শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

প্রাণভিক্ষা চাইলেও মন গলেনি ঘাতক দুলাভাইর



ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে: প্রথমে আল আমীনের হাত-পা বাঁধা হয়। এ সময় দুলাভাই ফয়সলের কাছে প্রাণভিক্ষা চায় সে। কিন্তু মন গলেনি ঘাতক ফয়সলের। হাত-পা বাঁধার পর আল আমীনের গলায় মাফলার পেঁচিয়ে ধরে ফয়সল। গামছা পেঁচানো অবস্থায় এক সময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আল আমীনের দেহ। খুনের ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া ঘাতক দুলাভাই পুলিশের কাছে এসব তথ্য জানায়।

খাদিম চা বাগানের নির্জন এলাকা হচ্ছে ওই স্থান। চারদিকে টিলা আর টিলা। টিলার মধ্যখানে রয়েছে ফাঁকা কিছু জায়গা। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পাহাড়ি ঝর্ণা। ওই স্থানে ঘাতক দুলাভাই ফয়সল নিজ হাতে খুন করে শ্যালক আল আমীনকে। পুলিশ রোববার বিকালে আল আমীনের লাশ উদ্ধার করে তখন মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। আর প্যান্ট পরিহিত আল আমীনের মরদেহ উপুড় হয়ে পড়েছিল সবুজ ঘাষের উপর। পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঘাতক ফয়সল সব ঘটনা স্বীকার করেছে। তবে- পুলিশ জানিয়েছে, খুনের ঘটনার সময় ফয়সল একা ছিল না। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিল। তার তিন সহযোগীর কথা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে। তবে- তাদের নাম বলেনি।

পুলিশও ধারণা করছে- ফয়সল একা এই কাজ করতে পারবে না। তার সহযোগীরা ছিল। কিন্তু ফয়সল সহযোগীদের পরিচয় জানায়নি। এদিকে- মাদরাসা ছাত্র আল আমীন খুনের ঘটনায় গতকাল দুপুরে সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশ তার ১৬১ ধারার জবানবন্দি রেকর্ড করেছে। বিকালের দিকে পুলিশ তাকে সিলেটের আদালতে পাঠিয়েছে। আদালতেও ঘাতক ফয়সল ঘটনার স্বীকার করার কথা রয়েছে।

সিলেটের ভাঙ্গাটিকরের টিকরপাড়া এলাকার নুরুল ইসলাম টুটুলের ছেলে আল আমীন। তিন ভাই বোনের মধ্যে আল আমীন দ্বিতীয়। বড় বোন আয়েশা বেগমের স্বামী হচ্ছে ঘাতক ফয়সল। আল আমীন ঘাষিটুলা মাদরাসার হিফজ শাখার ছাত্র। কোরআন শরীফের ২৩ পাড়া মুখস্থ ছিল তার।

পারিবারিক সূত্র জানায়- সিলেটের বন্দরবাজার এলাকার পুরাতন কাপড় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম টুটুল প্রায় দুই বছর আগে থেকে মেয়ে আয়েশা বেগমের জন্য পাত্র খুঁজছিলেন। সিলামের ছেলে ফয়সল আহমদ লেবাসে মৌলভী ধরনের। নামাজ পড়ে। এই সময় ফয়সলের সঙ্গে যোগাযোগ হয় টুটুলের। তিনি মেয়ের জামাই হিসেবে প্রথম দেখাতেই ফয়সলকে পছন্দ করেন। টুটুলও চাচ্ছিলেন- মেয়ের জন্য ধার্মিক এক ছেলে। পেয়ে গেলেন ফয়সলকে। পারিবারিক খোঁজ খবরও নেননি। নিজের আত্মীয় স্বজনকেও বিষয়টি জানাননি। নিজে একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফয়সলের সঙ্গে নিজের মেয়ে আয়েশাকে বিয়ে দেন। দুই পরিবারের সম্মতিতেই বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়। আয়েশাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় স্বামীর বাড়ি। কিন্তু কপালে সুখ সইল না আয়েশার। স্বামী বেকার। কোনো কাজ করে না। নানা অপরাধে জড়িত। এরপরও সংসার টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা তার। পাশাপাশি স্বামী ফয়সলের আবদার বাড়তে থাকে। যৌতুক চায় আয়েশার কাছে। কিন্তু আয়েশা তাতে রাজি নয়। এ নিয়ে ফয়সলের সঙ্গে আয়েশার ঝগড়া লেগেই ছিল। কয়েক মাস ধরে ফয়সল আয়েশাকে মারধর করতে থাকে।

প্রায় দেড় মাস আগে আয়েশার উপর চালায় নির্মম নির্যাতন। এই নির্যাতনে আয়েশা কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসার কথা বলে পিতার বাড়ি এসে থেকে যায়। নির্যাতনের ভয়ে স্বামীর বাড়ি সে নিজেই যাচ্ছিল না। এই বিরোধ নিয়ে শ্বশুর টুটুল ও শ্যালক আল আমীনের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয় ফয়সলের। বোনকে নির্যাতন করায় দুলাভাইকে কয়েক দিন আগে গালিগালাজও করেছিল আল আমীন।

ঘটনার শুরু শনিবার দুপুরে। ওই দিন রিকশা নিয়ে ভাঙ্গাটিকর এলাকায় ফয়সল আহমদ এসে শ্যালক আল আমীনের মোবাইলে ফোন দেয়। আল আমীন বাসাতেই ছিল। কোলে ছিল তার ছোট ভাই। দুলাভাইয়ের ফোন পেয়ে বাসা থেকে সে বেরিয়ে আসে। এরপর ফয়সল শ্যালক আমীনকে নিয়ে সিএনজি অটোরিকশাযোগে চলে যায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আল আমীন না ফেরার সন্দেহ হয় পরিবারের। তারা ডেকে আনেন জামাই ফয়সলকে। কিন্তু ফয়সল প্রথমে তাদের কাছে আল আমীনের কথা অস্বীকার করে। সে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে আল আমীনের সন্ধান করে বিভিন্ন স্থানে। রাতে ফয়সলের আচরণ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে পরিবারের লোকজন পুলিশ ডেকে এনে ফয়সলকে তুলে দেন।

রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও ফয়সল পুলিশের কাছে আল আমীনের ব্যাপারে মুখ খুলেনি। শেষ পরদিন রোববার জানায়- আল আমীন খাদিম বাগানে আছে। সেখানে তাকে রেখে আসা হয়েছে। এই খবরের প্রেক্ষিতে পুলিশ ফয়সলকে নিয়ে অভিযানে নামে। অর্ধেক পথ যাওয়ার পর ফয়সল পুলিশের কাছে জানায়- সে নিজেই আল আমীনকে খুন করেছে। পরে তার দেখানো স্থান থেকে আল আমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

রোববার রাত ও সোমবার দিনভর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক ফয়সল খুনের সব ঘটনা পুলিশকে খুলে বলে। এর প্রেক্ষিতে সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশ তার ১৬১ ধারার বক্তব্য রেকর্ড করে।

সিলেটের কোতোয়ালি থানার ওসি গৌসুল হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ঘাতক ফয়সল পুলিশের কাছে খুনের ঘটনা স্বীকার করেছে। তার বক্তব্য পুলিশ রেকর্ড করেছে। এ কারণে তাকে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পারিবারিক কলহের জের ধরে আল আমীনকে খুন করা হয়েছে বলে ঘাতক ফয়সল তাদের কাছে তথ্য দিয়েছে। ঘটনাটি মর্মান্তিক। পুলিশ ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতে দ্রুত চার্জশিট জমা দেবে বলে জানান তিনি। এদিকে- গতকাল বিকালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহত আল আমীনের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এরপর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে- সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় নিহতের পরিবারের কেউ মামলা করেননি। রাতে তাদের মামলা করার কথা রয়েছে।

নিহত আল আমীনের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। মা পারভীন বেগম ও বোন আয়েশা বেগম বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। সূত্র: মানবজমিন

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত