রবিবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী



নিউজ ডেস্ক::‘ঘুষের সহনীয় মাত্রা’ এবং ‘অফিসাররা চোর, মন্ত্রী চোর’ গত ২৪ ডিসেম্বর নিজের দেয়া এমন বক্তব্যের ব্যাখা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গত ২৪ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবনের একটি অনুষ্ঠানের সংবাদ বেশিরভাগ গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলেধরা হলেও কতিপয় পত্রিকাও অনলাইন মিডিয়ায় আমার বক্তব্য খন্ডিতভাবে প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। সেই বিভ্রান্তির উপর ভিত্তিকরেই কতিপয় বিশিষ্টজন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতামতও জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে আমি বলেছিলাম, আমাদের সম্পদ কম। যতটুকু সম্পদ আছে তার সবটুকু সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে হবে। দুর্নীতি, অপচয় এবং অপব্যয় বন্ধ করতে হবে। এক টাকা দিয়ে দুই টাকার কাজ করতে হবে। সেই ধারাবাহিকতায় অব্যাহতভাবে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা ও পরিদপ্তরে এই ধারনা পরিস্কার হয়েছে। অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটেছে শিক্ষাখাতের বিভিন্ন অঙ্গে। ভর্তি, ক্লাস, পরীক্ষা, শিক্ষাক্রম, অবকাঠামো, তথ্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলাসহ সর্বক্ষেত্রে আধুনিকায়ন ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থাসমূহের মধ্যে ভাবমূর্তির দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়েছিল পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। চরম দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, মনিটরিং দুর্বলতাছিল দৃশ্যমান।

কর্মকর্তারা ঘুষ-দুর্নীতিতেছিল আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এসবই ছিল পূর্ববর্তী বিএনপি-জামাত সরকারের অপশাসনের ফসল। সেই সময় ডিআইএ কর্মকর্তারা স্কুল-কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে অসহায় শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার ঘুষের খাম গ্রহণ করার সময় বলতো এর ভাগ উপরেও দিতে হয়। তাতে শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করতে বাধ্য হতো, তাদের প্রদত্ত ঘুষ শুধু পরিদর্শনকারী অফিসাররাই খায় না, উর্ধ্বতন আমলারাও পায়, এমন কি মন্ত্রী হিসেবে আমিও পাই। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করতো- ‘অফিসাররা চোর, মন্ত্রীও চোর’।

তিনি বলেন, সেই সময়ে তাদেরকে ঘুষ-দুর্নীতি থেকে বিরত রাখার পরিবেশ তো ছিলই না। অনেক শিক্ষক এসে আমার কাছে কান্নাকাটি করে বলতো- আমরানি বেতনের চাকরি করি, এতো টাকা আমরা কোথা থেকে দেবো? এক মাসের সম্পূর্ণ বেতনের টাকা ঘুষ দিলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা খাব কী? ঘুষের মাত্রা আরেকটু সহনীয় হলেও বাঁচতাম বলে তারা মন্তব্য করতো। ২৪ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় অতীতের ঐ সব ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরতে গিয়েই আমি উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, ‘ঘুষের সহনীয় মাত্রা’ এবং ‘অফিসাররা চোর ও মন্ত্রী চোর’।

তিনি বলেন, বিএনপি-জামাতের সেই অরাজকতা থেকে ডিআইএ-কে আজকের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্সনীতি জোরদার করা হয়েছে। ডিআইএ’র পুরানো দুর্নাম ঘুচানোর জন্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং পদ্ধতি জোরদার করা হয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে ইতিবাচক হতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, অভিযোগ পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

পিয়ারইন্সপেকশন পদ্ধতি চালুকরণ, ডিজিটাল মনিটরিং পদ্ধতি চালুকরণ, ৩৬,৭০০ স্কুল-কলেজকে ডিজিটাল অটোমেশনের কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ গ্রহণ, ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইউটিউব চালুকরাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ডিআইএ-এর একজন কর্মকর্তাকে ঘুষসহ দুদকের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ডিআইএ এখন পূর্বের তুলনায় অনেকখানি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। আমরা একে দুর্নীতিমুক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রেখেছি।

তিনি দাবি করেন, বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ কতিপয় মিডিয়ার খন্ডিত ও ভিত্তিহীন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে আমার বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলছেন। তাদের উদ্দেশ্যে সবিনয়ে বলতে চাই, সুদীর্ঘ কাল ধরে আপনারা আমার সততার সংগ্রাম, নীতি-আদর্শ, কর্তব্যনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ বিষয়ে অবগত। মিডিয়ার খন্ডিত ভিত্তিহীন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে কোন মন্তব্য করার আগে সরাসরি আমাকে প্রশ্ন করলে অনেক বেশি খুশি হতাম।

মন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ আবার আমার অসহায়ত্বের কথা বলেন। শিক্ষকদের সাথে আমি শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার করে থাকি। কারো ত্রুটি-বিচ্যুতির কথাও ভদ্রভাবে তুলে ধরি। আমি মানুষের সাথে ব্যবহারে অত্যন্তনমনীয় হলেও নীতি-আদর্শ-সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমি দৃঢ় ও কঠোর। আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমি অবিচল। সততা, স্বচ্ছতা আর দেশ প্রেমের ভিত্তিতেই একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেশ ও জাতির সেবায় সারাজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। এটিই আমার রাজনৈতিক শিক্ষা।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতের অনেক অর্জন যেমন রয়েছে, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন নিশ্চিতকরাসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ আছে। সর্বক্ষেত্রে আমরা দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে চাই, সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত