শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

রাজনগরে জ্বরের প্রকোপ



রাজনগর প্রতিনিধি:: মৌলভীবাজারের রাজনগরে দুর্গত এলাকায় জ্বরের প্রকোপ দেখা দেয়ায় মাত্র ৪ দিনের ব্যবধানে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজনগরের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত কুশিয়ারা নদী ও কাউয়াদীঘি হাওরের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে এক মাসব্যাপী বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন পাঁচগাঁও, ফতেহপুর, মুন্সীবাজার, উত্তরভাগ ও মনসুরনগর ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছে পাঁচগাঁও ইউনিয়নের আমিরপুর গ্রামে। আক্রান্ত এলাকায় এখনও কোনো মেডিক্যাল টিম কাজ করেনি বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। জ¦রে মৃত্যু হওয়া ২টি শিশু হচ্ছে আমিরপুর গ্রামের রুকু মিয়ার মেয়ে তামান্না বেগম (৯) এবং কুটি মিয়ার মেয়ে রুমা বেগম (১৪)। ৫ দিন যাবত তারা জ্বরে ভোগছিলো। সূত্র জানায়, স্থানীয়ভাবে গ্রামীণ চিকিৎসকের মাধ্যমে ওই শিশুর চিকিৎসা চলছিলো। এদের মধ্যে তামান্নাকে গত ০৩ জুলাই রাতে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। এদিকে রুমা বেগমকে গত ০৫ জুলাই রাতে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন ০৬ জুলাই সেখান থেকে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন চিকিৎসক। আর্থিক টানাপোড়নের কারণে পরিবারের সদস্যরা তাকে সিলেট না নিয়ে ওইদিন বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পথে সে মারা যায়। মৃত দু’জনই একই বাড়ির।
সরেজমিনে গেলে তামান্নার পিতা রুকু মিয়ার সাথে কথা হয়। তিনি জানান, আমার মেয়ের জ্বর ছিলো। আমরা অভাবী মানুষ। সঠিকভাবে চিকিৎসা করাইতে পারিনি। হাওরে মাছ ধরি তা বিক্রি করি সংসার চালাই। এখন ভাসান পানি। মাছ ধরতে পাই না। কোনো সাহায্যও পাইছি না।

কথা হয় রুমা বেগমের মা জাকেরা বেগমের সাথে। তিনি বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা সিলেট নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন কিন্তু মেয়ের অবস্থা বেশি খারাপ দেখে বাড়িতে নিয়ে আসার পথে মারা যায়। অপরদিকে গ্রামের স্বপ্না বেগম, শিশু তাকলিমা ও মন্টু মিয়া গত কয়েকদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভোগছেন। মৃত রুমাদের বাড়ির সব ক’টি পরিবারেই এক-দুইজন জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত রয়েছে।

কথা হয় বেসরকারি সংস্থা হীড বাংলাদেশ’র স্বাস্থ্যকর্মী রতœা বেগমের সাথে। তার আওতায় আছে এলাকার ইসলামপুর, খালদার, রক্তা, আমিরপুরের একাংশের ৫৪৩টি খানা (পরিবার)। তিনি জানান, আমারও জ্বর ছিলেঅ। সুস্থ হয়েছি। এলাকার কতোজনের নাম বলবো। ঘরে ঘরে জ্বরে আক্রান্ত আছেন অনেকেই। যতোটুকুু পারি পরামর্শ দিচ্ছি। কখনও জ্বর সারে। আবার নতুন করে জ্বর দেখা দেয়। বেশিরভাগই স্থানীয় বাজার থেকে ওষুধ এনে সেবন করছে। যার ক্ষমতা আছে সে বাহিরে নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছে। বন্যার পর পরই এই জ্বর বেশি দেখা যাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, বন্যাকবলিত তাদের এলাকায় গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত কোনো সরকারি মেডিক্যাল টিম যায়নি। ওই বাড়ির সুফিয়া বেগম জানান, আইজ ৫/৬ দিন ধরি আমার তিনটা মেয়ের জ্বর। এরা বিছানায় শুয়ে আছে। একই বাড়ির ইমাম মিয়া (৬৫) সপ্তাহখানেক ধরে জ্বরে ভোগছেন। তার মেয়ে সুমনা বেগমের (২২) গত ৩ দিন ধরে জ্বর। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার শরীর। ঘরের মধ্যে তার মাথায় পানি দিতে দেখা গেলো।

একই গ্রামের ডলি বেগম (৩২) জানান, গত ৮দিন ধরে আমি ও আমার ছেলেমেয়ের জ্বর, সর্দি ও মাথাধরা। ওষুধ খাইছি। কিন্তু সারছে না। ফজরুন বিবি (৫০) জানান, খারাপ অবস্থায় আছেন তারা। নিজেদের নৌকা নেই। কারও নৌকা পেলে প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে তারা খাওয়ার জন্য নলকূপের পানি নিয়ে আসেন। সরকারি সাহয্য পেয়েছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একদিন আধা কেজি চিড়া, আড়াইশ চিনি এবং আরেকদিন ৫ কেজি চাল পেয়েছেন।
নিজের ঘর বানের পানিতে নিমজ্জিত হওযায় ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া আব্দুল মালিক (৫০) বলেন, আমি মাছের ব্যবসা করি। কিন্তু অভাব-অনটনে ব্যবসার পুঞ্জি (পুঁজি) শেষ। সরকারি কোনো সাহায্য পাননি এখন পর্যন্ত।

পাঁচগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান শামসুন-নূর আহমদ আজাদের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দু’টি মেয়ে শিশু মারা গেছে। এলাকায় অনেকের জ্বর আছে। তবে খুব বেশি না। আর ত্রাণ লিমিটেড আসে। সবাইকে দেওয়া যায় না। একগ্রামে ৩০০ জন পানিবন্দী। আসে ৫০/৬০ জনের। এলাকায় অভাব রয়েছে। গত বৈশাখ মাসে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় অনেকের ঘরে চাল নেই।
এ বিষয়ে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা উত্তম কুমার শর্মা দু’জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শুক্রবার একটি মেডিক্যাল টিম পাঠানো হয়। তারা তথ্য নিয়ে এসেছে। একজনের জ্বর, বমি ও পাতলা পায়খানা হয়েছিলো। আরেকজনের আগে চর্মরোগ হয়েছিলো। সম্ভবত এ কারণে কিডনিতে সমস্যা হতে পারে। শনিবার একটি টিম এলাকায় পাঠানো হবে। ভাইরাল জ্বরে অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মেডিক্যাল টিম কাজ করছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মনসুরনগরে ৪ মেট্টিক টন, পাঁচগাঁওয়ে ৬ মেট্টিক টন ও সাড়ে ৪ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, মুন্সীবাজারে ৫ মেট্টিক টন, ফতেহপুরে আড়াই হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট ও আড়াই হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ৭০০ পরিবারের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়েছে। হাওরের পানি একইভাবে আছে।
জালাল আহমদ

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত