শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বানভাসিদের নিয়ে ভোটের রাজনীতি, ফটোসেশনে নেতাকর্মী



হোসাইন আহমদ, অতিথি প্রতিবেদক:

মৌলভীবাজারে মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঁঙ্গে ঈদুল ফিতরের দিন থেকে সপ্তাহ ব্যাপি জেলার প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। এখনও কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অনেক মানুষ পানিবন্ধি। কিন্তু ওই সকল পানিবন্ধিদের নিয়ে সুবিধাবাদী রাজনীতিবীদরা রীতিমতো ভোটের রাজনীতি শুরু করেছেন।
জেলা প্রশাসকের তথ্য অনুযায়ী বন্যায় জেলায় মারা গেছেন ৮জন লোক। ফসলি জমি তলিয়ে, রাস্তা-ব্রীজ-কালভার্ট ও বাড়ি ঘর ভেঙ্গে বানভাসিদের ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার। জেলার নি¤œ অঞ্চলের অনেক পানিবন্ধি মানুষের গবাদিপশু ও হাঁস মুরগিও মারা গেছে। যার পূর্ণ হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। জেলার বানভাসি মানুষের মধ্যে এখনও আতংক বিরাজ করছে। সরেজমিন বিভিন্ন এলাকায় গেলে দেখা যায়, নদীর ¯্রােতে তলিয়ে যাওয়া নিজের জন্মভিটা মেরামতে ব্যস্থ বানভাসি সাধারণ মানুষ। আবার কেউ কেউ ত্রাণের জন্য হাহাকার করছেন। জেলার সর্বত্র জুড়ে অন্য পরিবেশ বিরাজ করছে।
কিন্তু আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ওই পানিবন্ধি মানুষকে নিয়ে মৌলভীবাজারে অনেকটা ভোটের রাজনীতি শুরু হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সডাউনোর মতো এবং মিডিয়া কাভারেজ করতে ঈদের পরের দিনই ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার আসা শুরু করেছেন। আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতসহ অন্যান্য দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশি অনেক প্রার্থী প্রবাস থেকে দেশে এসে বন্যার্তদের পাশে দাাঁড়ানোর নামে ভোটের রাজনীতি শুরু করেছেন। চাহিদার তুলানায় যতসামান্য ত্রাণ সামগ্রী দুর্গত মানুষের হাতে দিয়ে ছবি তুলে ফেইসবুকে আপলোড করেই যেন কাজ শেষ। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও কেন্দ্রীয় নেতার সাথে সেলফি ও ছবি তোলে তাদের অনুসারী দিয়ে সামাজিক যোগাযেগা মাধ্যমে ভাইরাল করার চেষ্টা করছেন।
এগুলো দেখে জেলার সচেতন নাগরিক সমাজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা মন্তব্য করছেন। তারা বলছেন অনেক জায়গায় দেখা গেছে ত্রাণের চেয়ে ক্যামেরা ও নেতাকর্মীর সংখ্যা বেশি। কয়েকজন বন্যার্ত লোককে লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে নেতাকর্মীরা ওই এলাকা ত্যাগ করছেন। এটা অনেকটা রাজনৈতিক নেতাদরে মধ্যে ফটোসেশনে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮ জুন মৌলভীবাজার পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের ১হাজার বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ শেষে ১ হাজার ভান্ডিল টিন ও ৩০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। অথচ জেলা প্রশাসকের তথ্য অনুযায়ী জেলা ব্যাপি পানিবন্ধি মানুষের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭০ হাজার ২’শ ৪৩ জন। ১৯ জুন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে পৌরসভাধীন সৈয়ারপুর এলাকায় লোকনাথ সেবা আশ্রম ও সদর উপজেলার শেরপুরে আজাদ বখত উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজে ত্রাণ বিতরণ করেন। একই দিন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী ডাঃ শফিকুর রহমান অনেকটা আত্মগোপনে এসে মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। জনগনের সহানুভতি পেতে ওই ত্রাণ বিতরনের ছবি জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল করতে দেখা যায়। ২০ জুন জেলা বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান নেতাকর্মীদের নিয়ে মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় তার সাথে প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত থাকার ছবি ফেইসবুকে দেখা যায়। নেতাকর্মীদের আপলোড করা ছবিতে দেখা যায় একজনকে ত্রাণ দেয়ার জন্য প্রায় ৩০-৩৫ জন নেতাকর্মী নাসের রহমানের সাথে ক্যামেরার সামনে হাত বাড়িয়েছেন। এদিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন জেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ভাইরাল করেন।
খোঁজ নিয়ে আরোও জানা যায়, একই ভাবে নামকাওয়াস্তে ত্রাণ দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করছেন, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসিন, মৌলভীবাজার-২ আসনের সাবেক এমপি এম এম শাহিন, এম এ রহিম (সিআইপি), বিলাস ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোর, জেলা জাতীয় পার্টি, জেলা আল-ইসলাহ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনীতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর জেলা সাধারণ সম্পাদক জহর লাল দত্ত বলেন, “এটা সত্য নির্বাচনের আগে এসে বড় বড় দলের প্রার্থীরা জনগনকে ধোঁকা দিয়ে ভোট নিতে চান। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্টে এটি কাম্য নয়”। আমাদের দাবি হলো নির্বাচনের আগে ও পরে সব সময়ই যেন রাজনীতিক দলগুলো জনগনের পাশে থাকে। তিনি আরো বলেন, চলমান ত্রাণ বিতরণেও শুনেছি অনেক জায়গায় অনিয়ম হচ্ছে।
এবিষয়ে মৌলভীবাজার সম্মিলিত সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের অনেকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য সর্বাবস্থায় জনগণের সেবা করা। কিন্তু বানবাসি মানুষকে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড় করে হাতে সামান্য ত্রাণ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড ও ভোটের রাজনীতি কাম্যনয়।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত