শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আইসল্যান্ডের ফুটবল বিপ্লব



উপল বড়ুয়া: চারদিকে বরফ আর বরফ। তার মধ্যে নর্ডিক অঞ্চলের একটি ছোট দেশ আইসল্যান্ড। নাম দেখেই বুঝে নেয়া যায় দেশটির পরিবেশ। ইউরোপের আটলান্টিক মহাসাগরের সীমারেখার ওপরে অবস্থিত দেশটি এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে চমকে দিয়েছে বিশ্বকে। রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েই একটা রেকর্ড গড়ে ফেলেছে আইসল্যান্ডিয়রা। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ও কম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে তারা। আইসল্যান্ডের আয়তন মাত্র ৪০,০০০ বর্গমাইল। ৩,৪৮,৫৮০ জনসংখ্যার আইসল্যান্ডের আগে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড ছিল ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাকোর। ১.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার ক্যারিবিয়ান দেশটি বিশ্বকাপ খেলেছিল ২০০৬ সালে।

আইসল্যান্ডের জাতীয় খেলা হচ্ছে হ্যান্ডবল এবং তা বরাবরই জনপ্রিয় দেশটিতে। হ্যান্ডবলের জনপ্রিয়তায় ফুটবল ছিল অনেকটাই ফিকে। যদিও দেশটিতে ফুটবলের হাতেখড়ি হয় ১৯৩০ সালে। কিন্তু অনেক দিন ধরেই তা ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। ফুটবলকে জনপ্রিয়তার লক্ষ্যে আইসল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশন বেশকিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। জাতীয় দল গঠনের পর পরই পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন ঘটাতে থাকে দেশটি।

আইসল্যান্ড তাদের ফুটবল দলে প্রথম থেকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে তরুণ খেলোয়াড়দের। এছাড়া পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং ক্লাবগুলোতেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে দেশটি। তারই অংশ হিসেবে ক্লাবগুলো স্থানীয় পার্টনারশিপে যায় এবং সারা দেশে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ইনডোর ফুটবল পিচ তৈরি করে। ফুটবলকে জনপ্রিয়তার লক্ষ্যে দেশটি নিয়মিত স্কুল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে আসছে। প্রতিটি স্কুলেই রয়েছে প্রশিক্ষিত ফুটবল কোচ।

গত ব্রাজিল বিশ্বকাপেই আইসল্যান্ড বিশ্বকাপের টিকিট পেতে পারত। কিন্তু ইউরোপ বাছাইপর্বের প্লে-অফে ২-০ গোলে হেরে তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয় ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। এরপরই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দেশটি। ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নসশিপে এসেই তাক লাগিয়ে দেয় বিশ্বকে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের মতো জায়ান্ট দলকে হারিয়ে তারা উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে।

ইউরোর অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ দেশটি নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলতে থাকে নতুন উদ্যমে। বাছাইপর্বে তারা গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় ক্রোয়েশিয়া ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী দলকে। তবে কোনোকিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাদের সামনে। শেষে কসোভাকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা লিখে ফেলে একটি অনন্য রূপকথা। প্রথমবারের মতো উঠে যায় ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে।

আসন্ন বিশ্বকাপে আইসল্যান্ড খেলবে কোচ হেইমির হালগ্রিমসনের অধীনে। মূলত এই স্বদেশি কোচই পুরোপুরি বদলে দেন আইসল্যান্ডের ফুটবলকে। ২০১৬ ইউরোর আগে লার্স লাগেরবাকের স্থলাভিষিক্ত হোন তিনি। এরপরই শুরু হয় আইসল্যান্ডের ফুটবল বিপ্লব।

২০১২ সালে আইসল্যান্ড ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ছিল ১৩১তম স্থানে। গত ছয় বছরে দেশটি নিজেদের অবস্থান তৈরি করার জন্য কঠোরভাবে খেটেছে। বর্তমানে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান ২২তম। এছাড়া ইউরোপের বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের ফলস্বরূপ গত ফেব্রুয়ারিতে তারা ১৮ নাম্বারে উঠে এসেছিল।

ইউরোর মতো বিশ্বকাপেও রূপকথা লেখার প্রতীক্ষায় আছে আইসল্যান্ডিয়রা। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, নবাগত অনেক দল প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসেই বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে আছে ক্রোয়েশিয়া, সেনেগালের মতো দেশ। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগেই আইসল্যান্ডকে শুনতে হচ্ছে বড় দুঃসংবাদ। হাঁটুর চোটে ভুগছেন দলের প্রাণভোমরা গিলফি সিগার্ডসন। মূলত এই এভারটন প্লে-মেকারের ভেলাতে চড়েই বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার হয়েছে আইসল্যান্ডিয়রা। গোল করার পাশাপাশি গোল করাতেও উস্তাদ সিগার্ডসন। চোট থেকে সেরে উঠলে দলটির প্রধান অস্ত্রই হবেন তিনি। আসন্ন বিশ্বকাপে আইসল্যান্ড ‘ডি’ গ্রুপে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে দুুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, ক্রোয়েশিয়া ও নাইজেরিয়াকে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই স্পার্তাক স্টেডিয়ামে তাদের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। আইসল্যান্ডের ইতিহাস বলছে, জায়ান্ট কিলিংয়ের অভিজ্ঞতা তাদের বেশ পুরনো। দেখার বিষয়, পরীক্ষাটা উতরে তারা প্রথম বিশ্বকাপেই কোনো ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে কিনা।

সৌজন্যে: প্রতিদিনের সংবাদ।  

তথ্যসূত্র : ফিফাডটকম, উইকিপিডিয়া

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত