সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আইডি কার্ডে বয়স ৫১ হলেও চা বাগানে ৬০ হওয়ায় নারী শ্রমিককে অবসর



মো.মোস্তাফিজুর রহমান,কমলগঞ্জ:: ‘এ কেমন কথা বাবু। এক দেশে দুই রকম আইন। সরকার সব কাজে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলেও চা-বাগানের ম্যানেজার তা মানতে রাজি নন।’ গতকাল কান্নাজড়িত কন্ঠে এই কথাগুলো বলেন কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর চা-বাগানের নারী চা-শ্রমিক লছমী রাজভর। বাগান কর্তৃপক্ষ গত জানুয়ারী মাসে তাঁর বয়স ৬০ ঊর্ধ্ব দেখিয়ে চাকুরী থেকে অবসর দেন। লছমী রাজভরের দাবি, তার বয়স ৫১ বছর এবং তিনি এখনও বাগানের কাজে সক্ষম ও আগ্রহী। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী লছমী রাজভরের জন্মতারিখ ১৯৬৬ সনের ১০ জুলাই।
বাগান কর্তৃপক্ষের অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তিনি গত ৭ ফেব্রুয়ারি লিখিতভাবে ম্যানেজার বরাবর একটি আবেদন করে কাজে যোগদানের অনুমতি চান এবং এই আবেদনের অনুলিপি মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরণ করেন। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ৩ এপ্রিল কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে সরজমিনে তদন্ত করার নির্দেশ প্রদান করেন। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে ১৯ জুন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শমসেরনগর চা-বাগানের ম্যানেজারের কার্যালয়ে তদন্ত অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, বাগান কর্তৃপক্ষ শ্রমিকের নিয়োগ সংক্রান্ত ‘সি’ ফরম ও সার্ভিস বইয়ের যে তথ্যাদি পেশ করেছেন। তদন্তক্রমে চাকরির বিধি মোতাবেক রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২৮ ধারায় কোন শ্রমিকের অবসর গ্রহণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের সার্ভিস বইয়ে লিপিবদ্ধ জন্ম তারিখ উপযুক্ত প্রমাণ হিসাবে গণ্য করা হইবে। আবারা শ্রম আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে মালিক কোন শ্রমিকের চাকুরীর শুরুতে এবং তার চাকুরী চলাকালে তৎসম্পর্কে সার্ভিস বইয়ে সময় সময় এই অধ্যায় ও বিধির অধীন প্রয়োজনীয় তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করবেন এবং মালিক ও শ্রমিক উভয়েই দস্তখত করবেন। চা বাগান কর্তৃপক্ষ জাতীয় পরিচয়পত্রকে গুরুত্ব প্রদান না করলেও চা-বাগানে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের নীতিমালায় খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তির প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চা-শ্রমিকদের মধ্যে বয়োজেষ্ঠ্যদের অগ্রাধিকার এবং খাদ্যসহায়তা প্রাপ্তির যোগ্যতা ও শর্তাবলীতে উল্লেখ রয়েছে প্রার্থীর জন্মনিবন্ধন/জাতীয় পরিচয় নম্বরকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়।
চাকুরী থেকে অবসর দেয়া লছমী রাজভর অভিযোগ করে বলেন, বাগান কর্তৃপক্ষ তাকে জিজ্ঞেস না করেই তার জন্ম তারিখ লিখেছেন। আইন অনুয়ায়ী ‘সি’ ফরম ও সার্ভিস বইতে শ্রমিকের স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক হলেও বাগান কর্তৃপক্ষ তার নিকট হতে কোন স্বাক্ষর নেননি। লছমী রাজভর আক্ষেপ করে বলেন, আমরা যে ঘর থাকি সেটা আমাদের নয়, চাকরী শেষ হলে আমাদের ঘর কেড়ে নেওয়া হয় (যদি পরিবারের কারো বাগানে চাকরী না থাকে)। এখন বয়স হওয়ার আগেই যদি আমাকে অবসরে যেতে হয় তাহলে আমাকে না খেয়ে মরতে হবে। এছাড়া শ্রমআইন-এর ৫ ধারা অনুযায়ী নিয়োগপত্র ও শ্রমিকের ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও বিভিন্ন বাগানের চা-শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদেরকে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান করা হয় না।
এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপকের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চা বাগানের একজন কর্মকর্তা বলেন, চাকুরির বিধিতে চা বাগানের সার্ভিস বইয়ের রেকর্ড অনুযায়ী লছমি রাজভরের বয়স ষাটোর্দ্ধ হওয়ায় তাকে অবসর দেয়া হয়েছে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত