শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ফেসবুক কী মানবিকতার বিপক্ষে অবস্থান নিল?



আইটি ডেস্ক :: বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে অালোচিত বিষয় সমুহের প্রচার এবং ব্যক্তিগত মতামতের অন্যতম প্লাটফর্ম এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

শক্তিশালী দেশগুলোর সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে বিশ্বের যে কোনো ইস্যুতে বড় ভূমিকা পালন করে ফেসবুক। ধারণা করা হয় ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বড় ধরনের অবদান রয়েছে ফেসবুকের।

এছাড়াও ফেসবুকের কারণে দাঙ্গাও বেধেছে অনেক দেশে। মিথ্যা সংবাদ প্রচারের কারণেও বিতর্কিত হয়েছে ফেসবুক। এসব বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন সংবাদ ফেসবুক থেকে সরিয়ে ফেলতে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মার্ক জুকারবার্গের ফেসবুক।

নানা সময় বিভিন্ন কারণে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যে পড়া ফেসবুক আবারো চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেদেশের সেনাবাহিনীর হাতে ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। রাখাইন রাজ্যটিকে বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রেখে জাতীগত নিধন শুরু করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। কোনোভাবেই সেখানের অবস্থা জানতে পারছে না বিশ্ব।

এমতাবস্থায় সেখানের প্রকৃত রহস্য প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে সেখানকার অধিবাসীদের মোবাইল ফোন। রোহিঙ্গাদের পক্ষের জনগন অত্যাচারের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মত ফেসবুকেও আপলোড করছে। আর এতেই সেখানের পরিস্থিতি খুব দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে বহির্বিশ্বে। রোমহর্ষক নির্যাতনের এসব ছবি ও ভিডিও দেখে জাগ্রত হচ্ছে বিশ্ব বিবেক।

আর যখন রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইস্যুতে রুপান্তরিত হয়েছে, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, শক্তিধর দেশগুলো এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলছে। তখনই এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্কিত কাজ শুরু করেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

যেসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে সেসব অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিচ্ছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। শুধু ছবি বা ভিডিও নয়, এমনকি এ বিষয়ক টেক্সট’ও মুছে দেওয়া হচ্ছে ফেসবুক থেকে।

মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফেসবুকও এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। রোহিঙ্গাদের কিছু বিদ্রোহীদের দ্বারা গঠিত সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি’ (আরসা) কে ‘বিপজ্জনক সংগঠন’ উল্লেখ করে রোহিঙ্গাদের এসব অত্যাচারের ছবি ও ভিডিও আরসার পক্ষে যায় বলে জানিয়েছে ফেসবুকের এক মুখপাত্র।

এছাড়া নিজস্ব পর্যালোচনার ভিত্তিতে ফেসবুক এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

বুধবার ডেইলি বিস্টকে ফেসবুকের মুখপাত্র বলেন, আমরা ফেসবুককে একটা জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই যেখানে মানুষ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শেয়ার করবে। তিনি বলেন, নিরাপদ ও সম্মানজনক অভিজ্ঞতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ভারসাম্যের জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি। মিয়ানমারের পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আমরা আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি।

ফেসবুক এও জানিয়েছে, মিয়ানমার সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তারা বলছে, এটা সম্পূর্ণভাবে আরাকান আর্মির তৎপরতার বিশ্লেষণ করে নেয়া হয়েছে। কারণ সন্ত্রাস, সহিংসতা বা গণহত্যার মতো অপরাধে যুক্ত সংগঠনের পক্ষে পোস্ট করা তাদের নীতিমালার লঙ্ঘন।

তবে যে পক্ষটির কারণে চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে নিজ বাড়িঘর ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাদের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ফেসবুক।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি’র মুখপাত্র জাও হাতা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে আরাকান আর্মি বিষয়ক ফেসবুকের একটি বার্তা শেয়ার করেছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে ফেসবুক আসলে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ওপরই সেন্সর আরোপ করেছে।

বিষয়টি নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ আনওয়ার। তিনি কুয়ালালামপুরভিত্তিক রোহিঙ্গা ব্লগার ডটকম নামের একটি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন।

তিনি বলেন, ফেসবুক মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনের চেষ্টা করছে। তাদের কাছে বর্মী শাসকগোষ্ঠীর গণহত্যা যেন কৌতুক বা মজা করার মতো কোনও বিষয়। তিনি বলেন, রাখাইনের ৪৫ জন সংবাদকর্মীর একটি টিম তার পোর্টালের জন্য কাজ করছে।

ফেসবুকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ আনওয়ার-এর পোস্টগুলো ভুল করে মুছে দেওয়া হয়েছে। তবে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুকে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ সংক্রান্ত পোস্টের ক্ষেত্রে সেন্সরশিপ অব্যাহত রয়েছে।

মোহাম্মদ রফিক নামের আয়ারল্যান্ডভিত্তিক রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী বলেন, গত ২৮ আগস্ট রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করার পরে ফেসবুক তার অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বাতিল করে। তিনি বলেন, যদিও এখন নতুন ছবি ও ভিডিও পাচ্ছি কিন্তু অ্যাকাউন্ট বাতিল হওয়ার ভয়ে সেগুলো পোস্ট করছি না।

সৌদি আরব ভিত্তিক রোহিঙ্গা কর্মী জাফর আরাকানি আরাকন টাইমস নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, আরাকানে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পরেই আমরা ইউটিউব চ্যানেলে সেগুলো প্রচার করেছি এবং ফেসবুকের মাধ্যমে সেগুলো বহু মানুষের কাছে পৌছে গেছে। তার চ্যানেলের ফেসবুক একাউন্টও ২৭ আগস্ট বাতিল করা হয়।

গোটা বিশ্ব যখন রোহিঙ্গা নিধনের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং মিয়ানমারকে এ গণহত্যা বন্ধের জন্য চাপ দিচ্ছে তখন একমাত্র ফেসবুক স্রোতের বিপরীতে গিয়ে মিয়ানমারের স্বার্থরক্ষায় কাজ করছে।

তাহলে বিশ্বের প্রভাবশালী এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি রোহিঙ্গা নিধনে মিয়ানমার আর্মির সমর্থন করছে? নাকি রোহিঙ্গা ইস্যুকে ব্যবহার করে চীনের সাথে তাল মিলিয়ে সেখানে প্রবেশের নকশা আঁকছে?

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত