সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন: কমলগঞ্জে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ



রুপম আচার্য্য: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নে নতুন বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের নামে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এলাকাবাসীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে দফায় দফায় এই টাকা আদায় করা হলেও এখনো অনেক স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। একটি গ্রামের গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রথম দফায় টাকা আদায়ের পর মিটারের সংযোগের নামে দ্বিতীয় দফায় মিটার প্রতি অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা নেয়ারও অভিযোগও রয়েছে। তবে অভিযুক্তরা অর্থ আদায়ের বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার জন্য টাকা প্রদানকারী মসুদ মিয়া বাদি হয়ে ২৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ে কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

বড়চেগ গ্রামের মসুদ আলী, মাসুক মিয়া, মো. আসাদ, আমির হোসেন ও জোবায়ের আহমদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগপত্রে জানান, বিদ্যুতায়নের দ্বিতীয় দফায় বড়চেগ এলাকার মানুষের কাছ থেকে স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহমুদ আলী ও তার সহযোগী সুলেমান মিয়া বড়চেগ গ্রামের গ্রাহকদের কাছ থেকে ২৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন। পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে পঞ্চাশ হাজার ও এক প্রবাসী পরিবারের কাছ থেকে ৭ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, টাকা দিতে পারেনি গ্রামের এমন ৮০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগের বাইরে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় দুই সংবাদ কর্মীকে জনপ্রতিনিধি মাহমুদ আলী ও তার লোকজন হুমকি দিয়ে কয়েক ঘন্টা আটকে রাখেন।

ঐ ঘটনায় কমলগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন গণমাধ্যম কর্মী।
সরেজমিনে গ্রাহকরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর শতভাগ বিদ্যুতায়ন সিদ্ধান্তের আওতায় রহিমপুর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামে গত বছরের শেষ দিকে প্রথম দফায় ৫ কি.মি. ও দ্বিতীয় দফায় সাড়ে ৪ কি.মি. বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হয়। মোট ৫৬৬ জন গ্রাহকের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিমাণে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়। এলাকাবাসী জানান, উপজেলা আ’লীগ নেতা ও রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যানের নাম করে ইউপি সদস্য মাহমুদ আলী, সুলেমান মিয়া, জয়নাল মিয়া, মিন্নত আলী অর্থ আদায় করছেন। এক প্রবাসী পরিবার পল্লী বিদ্যুতের পরিচালক মো. আব্দুল আহাদ এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেন।


বড়চেগ গ্রামের আমির হোসেন বলেন, দুইটি মিটারের বিপরীতে ১৪ হাজার টাকা দেওয়া হলে তাদের চাহিদা মতো আরও ৬ হাজার টাকা দিতে না পারায় বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া যায়নি। মসুদ মিয়া বলেন, আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে মাহমুদ মেম্বার ও সোলেমান মিয়া ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। তাদের চাহিদাকৃত টাকা দিতে না পারায় আমার বাড়ি সহ গ্রামের প্রায় ৮০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান করা হয়নি। গ্রামের মো. খিজির মিয়া বলেন, ’আমার কাছ থেকে ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছে। এটা সরকারি বিদ্যুৎ কি-না তা বুঝতে পারিনি, তাই টাকাগুলো দিয়েছি।’
এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহমুদ আলী নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেন, ’শুনেছি জয়নাল মিয়া ও সুলেমান মিয়াসহ অন্যরা বিদ্যুৎ নিয়ে টিকাদারের সাথে দৌড়াদৌড়ি করছে। এলাকায় কাকে বিদ্যুৎ দেয়া যায় কাকে দেয়া যায়না সেটা তারাই ঠিক করে।’ তারা কোন টাকা নিচ্ছে কি-না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ’আমি শুনেছি মিটার সিকিউরিটির টাকা দিচ্ছেন গ্রাহকরা।’ সাংবাদিকদের কেনো আটকে রেখেছিলেন জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন।
একই অবস্থা ইউনিয়নের কালাছড়া জগন্নাথপুর, রামচন্দ্রপুরসহ অন্যান্য গ্রামেও। জানা যায়, রামচন্দ্রপুর গ্রামে ২০১৫ সালের মে মাসে প্রথম দফায় ৩ দশমিক ৮৮৯ কিলোমিটার বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হয়। এলাকাবাসী জানায়, সাবেক ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল মজিদ খানের মাধ্যমে ২২৬ জন গ্রাহকের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বড় অঙ্কের টাকা প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছ থেকে আদায় করা হয়। আর পুরো প্রক্রিয়ার তত্বাবধানে ছিলেন রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হবার পর মিটার সংযোগের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ হাজার পাঁচশত টাকা করে আদায় করা হয়।


বিদ্যুৎ কার্যালয় জানায়, মিটার সিকিউরিটির সরকারি মূল্য ৬শত টাকা এবং পাচঁশত টাকা সদস্য ফি। কিন্তু এতো টাকা পয়সা দেবার পরও বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি গ্রাহকরা। এবিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মজিদ খান মোবাইলে বলেন, ’এই টাকাতো চেয়ারম্যান সাবের মাধ্যমে তোলা (আদায়) হয়েছে। আমি উনার কাছে দিয়েছি।’
সাবেক মেম্বার আব্দুল মজিদ খানের কথার উদৃতি দিয়ে প্রশ্ন করা হলে, রহিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল বলেন, ’এই কথাটা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও বানোয়াট। তবে মিটার সিকিউরিটির জন্য যে টাকা তোলা হয়েছে তা অবশ্যই জমা দেয়া হয়েছে।’ বড়চেগ গ্রামের মানুষের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’কেউ টাকা পয়সা নিলে আমার কাছে অভিযোগ করবে কিন্তু কেউ করেনি। তবে আমরা অনেক সময় শুনি যারা কাজ করে ঠিকাদার কন্ট্রাকটরের লোকজন তারা খাওয়া-দাওয়ার জন্য হয়তো এদিক সেদিক বলতে পারে। এজন্য কেউ টাকা পয়সা দিয়ে থাকলে সেটা অন্য জিনিস।’ অভিযোগ বিষয়ে সোলেমান মিয়া বলেন, পল্লী বিদ্যুতের লাইন নির্মাণে অর্থ আদায় বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ’ঠিকাদাররা কোন প্রকার আর্থিক লেনদেন করতে পারেন না। কারো বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ উঠলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আর রামচন্দ্রপুর গ্রামের বিদ্যুতায়ন বিলম্ব হয়ে গেছে দ্রুত আবার চালুর ব্যবস্থা করবো।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী শিবু লাল বসু বলেন, এসব বিষয়ে আমার কাছে কোন অভিযোগ আসেনি। বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত