বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

জামালের অব্যক্ত প্রেম, অতঃপর ভয়ংকর সমাপ্তি



রোকনুজ্জামান পিয়াস: প্রথম দেখাতেই মেয়েটিকে ভালো লাগে জামাল উদ্দিনের। এরপর আস্তে আস্তে ভালোবাসতে শুরু করে। কিন্তু বলা হয়নি কখনো। ইঙ্গিতেও প্রকাশ করেনি। এরমধ্যে মেয়েটিও প্রেমে পড়েন। তবে জামালের নয়, তিনি প্রেমে পড়েছিলেন তার খালাতো ভাই মহসিনের। তাদের প্রেমের পরিণতি পায় ২০০১ সালে বিয়ের মাধ্যমে। সংসারে আসে সন্তান। এরই মধ্যে জামালও বিয়ে করে ঘর-সংসার শুরু করেন। তিনিও সন্তানের বাবা হন।

মহসিন ও জামালের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। সখ্যও ছিল এ দু’টি পরিবারের মধ্যে। একে-অপরের বাড়ি যাওয়া-আসা করতো। এভাবেই সময় বয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু বিয়ের ১২ বছর পর হঠাৎ একদিন নতুন রূপে মেয়েটির ঘরে হাজির হয় জামাল। তিনি তার ভালোবাসা প্রকাশ করেন। জানিয়ে দেন, এতোদিন ধরে মনের ভেতর পুষে রাখা কথা। মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরেন। জোর করে ভালোবাসা আদায় করে নেয়ার কথাও জানান। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। মেঝেতে পড়ে যায় মেয়েটি। ভালোবাসা আদায় করে নেয়ার এই কৌশলই কাল হয় কথিত প্রেমিক জামালের। তিনি খুন হয়ে যান।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাউনি গ্রামের। ২০১৩ সালের রজমানের ঈদের দিন গ্রামের একটি রাস্তার পাশ থেকে জামাল উদ্দিনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

জামালের এই মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য দানা বাঁধে। পরদিন ৯ই আগস্ট মামলা করেন তার স্ত্রী মোছা. রাহেলা খাতুন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ১৫ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে বলে ২০১৩ সালের ৮ই আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে জামাল উদ্দিন বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। পরদিন সকাল ৬টার দিকে স্থানীয়রা হারুনের বাড়ির বাম পাশের রাস্তায় তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে।

এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, একই গ্রামের হোসেন, হাসেম, ইছাহাক, ইলিয়াছ, ইকবাল, হোসেনের মেয়ে তাহমিনার স্বামী, শিপু, হাছেন, এবং দেলোয়ারের সঙ্গে জামাল উদ্দিন চলাফেরা করতেন। বাদীর ধারণা, জমি সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে এরা কৌশলে তাকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।

মামলাটি হওয়ার পর দীর্ঘ তদন্ত হয়। তদন্তে হাতবদল হয়। সন্দেহভাজন হিসেবে মো. মনিরুজ্জামান নামে ওরফে মনির হোসেন ওরফে মনির (৪৭) এবং মো. হাসান ওরফে হাছেন (২৮)কে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ তদন্তে কোনো কুল-কিনার না পেয়ে অবশেষে ২০১৪ সালের ৩০শে এপ্রিল দায়সারাভাবে আদালতে মামলার চার্জশিট প্রদান করে শ্রীপুর থানা পুলিশ। জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এই চার্জশিটে নারাজি দেন নিহতের স্ত্রী মামলার বাদী মোছা. রাহেলা খাতুন। পরে আদালত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে নির্দেশ দেন।

২০১৫ সালে ২২শে জুলাই এ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের পুলিশ পরিদর্শক মো. নূরুন্নবী। তিনি দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে এই মামলার তদন্ত করেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হওয়ার যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ইতিপূর্বে দেয়া হয়েছিলো সেটিও পর্যালোচনা করেন। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা নূরুন্নবী ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ-০২ শ্রীপুরের জোনাল অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, ঘটনাস্থল বা আশপাশের এলাকায় কোন বৈদ্যুতিক লাইন বা তার সংযুক্ত ছিল না। ফলে জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর বিষয়টি হত্যাকাণ্ড সেটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা জমা-জমি, মাদক বা নেশা, ব্যবসা এবং প্রেম-পরকীয়া এই চারটি বিষয়কে সামনে নিয়ে তদন্ত শুরু করেন। প্রথম তিনটির ব্যাপারে ব্যাপক তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো তথ্য না পেয়ে প্রেম-পরকীয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। তিনি সুরতহাল রিপোর্ট পুনরায় পর্যালোচনা করেন। তাতে মরদেহের নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত, বুক ও বগলের ওপরে এবং গলায় আঘাতের চিহ্নসহ পুরুষাঙ্গ দিয়ে বীর্য নির্গত হওয়ার বিষয়ে উল্লেখ ছিলো। দীর্ঘ তদন্তে সংশ্লিষ্ট সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তার কর্তৃক ৬ জনসহ নতুন করে আরো ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এদের মধ্যে এক নারী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন। জামাল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত দু’জনের কথা স্বীকার করেন তিনি। এই দু’জনের একজন তার স্বামী মো. মহসিন এবং অপরজন তার দেবর মো. জাকারিয়া।

জবানবন্দিতে ওই নারী জানান, তার স্বামী মো. মহসিন তার আপন খালাতো ভাই। তারা একে-অপরকে পছন্দ করতো। পরে পারিবারিকভাবে ২০০১ সালের ২০শে মার্চ তাদের বিয়ে হয়। অপরদিকে মৃত জামাল উদ্দিন তার নানার পালিত ছেলের ছেলে। সেই হিসেবে তার মামাতো ভাই। মহসিন ও জামাল পরস্পরের বন্ধু ও পাশাপাশি বাড়ি। ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে মহসিনের স্ত্রী বলেন, সেদিন ছিল রমজানের ঈদের চাঁদ রাত। তার স্বামী মহসিন ইমামতি করায় চাঁদরাতে ঈদগাহের কাজ তদারকি করতে সেখানেই থাকেন। আনুমানিক রাত ৯ টার দিকে জামাল বাড়িতে গিয়ে মাংস পেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। তখন জাহিদুল ও ফরিদ ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখে। পরে জামাল চলে গেলে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।

১৬৪ ধারায় দেয়া মহসিনের স্ত্রীর স্বীকারোক্তি মতে, কিছুক্ষণ পর জামাল উদ্দিনের ডাক শুনে তিনি দরজা খুলে দেন। দরজা খোলামাত্র জামাল উদ্দিন তাকে জোর করে জড়িয়ে ধরেন। জামাল বলেন, ‘সে তাকে ভালোবাসে। সে তার যোগ্য ছিলো না বলে এই ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি। বলতে থাকে, ‘বিয়ের আগে থেকেই সে তাকে ভালোবাসতো। যেদিন তাকে প্রথম দেখেছে, সেদিন থেকেই ভালোবাসে।’ জামাল আরো বলেন, ‘আজ জোর করে তার কাছ থেকে ভালোবাসা আদায় করে নিবে।’

মহসিনের স্ত্রী জবানবন্দিতে বলেন, তার সন্তান আছে, জামালেরও সন্তান আছে। তিনি জামালকে ভালোবাসে না, আর কখনো বাসবেও না। তারপর ধস্তাধস্তিতে তিনি মেঝেতে পড়ে যান। জামাল তার ওপর আছড়ে পড়েন। এই অবস্থায় তার স্বামী মহসিন ও দেবর জাকারিয়া হুট করে ঘরে চলে আসেন। তারা এই অবস্থায় দেখে দিশাহারা হয়ে পড়েন। মহসিন তার ওপর থেকে জামালকে টেনে তুলে কিল-ঘুষি মারেন। তখন দেবর জাকারিয়া তার স্বামীর হাত থেকে জামালকে ছুটিয়ে ধাক্কা দিয়ে বারান্দায় নিয়ে মারধর করেন।

জবাবন্দিতে মহসিনের স্ত্রী বলেন, মারধরের কারণে জামাল আর উঠতে পারছিলো না। এতো মারধরের পরও জামাল একটুও শব্দ করেনি। পরে জাকারিয়া তাকে টানতে টানতে রাস্তার দিকে নিয়ে যান। পরের দিন সকালে তার লাশ উদ্ধার হয়। আদালতে দেয়া এই জবানবন্দির পর পিবিআই অভিযুক্ত মহসিন ও জাকারিয়াকে গ্রেপ্তার করে।

এ ঘটনায় দীর্ঘ দুই বছরেরও অধিক সময় পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. নূরুন্নবী তদন্ত করে গত ২৮শে আগস্ট মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, সার্বিক তথ্য, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জব্দকৃত আলামত, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও ঘটনাস্থল এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সংক্রান্ত কাগজপত্র, আদালতে দেয়া সাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনা এবং পারিপার্শ্বিকতায় জামাল হত্যাকাণ্ডে মহসিন ও জাকারিয়ার জড়িত থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে মামলার এজাহারে উল্লিখিত সন্দেহভজানদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দিতে পিবিআইয়ের চার্জশিটে সুপারিশ করা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই মামলার ব্যাপারে পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক (নি:) এসআইএন্ডও (অর্গানাইজড্‌ ক্রাইম) মো. নূরুন্নবী বলেন, এটি একটি জঘন্য হত্যাকাণ্ড হলেও শ্রীপুর থানার পূর্ববর্তী তদন্ত কর্মকর্তা মূল রহস্য উদ্ঘাটন না করে দায়সারাভাবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। তিনি বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এটি যে হত্যাকাণ্ড, তা স্পষ্ট হয়। তবে প্রথমদিকে ঘটনার কোনো ক্লু ছিল না। অবশেষে তাদের দীর্ঘ তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে এসেছে। তিনি আরো জানান, এ মামলার আসামি মহসিন গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন, অন্যদিকে অপর আসামি জামিনে বের হয়ে পলাতক রয়েছেন। সূত্র: মানবজমিন

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত