বৃহস্পতিবার, ১৬ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মাঠে আওয়ামী লীগ অগোছালো বিএনপি



প্রতীক ইজাজ ও বদরুল আলম মজুমদার: দৃশ্যমান রাজনীতিতে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন; একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ঠিকই প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা ঘোষণা দিয়েই শক্ত অবস্থানে নির্বাচনী মাঠে। বিশেষ করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে সামনে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। পক্ষান্তরে নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। প্রকাশ্যে দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে পরিষ্কার করে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ঠিকই প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। দল ঠিকই জানে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী এবার সংবিধান মেনেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে তাদের।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ও দলীয় সূত্রগুলো থেকে দল দুটির নির্বাচনী প্রস্তুতির নানা তথ্য জানা গেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতি ও প্রচারণায় এখনো আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপি অনেক পেছনে। তৃণমূলে সংগঠন গোছানোর কাজে এবং নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীনরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে। বিশেষ করে সদ্য অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেন্দ্র করে নতুন করে নির্বাচনী কৌশল প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সুবিধাজনক অবস্থানে তারা। এই নির্বাচনে জয় পেয়ে একদিকে যেমন মাঠপর্যায়ে দল ও সরকারের জনপ্রিয়তা প্রমাণ হয়েছে; তেমনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে বিভিন্ন মহলের যে সংশয় ছিল, তা কিছুটা হলেও দূর হয়েছে বলে মনে করছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন নিয়ে নতুন উদ্যমে মাঠে নেমে পড়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, রাজনীতির নানা জটিল সমীকরণ এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না বিএনপি। খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনী প্রস্তুতি, নাকি দুটোই একসঙ্গে—এই সিদ্ধান্ত নিতেই হিমশিম খাচ্ছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে দলের মধ্যেও। ফলে খালেদা জিয়ার কারাদন্ডের আগে যে নির্বাচনী কৌশল নিয়ে মাঠে ছিল দলটি, সেখানেও কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। আওয়ামী লীগ যেখানে দলীয় কোন্দল নিরসন করে দেশব্যাপী ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি করছে; বিএনপি সেখানে এখনো খালেদা জিয়ার মুক্তি কর্মসূচিতেই বন্দি হয়ে রয়েছে। অবশ্য নির্বাচনকে আলাদা করে দেখতে নারাজ দলটি। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, সব কিছুই একসূত্রে গাঁথা। মুখে স্পষ্ট করে না বললেও এসবই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আভাস বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।

জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক আগে থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাঠে রয়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং জনপ্রিয়। নতুন ভোটার ও নারী ভোটার এবং তৃণমূলের দলীয় সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। আগামী জাতীয় সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে।

বিএনপির নির্বাচন প্রস্তুতির বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আলাদা করে নির্বাচনী প্রস্তুতির কোনো ব্যাপার নেই। আমরা চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নির্বাচনকালী একটি নিরপেক্ষ সরকারের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছি। আমি মনে করি, গণতন্ত্রের মুক্তির আন্দোলনই হচ্ছে আমাদের প্রধান কাজ। তাই আলাদাভাবে নির্বাচন নিয়ে মাতামাতির কিছু নেই। তাছাড়া যারা মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করতে চান, তাদের একটি সাধারণ নির্দেশনা দলের পক্ষ থেকে দেওয়া আছে। আমরা আমাদের নেত্রীর মুক্তি ও নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে এনেই নির্বাচনে যাব।’

এগিয়ে আওয়ামী লীগ : জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় কোন্দল নিরসনে কঠোর অবস্থানে দল। দলের অন্তর্কোন্দল সৃষ্টিকারী নেতাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সর্বশেষ খুলনার নির্বাচনের পর বিজয়ী মেয়র ও কাউন্সিলররা গণভবনে দেখা করতে এলে তিনি এ ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি দেন। এর আগে গত ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকেও তিনি বলেন, ‘যারা দলের ও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তারা যদি এমপি হয়ে থাকেন অথবা এমপির জন্য মনোনয়ন চান, আমার হাত থেকে তারা মনোনয়ন পাবেন না। তারা দলীয় পদধারী হলে বহিষ্কার হবেন।’ এ বিদ্রোহী নেতাদের তালিকা করতে আট সাংগঠনিক সম্পাদককে নির্দেশ দেন তিনি।

দলীয় সূত্রমতে, বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে কেন্দ্র থেকে গঠিত ১৫ টিমের প্রতিনিধিরা গত ২৬ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে সাংগঠনিক সফর শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ২০টি জেলা সফর সম্পন্ন করেছে টিমগুলো। মাঠপর্যায়ের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আলাদাভাবে তৈরি করে আগামী জুনের মধ্যে হাইকমান্ডের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। সাংগঠনিক সফরে দলীয় কোন্দল নিরসন ছাড়াও আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, প্রতিপক্ষের প্রার্থীর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহসহ ১২ এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে টিমগুলো।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘যেসব জায়গায় স্থানীয় নেতা, এমপি-মন্ত্রীর মধ্যে সমস্যা আছে, সেখানে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা গিয়ে তা সমাধান করে দিচ্ছেন। আশা করি, আগামী নির্বাচনের আগেই এসব ছোটখাটো সমস্যা দূর হবে। নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে কাজ করবেন।’

সূত্র আরো জানায়, দলের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে গত বছরের জুলাই থেকে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ করছে দল। ইতোমধ্যে সারা দেশে এই কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব) ফারুক খান। এই কমিটি এলাকাভিত্তিক ভোটকেন্দ্র, বুথের সংখ্যা, মোট ভোটার সংখ্যা, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র, প্রতিপক্ষের রাজনীতিক প্রভাব, নিজ দলের অবস্থান সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য অবহিত করবে। এ কমিটি দিয়ে সামনে বিএনপি-জামায়াত আন্দোলন সংগ্রাম করার চেষ্টা করলে সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে যাতে মোকাবিলা করা যায়, সে চিন্তাও করছে আওয়ামী লীগ। কমিটির আকার হচ্ছে ৭১ থেকে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট।

বিশেষ করে তৃণমূলে দল শক্তি বাড়াচ্ছে বলে নেতারা জানিয়েছেন। তারা বলেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে অংশ নেবে। এ জন্য সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রিয়, গ্রহণযোগ্য ও কর্মীবান্ধব প্রার্থী বাছাইয়ে মাঠে নেমেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে মাঠে কাজ করছে অনুসন্ধান কমিটি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত দলের তৃণমূলের সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। জুন থেকে নির্বাচনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার চেয়ে সেসময় উদ্ভূত পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবিলার কৌশলে এগোচ্ছে দল।

পিছিয়ে বিএনপি : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও বিএনপির কোনো দাবিই এখানো আদায় হয়নি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে দলটি একাধিক দাবি নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও কার্যত তারা কোনো ফল আনতে পারছে না বা দাবি পূরণের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারেনি। তাছাড়া নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য তৃণমূলে শক্তি বাড়াতে পারেনি। বিশেষ করে সংগঠনকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করার কাজ গত সাড়ে চার বছরেও শেষ করতে পারেনি দলটি। আর আগামী নির্বাচনের আগে এসব কাজ শেষ করার কোনো লক্ষণও নেই আপাতত। তাই একটি অগোছালো দল নিয়েই বিএনপিকে শক্তিশালী আওয়ামী লীগের বিপক্ষে নির্বাচনে যেতে হচ্ছে বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতারা।

দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিণতির ব্যাপারেও দলের নেতারা অন্ধকারে। চেয়ারপারসনকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না—এমন কথা দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও কোনোভাবেই এবার বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় নেতারা জানেন না চেয়ারপারসন কবে মুক্তি পাবেন আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না। তাই আগামী নির্বাচনের অল্প সময় আগেও বিএনপির নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়টাকে কাজে লাগাতে পারছে না।

দলীয় সূত্রমতে, যেকোনো সময় নির্বাচন করার প্রস্তুতি আছে দলের। মনোনয়ন নিয়েও কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। কারণ হিসেবে নেতারা বলছেন, দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় দুইয়ের অধিক যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কোনো কোনো আসনে পাঁচ-ছয়জন প্রার্থীও রয়েছেন মনোনয়নের তালিকায়। দলের নেতারা বলছেন, তারা নির্বাচনের কথা আগেভাগেই বলতে চান না। তাই গোপনেই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। বিশেষ করে চলতি রমজান মাস বিএনপি নির্বাচনী কাজেই ব্যয় করছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের প্রতিটি আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতারা হাজার হাজার ইফতার মাহফিলের আয়োজন করছেন। এসব ইফতার মাহফিলে ক্ষেত্রবিশেষে দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও অংশ নিচ্ছেন।

সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ। 

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত