বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

‘আজকে যে আমি এমপি সেটাও তাঁরই কর্মের ফল’



আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ:: সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং সুনামগঞ্জ-মৌলভীবাজার সংরক্ষিত আসনের এমপি এডভোকেট শামছুন নাহার বেগম শাহানা রব্বানী সৎ মানুষকে স্মরণ ও তাদের সেবামূলক কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সাংবাদিক জনতা ও সিভিল সোসাইটির প্রতি আহবাণ জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, আগষ্ট মাস বাঙ্গালী জাতির জন্য শোকের মাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ কন্যা ব্যতিত স্বপরিবারে শহীদ হন এই আগষ্ট মাসে। এই শোকের মাসেই বঙ্গবন্ধুর একান্ত অনুরাগী আমার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে এতই ভালবাসতেন শত প্রলোভনের হাতছানি তাঁকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে,মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে টলাতে পারেনি। তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন সাধ ছিল সংসদ নির্বাচন করার। তাঁর স্বপ্ন অপূর্নই থেকে যায়। তিনি আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ ছিলেন,একেবারে সার্বক্ষনিক রাজনীতিবিদ। কোন বাধাবিপত্তি তাঁকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখতে পারতোনা। আওয়ামীলীগ বিরোধী দলে আসলেই তাঁকে কারাবরন করতে হত। বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার পর তাঁকে দীর্ঘদিন পলাতক জীবন যাপন করতে হয়।
সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই তিনি গিয়েছেন। মানুষের বিপদ আপদে পাশে দাড়িয়েছেন। মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন। আমাকে অনেক মানুষ এখন বলেন,তিনি নাকি তাদের বাড়ীতে গিয়েছেন,থেকেছেন খেয়েছেন। আমি অবাক হয়ে ভাবি এত বাড়ীতে তিনি গেলেন কিভাবে ? আমি যখন কোর্টে এডভোকেসি করতাম তখন দেখতাম কোর্টে আসা ৭৫ ভাগ মানুষেরই আমাদের বাসায় যাতায়াত আছে। এত জনসংযোগ ছিল তাঁর। তাইত শেষের দিকে তিনি দাবী করতেন আমাকে সুনামগঞ্জের যেকোন এলাকায় মনোনয়ন দেয়া হউক। এই প্রসঙ্গে আমার প্রয়াত বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বিশ^ শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টেরিয়ান বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের একটি কথা মনে পড়েছে। তিনি আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার ছেলেকে বলেছিলেন,“তুমি এমন একজনের সন্তান তুমি যদি সুনামগঞ্জের যেকোন গহীন গ্রামে গিয়েও বিপদে পর দেখবে অন্তত ৩ জন লোক বেড়িয়ে আসবে তোমাকে রক্ষা করার জন্য তোমার বাবার কারণে”। মানুষের সেবা করতে তাঁর কোন অলসতা ছিলনা। যখনই কেহ বিপদে পড়ে তাঁকে সাহায্য প্রার্থনা করত তিনি তৎক্ষণাত এগিয়ে যেতেন। নি:স্বার্থভাবে মানুষের কাজ করে দিতেন। যেকোন কঠিন বিবাদ সমস্যা তিনি সহজেই সমাধান করতে পারতেন। আমার আজকের এই অবস্থান সেটাও তাঁরই জন্য। আমিতো এস.এস.সি পাশ একটি মেয়ে ছিলাম যখন তাঁর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তিনিইত আমাকে উৎসাহ,অনুপ্রেরণা দিয়েছেন,পড়িয়েছেন। কলেজ ছাত্র সংসদ ও জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন করার জন্য সাহস যুগিয়েছেন,বুদ্ধি দিয়েছেন,সহযোগীতা করেছেন। তিনি যদি পাশে না থাকতেন আমার পক্ষে এই নির্বাচনগুলোতে পাশ করা সম্ভব হতনা। ওকালতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়াও সম্ভব হতনা। কারণ তাঁর পরিচয়ের কারণেই আমার কাছে মামলা আসত। আজকে যে আমি এমপি সেটাও তাঁরই কর্মের ফল।
শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে নিজের স্বামী গোলাম রব্বানীর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেসক্লাব আয়োজিত স্মরণ সভায় সভাপতির বক্তৃতায় শাহানা রব্বানী এসব কথা বলেন। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক গোলাম রব্বানী সম্পাদিত সাপ্তাহিক গ্রাম বাংলার কথা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আল-হেলাল এর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোঃ সাবিরুল ইসলাম,জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ খান, সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়্যুব বখত জগলুল,যুদ্ধকালীন কোম্পানী কমান্ডার এডভোকেট আলী আমজাদ,সাংবাদিক কলামিস্ট এডভোকেট হোসেন তওফিক চৌধুরী,জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট সৈয়দ শায়েখ আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান,সাবেক পিপি এডভোকেট শফিকুল আলম,জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সেক্রেটারী মোঃ নজরুল ইসলাম শেফু,আওয়ামীলীগ নেতা এডভোকেট চান মিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাশিম (যোদ্ধাহত),জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ফৌজিআরা বেগম শাম্মী,সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ,সাংবাদিক নেতা লতিফুর রহমান রাজু, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশক পংকজ কান্তি দে, সুনামগঞ্জের সময় পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশক সেলিম আহমেদ তালুকদার, প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুর রহমান পীর, বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি মাসুম হেলাল, সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম,বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি বাউল শাহজাহান সিরাজ,জেলা শ্রমিক লীগের আহবায়ক সেলিম আহমদ, সদর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পংকজ চৌধুরী, প্রয়াত গোলাম রব্বানীর জেষ্ট কন্যা কনিজ রেহনুমা রব্বানী ভাষা,কনিষ্ট কন্যা কনিজ রেহনুমা রব্বানী কথাসহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
স্মরণ সভায় জেলা প্রশাসক মোঃ সাবিরুল ইসলাম তার বক্তৃতায় রুপক অর্থে নিজের পিতাকে পাবনার গোলাম রব্বানী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে ও মহাণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী গোলাম রব্বানীরা দেশ কাল পাত্র ও স্থান ভেদে যে জায়গাতেই জন্মগ্রহন করেননা কেন তাদের চিন্তা ও বিশ^াসের জায়গাটি কিন্তু এক ও অভিন্ন। অর্জন বলতে বড় কিছু করতে পারেননি বলে তাদেরকে কেউ ব্যর্থ বলতে পারেননা। আসলে তারাই সত্যিকারের ভাল মানুষ। হালাল খেয়েছেন এবং সৎপথে চলেছেন বলেই আজকে তাদের প্রজন্মরা সুপ্রতিষ্টিত হয়েছেন। আত্মার সাথে সম্পর্কযুক্ত এই দুই গোলাম রব্বানীর স্মরণ সভা পাবনা ও সুনামগঞ্জে বলতে গেলে একযোগে হচ্ছে। আমি এই শোকসভাতে আসতে পারায় নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি।
স্মরণ সভায় স্বাগত বক্তব্যে সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ বলেন,সুনামগঞ্জের সাংবাদিকতায় অনেক তারকা সাংবাদিক ছিলেন যারা প্রয়াত হলেও তাদের কর্মমুখী সেবামূলক কর্মকান্ডের কারনে সাধারন মানুষ আজও তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। আমরা আগামীতে সকল প্রয়াত সাংবাদিকদের স্মরণ করার মধ্যে দিয়ে সাংবাদিক জনতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলবো। সভায় পাবনা জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা,প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ,ভাষা সৈনিক প্রয়াত আমিরুল ইসলাম বাদশাহ ও সুনামগঞ্জের সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিবিদ গোলাম রব্বানী স্মরণে পৃথক পৃথকভাবে দাড়িয়ে দুইবার নীরবতা পালন করা হয়।
উল্লেখ্য ২০০৬ সালের ৪ঠা আগস্ট শুক্রবার সুনামগঞ্জের রাজনীতিবিদ সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব গোলাম রব্বানী মৃত্যবরণ করেন। শুক্রবার ছিল তার একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন জেলার আপামর জনসাধারনের কাছে গ্রহনযোগ্য একজন প্রাণপুরুষ। ছাত্রজীবনের শুরুতেই হাইস্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ১৯৬৭ইং সনে তিনি বিপুল ভোটে সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। পরে কলেজ শাখা ও মহকুমা শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি পদে অধিষ্টিত হন। ছাত্রজীবনের শেষ হতে না হতেই ১৯৭০ ইং সনে সুনামগঞ্জ-২ নির্বাচনী এলাকা দিরাই শাল্লা আসনে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ (এমপিএ) নির্বাচনে তাকে কুড়েঘর প্রতীকে ন্যাপের মনোনয়ন দেয়া হয়। পরে দলের বৃহত্তর স্বার্থে ঐ আসনে ন্যাপের অপর প্রার্থী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপির সমর্থনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। দেশ স্বাধীনের পর সুনামগঞ্জে সরকারী সফরে আগত জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আহবানে সারা দিয়ে তিনি আওয়ামীলীগ রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। জনাব গোলাম রব্বানী মুক্তিযুদ্ধে বালাট সাবসেক্টর এর কোম্পানী কমান্ডার, পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ইউনিট কমান্ড এর প্রধান উপদেষ্টা,জেলা আওয়ামীলীগ এর সহসভাপতি,সুনামগঞ্জ কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি, সাপ্তাহিক গ্রাম বাংলার কথা,সাপ্তাহিক বিন্দু বিন্দু রক্তে পত্রিকার সম্পাদক, জেলা সমবায় ইউনিয়ন এর সভাপতি, সিলেট বিভাগ বাস্তবায়ন কমিটির জেলা আহবায়ক, সুনামগঞ্জ প্রেস ক্লাব এর প্রথম কার্যকরী কমিটির সভাপতি, জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য, সুনামগঞ্জ সাংবাদিক সমিতির সভাপতিসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক পেশাজীবি সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। নবগঠিত দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে সুনামগঞ্জ জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের সূচনা করেন। জনাব গোলাম রব্বানী ১৯৪৬ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার সদর থানার (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা) জয়কলস ইউনিয়নের উজানীগাও গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। মৃত্যুবরন করেন ২০০৬ ইং সনের ৪ঠা আগস্ট। তার পিতা মরহুম আরব আলী এলাকার একজন বিশিষ্ট সরপঞ্চ ছিলেন। জনাব গোলাম রব্বানীর চাচা ও শ্বশুড় মরহুম শহীদ বুদ্ধিজীবী এ্যাডভোকেট সুনাওর আলী যিনি ১৯৭১ সনের মার্চ মাসে গঠিত সুনামগঞ্জ শহরের সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সনের ১লা মে শাল্লা উপজেলার আটগাও ইউনিয়নের উজানীগাও গ্রামে ৯ বছরের তৃতীয় কন্যা সিতারা বেগম সহ শহীদ হন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৯৯ইং সনে শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরিজ ৯৯ নামে একটি স্মারক ডাক টিকেট প্রবর্তন হয় তার চাচার নামে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত