বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কুলাউড়ায় মনু নদীর বাধ ভেঙ্গে প্লাবিত শতাধিক গ্রাম:লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি



নাজমুল ইসলাম, কুলাউডা: গত দু’দিনের গুড়ি গুড়ি আর টানা বর্ষণে এবং উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে দ্রুত বাড়ছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ও রাজনগরে মনু নদীর পানি। নদীর প্রতিরক্ষা বাধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে আউশ ফসল, সবজি ক্ষেতসহ ৫ টি ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক গ্রাম । পানি বন্দী হাজারো মানুষ। বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মনু নদীর পানি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, মনু নদীর পানি বিপদ সীমার ১৭৫ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে প্রতিরক্ষা বাধের অন্তত ২০টি এলাকা।
জানা যায়, প্রবাহিত খর¯্রােতা মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ৬টি স্থানে মঙ্গলবার (১২ জুন) দিবাগত রাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সীমান্তের ওপার (ভারত) থেকে আসা ঢলে আকস্মিকভাবে বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করায় কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নে ৩টি, পৃথিমপাশা ও টিলাগাঁও ইউনিয়নে এবং রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের ভোলানগর গ্রামে পৃথক আরও ৩টি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
সৃষ্ট ভাঙনে ২ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে শতাধিক গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। শরীফপুরের সাথে কুলাউড়া উপজেলা সদরের এবং বাংলাদেশ-ভারত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সোমবার ও মঙ্গলবারের টানা বৃষ্টিতে সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানিতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে মনু নদের পানি বৃদ্ধি পায়।
হাজীপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু জানান, মনু নদী বিপজ্জনক রুপ নিয়েছে। লাগাতার ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর পানি বাড়ছে। মাতাবপুর, মাদানগর, চক রণচাপ, হাসিমপুর, বাড়ইগাও ও মন্দিরাসহ ৬/৭ টি এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। চকরনচাপ বাড়ইগাও ও মাদানগরে এলাকাবাসী বাধ রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া সাধনপুর, কাউকাপন, বাশউরী ও নোয়াগাও এলাকার নদী তীরবর্তী পরিবারগুলোর ঘরবাড়িতে পানি উঠায় তারা নিরাপদ আশ্রয় চলে গেছে। মাতাবপুর, বাড়ইগাও ও তুকলী এলাকায় বাধ গড়িয়ে সমতলে পানি বের হচ্ছে।
শরীফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: জুনাব আলী জানান, মঙ্গলবার শবে কদরের রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমতলা বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মনু প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন শুরু হলে গ্রামবাসী ও বিজিবি সদস্যরা মিলে শতাধিক বস্তা বালু দিয়ে এ স্থান রক্ষা করেন। তবে রাত আড়াইটায় বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রাম এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রুত গতিতে ঢলের পানি গ্রামে প্রবেশ করে। এ পানি বসতঘরসহ ফসলি জমি তলিয়ে যায়। ফলে বাঘজুর, তেলিবিল, চাঁনপুর, খাম্বারঘাট, শরীফপুর, বটতলা, সঞ্জরপুর গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
একই সময় চাতলা সেতুর উত্তর দিকে কয়েক মাস আগে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধও ভেঙ্গে ঢলের পানি দ্রুত গতিতে গ্রামে প্রবেশ করে। ফলে নছিরগঞ্জ, ইটারঘাট, মনোহরপুর, নিশ্চিন্তপুর, মাদানগর গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
ঢলের পানিতে শমশেরনগর-চাতলাপুর চেকপোষ্ট সড়কের বটতলা থেকে চেকপোষ্ট পর্যন্ত ২ কিলোমিটার সড়ক ৩ফুট পরিমাণ পানিতে নিমজ্জিত হলে মঙ্গলবার রাত থেকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের উত্তর ত্রিপুরার কৈলাসহরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
টিলাগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মালিক ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের নবার আলী বাখন খান জানান, টিলাগাঁও ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের মঙ্গলবার রাতে ভাঙন সৃষ্টি হয়। এতে বালিয়া, সন্দ্রাবাজ, মিয়ারপাড়া, ডরিতাজপুর, লহরাজপুর, তাজপুর, খন্দখারেরগ্রাম, কামালপুর, মিয়ারপাড়া, পাল্লাকান্দিসহ ১০ টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েন। পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকড়িয়া ডোমাবিল নামক স্থানে বুধবার ভোররাতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে শিকড়িয়া, গণকিয়া, আলীনগর গ্রামে ২ সহ¯্রাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
এছাড়াও রাজনগর উপজেলা কামারচর ইউনিয়নের ভোলানগর গ্রামে মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধে সৃষ্ট ভাঙনের ফলে ৭-৮ টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
সৃষ্ট ভাঙনের ফলে ঘর-বাড়ী ও ফসলের ব্যাপন ক্ষতি হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
এদিকে বুধবার (১৩ জুন) দুপুর ১২টায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মতিন, উপজেলা চেয়ারম্যান আসম কামরুল ইসলাম, ইউএনও চৌ. মো. গোলাম রাব্বী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শিমুল আলী ও কৃষি কর্মকর্তা জগলুল হায়দার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌ. মো. গোলাম রাব্বী জানান, আমরা উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্থদের দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছি।
পাানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ৬ টি স্থানের ভাঙ্গনের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মনুর নদের পানি বিপদসীমার ১৭৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত বন্ধ না হলে ঝুঁকিপূর্ণ আরও ৫-৭ স্থানে ভাঙন দেখা দিতে পারে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত