রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন ও আন্দোলন নিয়ে কৌশলী অবস্থানে বিএনপি



বদরুল আলম মজুমদার ::বর্তমান সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া, পাশাপাশি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের প্রশ্নে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশে খালেদা জিয়ার বক্তব্যও সে বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে না বলা হলেও বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, এমন কথা বিএনপি বলেছে কৌশলগত কারণে। তাদের মতে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও দলটি ধীরে ধীরে নির্বাচনের পথেই হাঁটছে।

দলটির অধিকাংশ নেতাই বলছেন, দাবি আদায় করেই নির্বাচনে অংশ নেবেন তারা। যদিও বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থায় আন্দোলন করে দাবি আদায় নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ বিএনপিতেই। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয় বলে বিএনপি চেয়ারপারসন যে বক্তব্য দিয়েছেন, সরকারপ্রধান সেই বক্তব্যকে আমলেই নেননি। এ অবস্থায় দুটি দল দুই মেরুতে অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত সব দলই নির্বাচনে অংশ নেবে বলে মত দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মাঝে একটি ‘মিনিমাম সমঝোতা’ হয়তো রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়—এমন বার্তা দিয়ে তিনি হয়তো তার দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করতে চাইছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, শেষ পর্যন্ত সব দলের অংশগ্রহণে একটি ভালো নির্বাচনের পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে। আর বিএনপি নেত্রীর বর্তমান অবস্থানটা হচ্ছে অনেকটা কৌশলী। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়, বলা হলেও নির্বাচনে যাবে না—এমন কথা কোনো নেতাই বলছেন না। আসলে দলটির নেতারা ‘নো রিটার্ন পয়েন্টে’ অবস্থান নিচ্ছেন কর্মী চাঙা রাখতে এবং নিজেদের দলকে ভালো অবস্থানে তুলে নিয়ে আসতে।
জানা গেছে, বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় বিএনপি অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেবে, সরকারি দলের এমন প্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে বেগম জিয়া এমন অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও দলটির বর্তমান অবস্থান হচ্ছে, দাবি আদায় করেই আগামী নির্বাচনের পথে হাঁটবে তারা। গত বুধবারের ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে যাওয়া ঠিক নয় বলে মত দেন নেতারা।
জানা যায়, বিগত নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় বিএনপিকে যে প্রস্তাব শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন, সামনের নির্বাচনেও যদি এমন প্রস্তাব আসে; তাহলে বিএনপিকে অবশ্যই নির্বাচনে যাওয়া উচিত বলে মত দেন কিছু নেতা। তাছাড়া বর্তমান সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বিএনপি দাবি আদায় করতে পারবে না মর্মে যে সংশয় তারা তৈরি করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন তারাও অনেকটা পিছু হঠতে বাধ্য হবেন। মূলত তাদের বার্তা দেওয়াই ছিল বিএনপির আরেকটি কৌশল।
জানা যায়, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রয়োজনে বিরোধী আসনে বসতেও আপত্তি নেই বলে মত দলের অধিকাংশ নেতাসহ দলের বুদ্ধিজীবী মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের। তাদের যুক্তি, এবাবে নির্বাচনে অংশ না নিলে জনপ্রিয় দল হিসেবে বিএনপিকে ধরে রাখাটাই কঠিন হবে। তাছাড়া সংসদে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে গণতন্ত্র শক্তিশালী করা যায়, দলের ভেতরে-বাইরে এমন মতামত পরিষ্কার হয়ে উঠায় সরকার নিশ্চিতভাবেই বলছে, শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে আসবে বিএনপি।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কাছেও সরকারের পক্ষ থেকে বিএনপির এমন অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। সরকার ভারতসহ অধিকাংশ দেশের কূটনৈতিকদের বিএনপি নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে, আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার অধীনেই অংশ নেবে বিএনপি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমার অবস্থানও সেই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে ভালো নির্বাচন আশা করে ভারত সরকার। বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিবও এমন কথাই বলেছেন। কিন্তু বিএনপির দাবি মতে, ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচন নিয়ে তিনি কোনো কথাই বলেননি বলে জানা যায়। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনও যেভাবে বিএনপিকে গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য রেখেছে তাতে দলটির ভেতরের কিছু নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যেকোনোভাবেই হোক আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপিকে তাগাদা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি দলের মহাসচিবও এত দিন পরিষ্কার করে বলে আসছিলেন বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। এতে দিন দিন নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার দাবিটি গৌণ হয়ে যাচ্ছিল বলে মত দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্যের।
তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত নির্বাচনে সরকার বিএনপিকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এবার তারা বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কারণ বর্তমান সরকারের দেশি-বিদেশি পার্টনারদের এ ব্যাপারে চাপ রয়েছে। কিন্তু বিএনপির যে দাবি, সে বিষয়টি কৌশলে গৌণ হয়ে যাচ্ছে। শুধু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে, তা নিয়ে জোরালো বক্তব্য নেই। সেই হিসেবে বিএনপির দাবি, বিএনপিকেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এমন অবস্থানে গিয়ে দলের চেয়ারপারসন সঠিক কথাই বলেছেন।
যদিও শুরু থেকেই শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সমাবেশে বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।’ এর আগেও তিনি একাধিকবার বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে যদি আগামী নির্বাচনে যেতে হয়, তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও যেতে পারতাম।
গত রোববারের সমাবেশের পর বিএনপির বেশ কজন সিনিয়র নেতা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বিদ্যমান ব্যবস্থায় সরকারের সঙ্গে আপস করে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য বরারবই চাপ রয়েছে বিএনপি ওপর। তবে এ অবস্থায় নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে যারাই পরামর্শ দিয়ে থাকুক না কেন, এ সরকারের অধীনে নির্বাচনের যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। কেননা সরকার যেভাবে দেশের নানা জায়গায় সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করে রেখেছে, তাতে নির্বাচনে গিয়ে আমাদের ভরাডুবির মুখে পড়া ছাড়া কোনো গতি নেই। তাই সঙ্গত কারণেই নেত্রী বলেছেন, হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি।’
গত রোববারের সমাবেশে খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে যে কথা বলেছেন, এতে তৃণমূল নেতারা উজ্জীবিত। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের কিছু মনোনয়নপ্রত্যাশ্যী নেতা যেভাবে নমিনেশন পাওয়া, কমিটি নিজেদের মতো করে সাজানোসহ টাকা-পয়সা নিয়ে সিনিয়ির নেতাদের ধারে ধারে ঘোরা শুরু করেছেন, তাতে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি করার মতো গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি রয়েছে তা বেমালুম ভুলেই যাচ্ছিলেন।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন গত রোববার যে অবস্থান নিয়েছেন এবং দেশের মানুষ যেভাবে তাকে সাড়া দিয়েছেন; তাতে বর্তমান সরকারের আর শেষ রক্ষা হবে না। সভাপতির বক্তব্যে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন হবে না। আগামী দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সূত্র : প্রতিদিনের সংবাদ

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত