমে গেলেন আমিন। কিছুটা গম্ভীর দেখাচ্ছে তাকে। ভারী কণ্ঠে বললেন, আমাদের এইসব কথা-টথা লিখে বিপদে ফেলবেন না তো বাবু? প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর আবার চললো কথা। পুনরায় ঘরের প্রসঙ্গ আসতেই আমিন বলে উঠলেন, একটা তো আমাদের স্বপ্নের প্রসাদ আছে বাবু! যেখানে বউ-বাচ্চাদের নিয়ে দিন কাটাবো।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত