বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্য উপেক্ষা করে শিক্ষা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে চা শ্রমিকরা



জালাল আহমদ:: শত শোষণ, নিপীড়ন আর বৈষম্য থাকা সত্ত্বে শিক্ষা ক্ষেত্রে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানের শ্রমিকরা। শিক্ষা ক্ষেত্রে চা শ্রমিকরা অনেক দূর এগিয়েছে। শিক্ষার দ্যূতি ছড়িয়ে চা শ্রমিকদের অনেকেই এখন জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সেক্টরে চাকুরিরত। তবে পর্যাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারবে সকল ক্ষেত্রে বঞ্চিত চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। তবে এ আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায় না, অদূর ভবিষ্যতে এসব বাগানে চা শ্রমিক আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হবে। হুমকির মুখে পড়বে চা শিল্প। তাই বিকল্প পথটিও খুঁজে বের করতে হবে সংশ্লিষ্টদের-এমনটাই অভিমত বিশ্লেষকদের।
সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে শ্রীমঙ্গলের খেজুরিছড়া চা বাগানের চা শ্রমিকদের মহল¬ার টেপে খাবার পানি নিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় অসংখ্য নারী-শিশুকে। অ্যালুমিনিয়ামের এক কলসি খাবার পানি সংগ্রহ করতে তাদের অপেক্ষা করতে হয় টানা এক ঘণ্টা। উপজেলার রাজঘাট ইউনিয়নের খেজুরিছড়া চা মহল্লায় খাবার পানির টানাপোড়েন লেগেই থাকে। এই বাগান ছাড়াও অন্যান্য চা বাগানে খাবার পানির তীব্র সংকট রয়েছে। জেলার বিভিন্ন বাগান ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, জেলায় ৯২টি চা বাগান রয়েছে। চা চাষের জমির পরিমাণ ৩২ হাজার ৭০৮ হেক্টর। আর চা উৎপাদনের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৭৮ হাজার কেজি। ৯২টি চা বাগানের অধিকাংশ বাগানেই চা শ্রমিক পাড়ায় খাবার পানির সংকট তীব্রতর বলে জানালেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী। তিনি জানান, গভীর নলকূপ থেকে যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নারী ও শিশুদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে চা বাগানের কাজে সময়মতো যেতে পারেন না। নিরাপদ খাবার পানি সংকটের কারণে চা বাগানের নারী ও শিশুরা পেটের পীড়াসহ নানা অসুখে আক্রান্ত হয়ে থাকে। একই অবস্থা বিরাজ করছে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও। তিনি আরও জানান, শিক্ষা ক্ষেত্রে শূন্যের কোটা থেকে এখন অনেক দূর এগিয়েছে চা শ্রমিকরা। তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে সরকার আরও আন্তরিক হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। যদিও সরকার চা শ্রমিকদের উন্নয়নে মজুরি বৃদ্ধিকরণসহ একাধিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি হয়েছে রাজনগর চা বাগানের শ্রমিক বিমল ও নীলিমার তিন বছরের ছেলে সিবাস। নীলিমা জানায়, রাজনগর চা বাগানের আশপাশে কোনো হাসপাতাল নেই। তাই ছেলেকে নিয়ে সরাসরি সদর হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, স্বামী বিমল ও তিনি রোজ ৮৫ টাকা বেতনে রাজনগর চা বাগানে কাজ করেন। এ দিয়ে সংসার চলে না। এর ওপর ছেলের চিকিৎসা ব্যয় তিনি কীভাবে মেটাবেন। শুধু রাজনগর চা বাগান নয়, মৌলভীবাজারের অন্যান্য চা বাগানে চিকিৎসা বলতে শুধু বাগানের ডিসপেনসারি। সরকারি চিকিৎসা সেবা নেই বললেই চলে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা: সত্যকাম চক্রবর্তী জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে চা বাগানের শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবা বাগানের অধীনে হয়ে থাকে। সম্প্রতি সরকার বাগানগুলোতে সরকারি চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু করেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার মৌলভীবাজারে ৯২টি চা বাগানে সরকারের ৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়েছে চা বাগানের শিশুরা। যদিও অনেক বিদ্যালয় এখনও সরকারিকরণ হয়নি। কয়েকটি চা বাগানে স্কুল খুলতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন চা শ্রমিকদের বসতি এলাকা রামনগরের মণিপুরী গ্রামে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফ’র সহযোগিতায় পরিচালিত ব্র্যাক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা রোহেনা আক্তার। তিনি জানান, চা বাগানের শিশুদের স্কুলে যাওয়ার হার বেড়েছে। কিন্তু মা-বাবা চা বাগানে কাজ করায় তাদের ছোটো সন্তানকে শিশুদের কাছে রেখে যান।
ইউনিসেফ’র সিলেট বিভাগের উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ কার্যক্রমের প্রধান কর্মকর্তা সাঈদ মিল্কী জানান, চা বাগানের শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
এ সম্পর্কে সমনবাগ চা বাগানের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহজাহান ও মৌলভীবাজার চা বাগানের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম মামুন জানান, চা শ্রমিকদের আগের তুলনায় এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা অনেক উন্নত হয়েছে। চা শ্রমিক পাড়ায় শিশুদের স্কুলে যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে।
চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনমান বিষয়ে কয়েক বছরে ধরে গবেষণা করছেন জনউদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি জানান, বাংলাদেশের সব চা বাগানই একই ধরণের, তা ফিনলে-ডানকান-ইস্পাহানি-ই হোক আর সরকারি বাগান অথবা ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানই হোক, এসব বাগানে রয়েছে শ্রম শোষণ, মজুরি বৈষম্য, শিশুশ্রম, লিঙ্গীয় নিপীড়ন, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক বিষের ব্যবহার, বহিরাগত বাণিজ্যিক মদের ব্যবসা, ঔপনিবেশিক মনস্তাত্ত্বিক শাসন, প্রত্যক্ষ দাসত্বপ্রথা, খাবার পানির অভাব এবং বাগানের শিশুদের জন্য শিক্ষার কোনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না রাখা এবং সর্বোপরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা না থাকা। এমন অসংখ্য অন্যায়-অবিচার ছড়িয়ে রয়েছে দেশের সব ক’টি চা বাগানে। কবে এদের মুক্তি মিলবে-এ প্রশ্ন তাই বাগানে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকদের।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত