মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মৌলভীবাজারে চামড়ার বাজারে ধস, নেপথ্যে কী?
খাসির চামড়া ১০ টাকা!

খাসির চামড়া ১০ টাকা!



চামড়া শিল্পে ধসের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা

বিশেষ প্রতিবেদক::

সারা দেশে চামড়া শিল্পে ধসের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কোরবানির ঈদে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সাড়া না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা। আড়তদাররা বলছেন, গত কয়েক বছরে কাঁচা চামড়ার দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। তারা অভিযোগ করেন ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা ঈদের আগে সিন্ডিকেট করে চামড়া কেনার জন্য কোনো টাকা বরাদ্দ করেনি বলে কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

লাভের আশায় মৌলভীবাজারে পবিত্র কোরবানি ঈদের গবাদি পশুর চামড়া  সংগ্রহের লক্ষে আগে থেকেই খুচরা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এনজিও থেকে অথবা বছর জুড়ে নিজের জমানো সম্বল দিয়ে চেয়ে ছিলেন চামড়া সংগ্রহ করে এ ঈদে লাভের মুখ দেখবেন। অতিরিক্ত দাম দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেও এখন নায্য মূল্যে চামড়া বিক্রি না করতে পাড়ায় দিশেহারা এসব খুচরা ব্যবসায়ীরা।

 

সরেজমিন ঘুরে ঈদের দিন সন্ধ্যার পরে মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমবাজার, বাজার টার্নিং পয়েন্ট ও ঢাকা সিলেট মহাসড়কের বালিকান্দি খেয়াঁঘাটের পাশের চামড়ার হাটে গিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের চরম হতাশার এমন চিত্র দেখা গেছে।

 

জানা যায় এবছর খুচরা ব্যবসায়ীরা শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে তিন’শ থেকে চার’ টাকা দামে গরুর চামড়া ক্রয় করলেও পাইকারদের কাছে সর্বোচ্চ ৩৫০-৪০০ টাকার বেশি দামে চামড়া বিক্রি করতে পারছেননা। কি কারনে ঈদে চামড়ার বাজারে এমন ধস, জানতে চাইলে শহরের বেরিরচরের খুচরা চামড়া ব্যবসায়ী মনু মিয়া দায়ী করেন সিন্ডিকেট ও আরৎদারদের। তবে মনু মিয়ার মত খুচরা আরো ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অনুযায়ী সরেজমিন ঘুরে সিন্ডিকেটের কোন অস্তিত্ত্ব চোখে পরেনি কিংবা এসক্রান্ত কোন বাস্তব তথ্য পাওয়া যায়নি। তার দাবী সিন্ডিকেটের কারনে আমরা খুচরা ব্যবসায়ীরা পথে বসতে বাধ্য হচ্ছি।

তিনি বলেন, টাকা নিয়ে বসে আছি, কিন্তু চামড়ার বাজারে এমন নিম্নমূখি চিত্র দেখে সাহস পাচ্ছিনা চামড়া ক্রয়ের। শহরের পশ্চিমবাজারে দেখা যায় পাইকাররা বিভিন্ন সাইজের গরুর চামড়ার পাশাপাশি খাসির চামড়ার বিশাল স্থুপ নিয়ে বসে আছেন, তবে কাঙ্খিত মূল্য না পাওয়া তা বিক্রি করতে পারছেনা। প্রতিটি খাসির চামড়া ১০-১৫ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি করাও সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানান ব্যবসায়ীরা ।

মৌলভীবাজারের শীর্ষ চামড়া ব্যবসায়ী ও সদর চাদঁনীঘাট ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য শওকত আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন যাবত চামড়া ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকলেও এবছর বাজারের অবস্থা খারাপ থাকায় আগে থেকেই সরে দাঁড়াই। তবে সিন্ডিকেটের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, এখানে সিন্ডিকেট থাকার কোন সুযোগ নেই।

জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম এর সাথে এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সরকার নির্দিষ্ট  মূল্যে চামড়া ক্রয় করার জন্য নির্ধারন করে দিয়েছে, সেক্ষেত্রে কোথাও কোন সিন্ডিকেট আছে কি না তা আমাদের জানা নেই। তিনি বলেন, চামড়ার বাজারে ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে পারছেননা এবিষয়ে গতকালও যদি ব্যবসায়ীরা আমাকে জানাতেন তা হলে ব্যবস্থা নিতাম। ঈদে চামড়ার বাজার নিয়ে জেলা প্রশাসনের কোন বিশেষ নজরদারী আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে  মোঃ তোফায়েল ইসলাম জানান, চামড়া পাচার রোধে নজরদারী বাড়াতে আমরা আগে থেকেই জেলার  সীমান্তবর্তী এলাকার বিজিবি, উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা ও বিভিন্ন থানার ওসিদের নির্দেশনা দিয়েছি।

এদিকে চামড়ার বাজারে খুচরা ব্যবসায়ীদের এমন পরিনতির কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেককে ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করতে দেখা গেছে। শরিফ মাহমুদ নামে একজন লিখেন, ৪০ হাজার টাকার একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৩০ টাকায়। ওই চামড়ার সমপরিমান ওজনের গরুর গোবরের দাম ৩০০ টাকার উপরে।

তিনি আরো লিখেন, চামড়ার সঙ্গে এতিমখানা ও মাদরাসাগুলোর আর্থিক সামর্থের সম্পর্ক সর্বোচ্চ এক দশমাংশ কিংবা তার চেয়েও কম। সুতরাং চামড়ার কাঁচা বাজার নষ্ট করে তারা দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের ক্ষতিবৃদ্ধি ছাড়া আর কারো ক্ষতি করতে পারবে বলে মনে হয় না। গরিবের হতাশ চোখ তাদের কলিজার পানি শুকিয়ে ফেলবে ইনশাআল্লাহ।

 

চামড়া শিল্পের বেহাল অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে সারা দেশের আড়তগুলোতে। আড়ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়াশিল্পের এমন মন্দা তারা আগে দেখেননি। নাটোরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজারেও ফেরেনি প্রাণচাঞ্চল্য। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘২৫-৩০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করি। এ রকম অসুবিধা কখনোই দেখা দেয়নি যে চামড়া বিক্রি হয় না। চামড়াগুলো পড়ে আছে, দাম অর্ধেকে চলে আসছে।’

আড়তদাররা বলছেন, চামড়ার দাম কম হওয়ায় স্থানীয় মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন অনেকেই। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ না পেয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আড়তে চামড়া সংগ্রহের চাহিদা কমে যাওয়ায়ও চামড়ার বাজার পড়েছে বলে মনের করছেন অনেকে। চামড়া শিল্পের এমন পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দাকেই দায়ী করছেন ট্যানারি মালিকরা। তারা বলছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেই তারা চামড়া কিনছেন। সাভারের ট্যানারি শিল্পের ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে চালু রয়েছে ১৩০টি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এরই মধ্যে চামড়া আসতে শুরু করেছে এই নগরীতে। দুই-তিন দিনের মধ্যে ট্যানারির উৎপাদন পুরো দমে শুরু হবে বলে জানান ট্যানারি মালিকরা।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চামড়ার দাম কম : কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামে ধস নেমেছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে কেনাবেচা হচ্ছে পশুর চামড়া। এজন্য মৌসুমি ব্যবসায়ী বা ফড়িয়ারা ট্যানারি মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়লেও ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণেই কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে গেছে। এ ছাড়া হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের ‘অপ্রস্তুত’ চামড়া-শিল্পনগরীতে স্থানান্তরিত করার কারণেও দেশি-বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের দেশের চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রধান বাজার হলো চীন অথচ তিন মাস ধরে চীনে রফতানি হচ্ছে না। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন আমাদের চামড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আগের অর্ডার তো নিচ্ছেই না, নতুন কোনো অর্ডারও দিচ্ছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগের অর্ডার দেওয়া প্যাকিং করা প্রায় ১০০ কনটেইনার এখনো নিচ্ছে না চীন। চামড়ার দাম এত কম এর আগে কখনো হয়নি। বিগত তিন দশক পর এবার চামড়ার দাম সবচেয়ে কম।’

সেপ্টেম্বর থেকে চামড়া কিনবে ট্যানারি মালিকরা : এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আগামী সপ্তাহ অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ট্যানারির মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ শুরু করবেন। সরকার নির্ধারিত দামেই আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লবণযুক্ত চামড়া কেনা হবে। চামড়ার মান অনুযায়ী, দাম দেওয়া হবে। রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার আড়ত পোস্তাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার থেকে এ চামড়া সংগ্রহ করা হবে।’

প্রতি বছর কোরবানির ঈদের ১০-১৫ দিন পর কাঁচা লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এবার নির্বাচনী বছরের কারণে গতবারের তুলনায় ২০-৩০ লাখ পশু বেশি কোরবানি হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। তাই এক কোটির ওপরে চামড়া সংগ্রহ করার প্রস্তুতি রয়েছে।’

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত