সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

গলা টিপে ধরতেই দেহ নিথর হয়ে পড়ে, ঘাতক মায়ের স্বীকারোক্তি!



ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে: ‘রাগের মাথায় আফসানার গলা টিপে ধরি। মারা যাবে কল্পনা করতে পারিনি। কিন্তু গলায় টিপে ধরা অবস্থায়ই দেখতে পাই আফসানার দেহ নিথর হয়ে পড়েছে।’ সিলেটের কানাইঘাটে চার বছরের শিশু আফসানা বেগমকে খুনের বর্ণনা এভাবেই দেয় ঘাতক সৎমা নাসিমা বেগম।
গতকাল প্রথমে কানাইঘাট পুলিশ ও পরে আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে নাসিমা এ কথা জানায়। ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নাসিমা জানায়, ‘আফসানা বেগম তাকে প্রায়ই জ্বালাতন করতো। বিভিন্ন সময় লাঠি দিয়ে মারধর করতো। গত সোমবারও আফসানা তার পেটে লাঠি দিয়ে জোরে আঘাত করে। এ সময় রাগান্বিত হয়ে সে আফসানার গলায় টিপ দিয়ে ধরে। এতে মারা যায় আফসানা।’

সোমবার বিকালে পুলিশ যখন উপজেলার বাখালছড়া গ্রাম থেকে আফসানার লাশ উদ্ধার করে তখন এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা গ্রেপ্তার করে সৎ মা নাসিমা বেগমকে। ঘটনার পর এলাকাবাসীর তোপের মুখে নাসিমা খুনের ঘটনা স্বীকার করলেও পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর ঘটনা এড়িয়ে যায়। রাতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে খুনের ঘটনা স্বীকার করে। পরে কানাইঘাট থানার পুলিশ তার জবানবন্দি রেকর্ড করে সিলেটের আদালতে প্রেরণ করে। আদালতেও একই কথা জানায় নাসিমা বেগম। আফসানার পিতা আলমগীর হোসেন অসুস্থ থাকায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন। আর ঘটনার সময়ে আফসানার দাদি আম্বিয়া বেগম বাড়িতে ছিলেন না। এই সুযোগে এ ঘটনা ঘটায় নাসিমা বেগম। পরে আফসানার লাশ কাঁথা মোড়া দিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখে। তবে পুলিশ যখন আফসানার লাশ উদ্ধার করছিল তখন তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। এছাড়া গলায় হাতের দাগও পরিলক্ষিত হয়েছে।

কানাইঘাটের বাখালছড়া গ্রামের আলমগীর হোসেন প্রথম বিয়ে করেছিলেন একই এলাকার খালেদা বেগমকে। খালেদা বেগমের সন্তান হচ্ছে আফসানা বেগম। প্রায় আড়াই বছর আগে পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়ায় খালেদাকে ডিভোর্স দেন আলমগীর। তবে- আফসানাকে তার দাদি আম্বিয়া বেগম নিজের কাছেই রেখে দেন। তিনি আফসানাকে লালন-পালন করছিলেন। প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়ার পর আলমগীর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। একই গ্রামের নাসিমা বেগমকে দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘরে তোলেন। নাসিমার দেড় বছর বয়সী আরেক সন্তান রয়েছে। এবং বর্তমানে নাসিমাও ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তবে বিয়ের পর থেকে নাসিমার চোখেরবালি ছিল শিশু আফসানা বেগম। কোনোভাবেই আফসানা বেগমকে সহ্য করতে পারছিল না। আফসানার কোনো কাজই তার পছন্দ হতো না। এ কারণে নাসিমা প্রায় সময় আফসানাকে মারধর করতো। এই মারধরের ঘটনা কেন্দ্র করে প্রায়ই আলমগীর-নাসিমার সংসারে বিরোধ লেগে থাকতো। গ্রামের লোকজনও এসব নিয়ে সালিশ করেছেন।

গ্রামের লোকজন জানান, আলমগীর হোসেন অসুস্থ হওয়ার কারণে গত কয়েক দিন ধরে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। গত সোমবার দুপুরে আফসানার দাদি আম্বিয়া বেগম জরুরি কাজে বাড়ির বাইরে যান। এ সময় বাড়িতে নাসিমা ও আফসানা ছিল। এই সুযোগে নাসিমা সৎ মেয়ে আফসানাকে গলাটিপে খুন করে। এবং পরে নাসিমার লাশ কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঢেকে রাখে। বাড়িতে এসে আম্বিয়া বেগম নাতনি আফসানা বেগমের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পুত্রবধূ নাসিমা বেগমের কাছে তার নাতনি কোথায় জানতে চান। এ সময় নাসিমা শাশুড়ির কাছে একেক সময় একেক কথা বলে। এতে সন্দেহ হলে বসত ঘরের কক্ষে ঢুকে নাতনি আফসানা বেগমের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দাদি আম্বিয়া বেগম চিৎকার শুরু করেন। এ সময় আশপাশে লোকজন এগিয়ে যান। তারাও গিয়ে দেখেন আফসানার মরদেহ বিছানার উপর পড়ে আছে। এ ঘটনায় এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরে তোপের মুখে নাসিমা নিজেই খুন করে বলে জানায়। খবর পেয়ে কানাইঘাট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আফসানার লাশ উদ্ধার করে। ঘাতক সৎ মা নাসিমাকে আটক করে।

জিজ্ঞাসাবাদের মুখে নাসিমা খুনের দায় স্বীকার করে। বলে- রাগের মাথায় সে আফসানাকে খুনে করেছে। এ ঘটনায় নিহত আফসানার মা খালেদা বেগম কানাইঘাট থানায় বাদী হয়ে নাসিমা বেগমকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

কানাইঘাট থানার ওসি আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন- নাসিমা খুনের ঘটনা স্বীকার করার পর গতকাল তাকে সিলেটের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। আদালতেও নাসিমা খুনের ঘটনা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দি গ্রহণের পর নাসিমাকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

ওসি জানান- ঘটনার প্রায় শেষ পর্যায়ে। জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। মেডিকেল রিপোর্ট ও আনুষঙ্গিক তদন্ত শেষ করার পর দ্রুত আদালতে চার্জশিট দেয়া হবে। সূত্র: মানবজমিন

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত