বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

লাউয়াছড়ার হুমকি বৃক্ষ নিধন আর প্রাণীর মড়ক



নিজস্ব প্রতিবেদক: দিন দিন ধ্বংসের ধারপ্রান্তে যাচ্ছে দেশের অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। দেশে বিদ্যমান ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম এটি। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ১২৫০ হেক্টর আয়তনের বন জীববৈচিত্রে ভরপুর। বিশ্বে বিলুপ্ত প্রায় উল্লুকের জন্য এই বন বিখ্যাত। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদ। জুলভার্নের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে করা ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ ছবিটির একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়ার রেললাইন এলাকায়।
জীববৈচিত্রের দিক থেকে লাউয়াছড়ার জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম বনগুলোর একটি। আয়তনে ছোট হলেও এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রানীর এক জীবন্ত সংগৃহশালা। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রানী এ বনে স্তন্যপায়ী আছে নানা প্রজাতির।
আর এই লাউয়াছড়াই দিন দিন ধ্বংসের ধারপ্রান্তে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, প্রভাবশালীদের বন দখল, অবাধে বৃক্ষনিধন, অবৈধ করাতকল স্থাপন, বনের ভিতর রেল-সড়ক পথ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং রক্ষণাবেক্ষণে অসচেতনতাই এই বনের আয়তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি এই বনে বৃদ্ধি পেয়ে গাছ চুরি ও প্রাণী মৃত্যু। বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম হিসেবে যতোটা নিরাপদ তার চেয়ে বেশি বিপদজনক হয়ে উঠছে লাউয়াছড়ার অভ্যন্তরীণ সড়ক ও রেলপথসমূহ। প্রতিনিয়তই দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় কিংবা চাকায় পিষ্ট হয়ে কোনো না কোনো বনপ্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। ফলে লাউয়াছড়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত সড়ক ও রেলপথসমূহ বন্যপ্রাণীকুলের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। এছাড়াও ছুটির সময়ে মাত্রাতিরিক্ত পর্যটকদের কারণে বনের বন্যপ্রাণির বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহনের হুড়োহুড়ি, শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক পানি, খাবার ও নিরাপদ বাসস্থান সংকট, এসব মিলিয়ে উদ্যানের জীব-বৈচিত্র্য ও প্রকৃতি সুরক্ষা নিয়ে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
উদ্যানের গাঁ ঘেষে বনজঙ্গল ও মাটি কেটে স্থাপিত হচ্ছে বিভিন্ন কটেজ। ফলে বনের ভেতরে দল বেঁধে মানুষের অবাধ বিচরণ বন্যপাণীর জন্য খাবার সংগ্রহ ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে বন্যপ্রাণীর খাবার ও আবাসস্থল বিনষ্ট হচ্ছে। যে কারণে খাবারের সন্ধানে জঙ্গলের দূর্লভ প্রাণীগুলো জনপদে ছুটে এসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের হাতে ধরা পড়ে অথবা গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সৈয়দ মহসীন পারভেজ বলেন, ‘মানুষের মতো বন্যপ্রাণীরও স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তাটুকু আমরা চাই। মৃত্যুর এমন ভয়াবহতা কখনোই কাম্য হতে পারে না। যে কোনো দেশের জন্যই তার নিজস্ব বন্যপ্রাণীগুলো জাতীয় একটি সম্পদ। এদের নির্ভয়তা, সুস্থতা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগের।’
সাধারন সম্পাদক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন বলেন, ‘লাউয়াছড়ার আগের অবস্থা এখন নেই বললেই চলে। তাছাড়া বন্যপ্রাণীর সংখ্যাও কমে আসছে। কিছুটা যানবাহনের সাথে পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে আর কিছুটা মারা যাচ্ছে প্রাকৃতিক ভাবে। লাউয়াছড়ার পরিবেশকে পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে এবং বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হলে অতিসত্ত্বর পর্যটকদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।’
জীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা রোকশানা রেহমান বলেন, ‘লাউয়াছড়া উদ্যান হচ্ছে আমাদের দেশের গর্ব। এই বনে অনেক বিপন্ন প্রাণীর আবাস রয়েছে। কিন্তু দিন দিন এই বনকে বিভিন্নভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।’
সেভ দ্যা নেচার অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি জাকের আহমদ অপু বলেন, ‘লাউয়াছড়া আমাদের সম্পদ। এটিকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকারের লাউয়াছড়াকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় এনে এটি রক্ষা করা দাবি জানাচ্ছি।’
বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন কর্মকর্তা আবু মুছা শামসুল মোহিত চৌধুরী বলেন, ‘লোকবল কম থাকায় অনেক সময় আমরা সামাল দিতে পারি না। তবে এখন থেকে নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে পর্যটকদের যেতে দেয়া হবে না। এবং ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রিত ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। এর জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।’

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত