মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ছিমছাম ও গোছানো দেশ মালয়েশিয়া



বিশেষ প্রতিবেদক::

এশিয়ার একটি ছিমছাম ও গোছানো দেশ মালয়েশিয়া। প্রতিবছর অসংখ্য ভ্রমণপিয়াসী মানুষ প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যমন্ডিত এ দেশে ঘুরতে যায়। যেকোনে পর্যটকের পছন্দের তালিকার প্রথম দিকেই থাকে মালয়েশিয়ার নাম থাকে। এটি মূলত একটি মুসলিম প্রধান দেশ। পুরো দেশ জুড়ে রয়েছে সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতি, পাহাড়ি রাস্তা আর বন-জঙ্গল। তেরটি রাজ্য এবং তিনটি ঐক্যবদ্ধ প্রদেশ নিয়ে গঠিত দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ মালয়েশিয়া। মোট আয়তন ৩,২৯,৮৪৫ বর্গকিমি। দেশটির রাজধানী শহর কুয়ালালামপুর, পুত্রজায়া হলো ফেডারেল সরকারের রাজধানী। দণি চীন সাগর দিয়ে দেশটি দু’ভাগে বিভক্ত পেনিনসুলার মালয়েশিয়া এবং পূর্ব মালয়েশিয়া। দেশটির স্থল সীমান্তে রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাই। সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সাথে। মোট জনসংখ্যা ২৮ মিলিয়নের বেশি।
দেশটির প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই চোখে পড়ে পাহাড়। তাই একে মেঘ ও পাহাড়ের দেশই বলা চলে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই মূলত বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সেখানে বেড়াতে যেতে আকৃষ্ট করে। দুই পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ, ছবিতে দেখা এমন দৃশ্যের মতোই মালয়েশিয়া। দেশটির সব আধুনিকায়নের বেশির ভাগই পাহাড় কেটে করা হয়েছে। বিশেষ করে সড়কপথ ও রেলপথ।
এখানে এক একটি এলাকার সাথে আরেকটি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভূ-তাত্ত্বিক মিল একবারেই কম। তাই কোন জায়গার চেয়ে কোনটা কম সুন্দর নয়। যে যার যার মতো ইউনিক! মালয়েশিয়ার সরকার তাই ট্যুরিসমকে সারাবিশ্বের ট্যুরিস্টদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিনিয়ত নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী হচ্ছে এই ট্যুরিসমের উপর নির্ভর করেই। আর তাই সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অন্যতম ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসাবে মালয়েশিয়ার গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে। মালয়েশিয়া শুধু দণি-পূর্ব এশিয়ার নয়, বরং এশিয়ার অন্যতম কসমোপলিটান দেশ। যেসব বৈশিষ্ট্যের জন্য একটি দেশকে কসমোপলিটান বলা যায়, তার সবকটিই এ দেশটিতে বিদ্যমান। একটি কসমোপলিটান দেশের মানুষ একটি একক কমিউনিটিতে বিশ্বাস করে এবং এ কমিউনিটি সাধারণত নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মূল্যবোধ, সুন্দর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আর শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। এই যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর মূল্যবোধের যে সম্পর্ক, সেটা যেমন এদেশের নাগরিকেরা মেনে চলে, ঠিক তেমনি এটা এখানে যারা বেড়াতে আসে তাদের আচার-আচরণেও ল্য করা যায়।

ডং মং টু কুয়ালামপুর : মালিন্দ্র এয়ারওয়েজ থাইল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করি মালেশিয়া। খেচর যাত্রায় গৌধূলী বেলায় কুয়ালালামপুর। পামগাছের সারি, রাস্তাঘাট, ইমারত সব সাজানো গোছানো, ছিমছাম। পড়ন্ত বেলায় মিঠে রোদে শহর যেনো দুপুরের ঝিলিক ছাড়াচ্ছিল। নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না মালয়েশিয়া কতোটা গোছানো আর সুন্দর একটা দেশ! সমুদ্রের তটরেখা বরাবর বন্দরের জেটিগুলোও সুবিন্যস্ত। বিমান যতই ধেয়ে মাটিকে ছুঁতে যাচ্ছিল, ততোই শহরটা দ্রুত ছড়াচ্ছিল। ব্যাংককের ডংমং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়া স্থানীয় সময় ১.২০টা দিকে কুয়ালালামপুর আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে অবতরণ করি। বিমান কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরের মাটি ছুঁতেই যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কারণ উর্ধ্বগগণে বিমান ওঠার পর মাটি স্পর্শ করা এক অনিশ্চিত বিষয়। কুয়ালালামপুর আন্তজার্তিক বিমানবন্দর কখওঅ-১ নামে পরিচিত। কখওঅ-২ নামে আলাদা একটি অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দর রয়েছে। বিমান থেকে নেমে চলন্ত সিঁড়ি ধরে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এলাম। বেশ লম্বা লাইন প্রতিটি কাউন্টারে। একসাথে অনেক গুলো ফ্লাইট নেমেছে। আমি প্রায় ১৫০জনের পেছনে ছিলাম। বাংলাদেশের অনেককেই দেখতে পেলাম তখন। কাউন্টারে দেখলাম বেশ জেরা করা হচ্ছে। যাদের কথায় কোন সন্দেহ প্রকাশ পাচ্ছে, তাদেরকে ভেতরে একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আস্তে আস্তে দীর্ঘলাইন হ্রস্ব হতে লাগলো। এক সময় ইমিগ্রেশন কাউন্টারের সামনে গেলাম। ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে কিছু সাধারণ প্রশ্ন করলেন। আমার হোটেল বুকিং, রির্টান টিকেট দেখানোর সাথে সাথে আমাকে পাস দেয়া হলো। বেল্টের সামনে ব্যাগেজের জন্য দাঁড়ালাম। সহসাই ব্যাগ চলে আসলো।
সেখান থেকে বের হয়ে প্রথমেই ডলার এক্সচেঞ্জ করলাম। এরপর ২৫ রিঙ্গিত দিয়ে একটি সিম কিনে নিলাম। এখন যাত্রা শুরু করতে হবে কুয়ালালামপুর মেইন শহরের দিকে। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটারের দূরত্ব। আমি ১০০ রিঙ্গিত দিয়ে একটি ট্যাক্সি ঠিক করি বুকিত বিনতাং পর্যন্ত। চাইলে এয়ারপোর্টের ভেতরেই এয়ারপোর্ট টু কুয়ালালামপুর সিটি বাসে অথবা ট্রেন করে যেতে পারতাম।
বেশির ভাগ মানুষ হোটেল নেন বুকিত বিনতাং, মাসজিদ জামেক, চায়না টাউন এলাকায়। তবে যে কোন জায়গাতেই হোটেল নিতে পারেন। আমি বুকিতক বিনতাং-এ হোটেল নিয়েছিলাম। কারণ এখান থেকে যে কোন জায়গায় যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। ট্যাক্সিতে রওয়ানা হলাম কুয়ালামপুর শহরের দিকে। এখানকার হাইওয়েগুলো প্রশস্ত। গাড়ি চলার পথে ট্যাফিক জ্যাম আছে, তবে তা একদম হিমবাহের মতো স্থির না। রয়েছে অসংখ্য দুই ও তিন স্তরবিশিষ্ট ফাইওভার। এদেশে রাস্তা তৈরির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বড় বড় কার্বনেটের পাহাড় কেটে একেকটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ধারণ ক্ষমতা থেকে মাত্র ৩০% ব্যবহৃত হচ্ছে। আর তাই আগামী ৫০ বছরেও এখানে রাস্তা প্রশস্ত না করলেও চলবে।
এসব দেখতে দেখতে সামনে গাড়ি চলছে। তখন স্থানীয় সময় ৪টা। যাবার সময় বসতবাড়ি, মার্কেট কম চোখে পড়েছে। তবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোটাই বলবৎ। শহরের ভেতর অনেক গাছপালা। যতোটুকু বসতবাড়ি দেখলাম, তার বেশিরভাগই একই ধাঁচে তৈরি। মালয়েশিয়ান বিত্তবানরা বিশাল বিশাল বহুতল ভবনে বাস করে।
বিকেল ৫টা নাগাদ বুকিত বিনতাং-এ পৌঁছালাম। হোটেল আগে থেকেই বুকিং দেয়া ছিল, তাই রিসিপশনে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে রুমে এলাম। বেশ ভাল লাগছিল। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি পেয়ে বসছিল। দ্রুত গোসল সেরে বের হই খাদ্যান্বেষণে। বাংলাদেশি খাবার খুঁজে না পেয়ে ম্যাকডোনাল্ডে যেতে হয়। পরে চিন্তা করলাম রাতে বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করতে হবে। এরপর বুকিত বিনতাং-এর চারপাশটা একটু হেঁটে ঘুরে চলে আসি হোটেলে। বিছানায় গা লাগাতেই তলিয়ে গেলাম ঘুমের দেশে!
রাতে উঠে খাবারের জন্য আবার বের হই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টের সন্ধান মেলে। বেশ মনোলোভা খাবার। আমাদের দেশের অনেকেই সেখানে কাজ করে। রাতের পেটপূজা সেরে ফিরে আসি হোটেলে। হোটেল এসে ঘুম হবে না জানি, কারণ সন্ধ্যার দিকে বেশ ভালোই ঘুম হয়েছে। তাই ইন্টারনেটে খুঁজতে বসি মালয়েশিয়ার দর্শনীয় স্থানসমূহ। হোটেলে এসেই কুয়ালালামপুর সিটির একটা ম্যাপ চেয়ে নিয়েছিলাম, তা রাতে ভালো করে দেখি। বাংলাদেশ থেকেই জেনে গিয়েছি সেখানে নাকি GRAB নামে একটি গাড়ির আ্যাপস সার্ভিস আছে। আমি মোবাইলে তা ইন্সট্রল করে নেই, যাতে সকালে উঠেই কাজে লাগে।

1টুইন টাওয়ার : পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বের হলাম টুইন টাওয়ার নামে খ্যাত প্যাট্রোনাস টাওয়ার দেখার জন্যে। হোটেলে বসেই GRAB আ্যাপসের মাধ্যমে গাড়ি বুকিং করি, ভাড়া ৫ রিঙ্গিত। অনেক পর্যটক দেখি সেখানে। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। হকারও আছে সেখানে। মোবাইলের লেন্স নিয়ে আসে বিক্রি করতে, যা মোবাইলে লাগিয়ে পুরো টুইন টাওয়ারের ছবি তোলা যায়। দাম মানভেদে ২০, ৩০ ও ৪৫ রিঙ্গিত। যার পছন্দ সে কিনে নিয়ে ছবি তুলছে। আমি প্রথমে একা একাই টুইন টাওয়ারের ছবি তোলি। অনেক বিদেশি পর্যটক ছবি তুলেছে। আমি তাদেরকে দিয়ে আমার ছবি ক্যামেরাবন্দি করি। তার মধ্যে বাংলাদেশের দু’জনের সাথে পরিচয়। তারা এখানে কাজ করে। বাড়ি কুমিল্লায়। আজ ছুটি থাকায় তারা ঘুরতে এসেছে প্যাট্রোনাস টাওয়ারে। তাদের একজন প্রায় ৫ বছর হয় মালয়েশিয়া এসেছে। কিন্তু প্রথমবারের মত এবারই সে প্যাট্রোনাস টাওয়ারে এসেছে। জানতে চাইলাম, কেন? উত্তরে বললো, কুয়ালালামপুরের বাইরে কাজ করি, তাই সময় হয় না আসার। আজ ছুটি থাকায় আসতে পারছি, আর তাও তার বন্ধুর জন্য। বন্ধু দেখবে বলে তাকে সাথে নিয়ে এসেছে। বন্ধু এসেছে ৬ মাস হয়। তাদেও কাছে জানতে চাইলাম মালয়েশিয়ায় কাজের সম্পর্কে। তাদের সুখদুঃখ অনেক কথা জানতে পারলাম। সবকিছুর পর তারা বলল, এখানে তারা ভালই আছে। তারা আমারও কিছু ছবি তুলে দিল। পরে আমাকে বলল রাতে আসতে, রাতে প্যাট্রোনাস টাওয়ার নাকি অন্যরূপ ধারণ করে। আমিও চিন্তা করালাম, রাতে আসব ফের। এই ফাঁকে কুয়ালামপুরের চারপাশটা বরং একটু ঘুরে দেখে নেই।
যাহোক টুইন টাওয়ার সম্পর্কে প্রথমেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নেয়া যাক। কুয়ালালামপুর শহরের মধ্যবর্তী স্থানে সবচেয়ে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত এ টাওয়ার। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান এটি। কৃত্রিম লেক, ফোয়ারা, গাছ-গাছালি মিলিয়ে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য সংবলিত বেড়ানোর জায়গাও বানানো হয়েছে, যা বিশ্ব পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার শহরের গুরুত্বপুর্ণ জালান আমপাং, পি পামলী, বিনজাই, কিয়া পেং এবং পিনাং-এর রাস্তাগুলো দ্বারা সংযুক্ত। সুরিয়া কেএলসিসি, এভিনিউ কে-সহ অসংখ্য বিখ্যাত শপিং কমপ্লেক্স রয়েছে এ টাওয়ারে। এর পাশেই রয়েছে জি টাওয়ার, মানদারিন ওরিয়েন্টাল, গ্রান্ড হাইট কুয়ালালামপুর এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কুয়ালালামপুর হোটেলের মতো বড় বড় আবাসিক হোটেল।
মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ দুটি ভবনকে একত্রে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যেও রয়েছে ৫টি হোটেল, শপিং সেন্টার, অফিস ইত্যাদি।
কেএলসিসির অফিসিয়াল নাম পেট্টোনাস টুইন টাওয়ার কেএলসিসি। এর সাথে রয়েছে বিশাল পাবলিক পার্ক ও মসজিদ, যা সবার জন্য উন্মুক্ত। ৮৮ তলা বিশিষ্ট ভবন দুটিকে সংযুক্ত করেছে একটি ব্রিজ। দুই টাওয়ারের মাঝের ব্রিজকে বলা হয় স্কাই ব্র্রিজ। ৬০ রিঙ্গিত দিয়ে যে কেউ উঠতে পারেন স্কাই ব্রিজে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকেট বিক্রি করা হয়, আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে। সেখানে উঠতে পারাটা জীবনের এক বিশাল অভিজ্ঞতা বলা যায়। আর তাই কেউই কুয়ালালামপুরে এসে স্কাই ব্রিজ না ঘুরে যান না। এই জায়গা থেকে পুরো শহরটাই দেখা যায়। সংযুক্ত পার্কটিও বিশাল। সামনে রয়েছে বিশাল কৃত্রিম লেক, নয়নাভিরাম ঝর্ণা, ঘোরাফেরার জন্যে সুন্দর লন, যেন শিল্পীর সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়! দিনের বেলায় এক দৃশ্য, রাতের দৃশ্য আবার ভিন্ন। কেএলসিসির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৯২ সালে, শেষ হয় ১৯৯৬ সালে। এতো বড় ও বিস্ময়কর একটি স্থাপনার নির্মাণ কাজ মাত্র ৫ বছরে শেষ করতে পারাটাও আরেক বিস্ময়! ১৯৯৯ সালে দেশটির মহান স্বাধীনতা দিবসে আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ড. মাহাথির মোহাম্মদ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কেএলসিসি বাইরের দিক থেকে দেখতে স্টিলের কাঠামোয় তৈরি দুটি খাড়া ভবন মনে হয়। রোদের ঝলক এসে তার বিচ্ছুরণ ঘটায় সবার চোখে।
রাস্তার পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে শহরটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুরু করি। প্রচন্ড রোদ, তাই সাথে এক বোতল পানি ও ওরেঞ্জ জুস রাখি তৃষ্ণা লাগলে যাতে খেতে পারি। সে সময় জাতীয় নির্বাচন ছিলো, তাই প্রতিটি রাস্তায় চোখে পড়ে নির্বাচনী প্রচারণার ফ্যাগ। কিন্তু তা এলোমেলোভাবে নয়, সুন্দর ও পরিপাটিভাবে নির্দিষ্ট স্থানে লাগানো। অনেকটা হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে এক সময় কান্ত হয়ে পড়ি। বিকেল হয়ে গেছে, তাই চিন্তা করলাম আজ আর নয়, ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাবো হোটেলে। ট্যাক্সি ডেকে বুকিত বিন্তাং যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করায় ড্রাইভার বলে একটু পায়ে হাঁটলেই চলে যেতে পারবেন সেখানে। আমাকে সে রাস্তাও দেখিয়ে দিলো। তার মানে আজ অনেকটা পথই হাঁটা হয়েছে! মোবাইলের গুগল ম্যাপ অন করে লোকেশনের মাধ্যমে চলে আসি হোটেলে।
খানিক বিশ্রাম নিয়ে রাতের আলোয় প্যাট্রোনাস টাওয়ার দেখার জন্য সন্ধ্যায় আবার বের হই। সাথে ছিলো আমাদের কুলাউড়ার ছেলে ইমরান। তাকে আগে থেকেই ফোন করে রেখেছিলাম, তাই সে দেখা করতে আসছিল আমার সাথে। হাতে সময় না থাকায় খুব বেশি সময় কাটানো হয়নি তার সাথে। সন্ধ্যা নামতেই এখানে আয়োজন করা হয় ওয়াটার শো। অনেকে একে ওয়াটার ড্যান্সিং শোও বলে থাকে। রঙবেরংয়ের আলোর ফোয়ারা যেনো সৌন্দর্য আরো সুন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। পানির কোমর দোলানো নাচ দেখতে তখন দর্শনার্থীরা ভীড় জমায় সেখানে। রাতের টুইন টাওয়ারের সৌন্দর্য যে দিনের টুইন টাওয়ারের চেয়ে পুরো ব্যতিক্রম- না এলে হয়তো কল্পনাই করতে পারতাম না! আনন্দের সাথে যোগ হয় আলোকসজ্জায় সজ্জিত কেএলসিসি এলাকা। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজার হাজার পর্যটকের ভীড় টুইন টাওয়ারের সামনে। ফোয়ারার পানির সাথে রং বেরঙের আলোর বিচ্ছুরণ সৌন্দর্য পিপাসুদের মন বেঁধে রাখতে সম হয়। দর্শকরা এই লেক বা ফোয়ারা অঞ্চলে এসে নানা এ্যাঙ্গেল থেকে টুইন টাওয়ারের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ছবি তোলেন। মালয়েশিয়ার এ বিশাল আইকনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে, একমাত্র বোকারা ছাড়া, কেউই মিস করে না। তাই আমিও মিস করিনি। সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রয়েছে ফ্রি বাস সার্ভিস। এ বাসে পুরো সিটি ঘুরে দেখতে কোনো টাকা লাগে না। তবে মনে রাখবেন কুয়ালালামপুর সিটিতে ট্রাফিক অনেক বেশি, তাই বিশেষ সময়গুলোতে অনেক বেশ জ্যাম থাকে, তবে আমাদেও দেশের মতো বিশৃংখল না। নিদিষ্ট নিয়ম মেনে গাড়ি চলে।
আরো খানিকটা সময় কাটিয়ে ফিরলাম হোটেল। ফিরে দেখি আমার হোটেলের সামনেই শো চলছে। বেশ কয়েকজন তরুণ তাদের সূরের মুর্চ্ছনায় মাতিয়ে রেখেছে সবাইকে। হঠাৎ গানের সুরের পরিবর্তন, মালয়েশিয়ান গান বাদ দিয়ে গাইছে বলিউেডর গান, একটু পর আবার বাংলা গান দু-তিন লাইন, আবার কখনো ইংলিশ! বুঝতে বাকি রইলো না এখানে মিশ্র সংগীত চলছে। রাতের খাবার খেলাম পাকিস্তানি সেই হোটেলে।
মালয়েশিয়ায় বেড়াতে এলে হাতে কমপক্ষে ৪-৫ দিন সময় নিয়ে আসতে হবে। না হলে গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর অনেক কিছুই দেখতে ব্যর্থ হবেন।

সেন্ট্রাল মার্কেট : হোটেল থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি নিলাম। সেদিন আর GRAB আ্যাপের সহযোগিতা নেইনি। ট্যাক্সি ভাড়া সম্পর্কে জানতে পারলাম। মিটারে চলে ট্যাক্সিগুলো। প্রথমে ৩ রিঙিত থেকে শুরু হয়। তারপর কিলোমিটার অনুসারে ভাড়া ওঠে। বুকিত বিন্তাং থেকে সেন্টাল মার্কেট পর্যন্ত ভাড়া ওঠে ৭ রিঙ্গিত। সেন্টাল মার্কেট শহরের কেন্দ্রস্থলে মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি, শিল্প ও নৈপুণ্যের কেন্দ্র এ মার্কেট। ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় মার্কেটটি ১৮৮৮ সালে তৈরি করা হয়। যা এখন পর্যটক, ক্রেতা এবং শিল্পপ্রেমীদের জন্য একটি সুদৃশ্য গন্তব্যস্থল। কেন্দ্রীয় মার্কেট কুয়ালালামপুরের একটি দর্শনীয় স্থানও। যেখানে তারা শুধু শপিং করার জন্য না। মালয়েশিয়ার ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যকে এক নজরে আত্মপ্রকাশ করে সবার কাছে। মার্কেটের আর্ট-ডেকো কাঠামোর আওতায় ৩০০ টির বেশি দোকান রয়েছে। সেখানে স্থানীয় হস্তশিল্প, বস্ত্র, স্মৃতিস্তম্ভ, সংগ্রহস্থল এবং রেস্টুরেন্ট রয়েছে। কেন্দ্রীয় মার্কেটে কুয়ালালামপুরের শিল্পের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এখানে শিল্প গ্যালারিকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেন্ট্রাল মার্কেটের মূল ভবনটির পিছনে সেন্ট্রাল মার্কেট অ্যানেক্সে একটি আর্ট মিউজিয়াম, আর্ট হাউস গ্যালারি এবং সেন্ট্রাল মার্কেট আর্ট লেন রয়েছে, যা ১০টি অনন্য স্টুডিওর অন্তর্ভূক্ত। স্থানীয় শিল্পীরা এখানে শিল্পকর্মেও কাজ করছেন। সমসায়িক শিল্প থেকে শুরু করে ব্যঙ্গচিত্র, স্থাপত্যশিল্প, দেশীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য সবই তাদের রং তুলিতে ফুটে উঠছে। শিল্পপ্রেমীরা সেখান থেকে অনেক আর্ট ক্রয় করছেন। মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মূল্যবোধের প্রতিফলন করার জন্য একটি চমৎকার স্থান। স্থানীয় এবং বিদেশি পর্যটক উভয়কেই আকর্ষণ করে এ মার্কেট। সব কিছু ঘুরে দেখে নেয়ার পাশাপাশি কিছু কেনাকাটাও করলাম। সেখান থেকে চলে আসি কোতারায়ায়, যেখানে বাংলাদেশীদের মিলনমেলা দেখা যায়।

কোতারায়া/চায়না টাউন : কোতারায়ায় রয়েছে প্রচুর বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ও বাংলাদেশি পণ্যের দোকান-পাট। সহজেই পাওয়া যায় দেশিয় সব পণ্য। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দূর-দূরান্ত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখানে এসে মিলিত হন। ছুটির দিন এলেই যেন বেশি ব্যস্ত হয়ে ওঠে এ এলাকাটি। সকাল থেকেই কোতারায়ার আশপাশের এলাকায় ভীড় বাড়তে থাকে।
কোতারায়ায় রয়েছে মালয়েশিয়ার কেনাকাটার বিখ্যাত মার্কেট চায়না টাউন। এখানে বেশিরভাগ কাজ করেন বাংলাদেশি শ্রমিক। অনেকে সেলসম্যানে চাকরি করেন। আবার অনেক বাংলাদেশি ব্যবসাও করেন চায়না টাউনে। একজন পর্যটক যে কোনো মূল্যে এখান থেকে স্বচ্ছন্দে বাজার করতে পারেন। মোটামুটি সস্তা বাজারের মধ্যে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ চায়না টাউন। কুয়ালালামপুরের কেন্দ্রস্থলে এ মার্কেটে বাস বা ট্রেনে সহজেই যাওয়া যায়। চীনারাই এ মার্কেটের প্রধান হলেও এখন ভারতীয় ও বাংলাদেশিরাও জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে রয়েছে আরো একটি মার্কেট কোতারায়া সেন্টাল মার্কেট। এ মার্কেটেও বেশিরভাগ কর্মজীবী বাংলাদেশি শ্রমিক। মার্কেটে রয়েছে একটি কালচারার ড্যান্স গ্রাউন্ড। ছুটির দিনে এখানে মালয়েশিয়া, বাংলাদেশি, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুরি ক্যালচারার ড্যান্স পারফরমেন্স করা হয়। যা স্থানীয় ও বিদেশিরা উপভোগ করে থাকেন।
কোতারায়ায় রয়েছে রেস্টুরেন্ট, বাস স্টপেজ, ফুটপাত, মিনিমার্ট বা স্টেশনারি দোকান, সবখানেই খেটে খাওয়া মানুষের ভীড়। তবে এদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাই বেশি চোখে পড়ে। আর এ কারণেই কোতারায়া এখানকার বাঙালিদের কাছে ‘বাংলা মার্কেট’ নামেই বেশি পরিচিত। কোতারায়ার রাস্তাগুলোতে ঘুরলে জোর শব্দে শোনা যাবে বাংলাদেশি গান। এখানকার খাবারের দোকানগুলোতেও শোনা যাবে বাংলাদেশিদের হাঁকডাক! ‘বাংলা খাবার’ ডাক দিয়ে ক্রেতাদের আকর্ষণ করে তারা। এখানকার মোবাইল কোম্পানিগুলো শনি ও রোববার এই বিশেষ দু’টি দিনের জন্য আলাদা প্রচারণায় নামে বাংলাদেশি গ্রাহকদের টার্গেট করে। আর এজন্য সেলস ক্যাম্পেইনার হিসেবেও থাকে বাংলাদেশি ছেলেরা। মেদান পাসারের খোলা চত্বরে কয়েকশ মানুষের ভীড়। এখানে রয়েছে রেমিটেন্স হাউজ। মাসের প্রথম দিকে বাড়িতে টাকা পাঠাতে সেগুলোতে রয়েছে শ্রমিকদের ভীড়। অনেকেই এসেছেন কুয়ালালামপুরের বাইরে থেকে শুধুমাত্র টাকা পাঠাতে অথবা পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করতে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভীড় হয় এখানে। অপরিচিত হলেও ‘দেশি ভাই’ সম্বোধনে সবাইকে কাছে টেনে নেয়। মালয়েশিয়ায় অন্যান্য জায়গার তুলনায় কোতারায়া কিছুটা অপরিষ্কার। আমি একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবারের জন্য ঢুকলাম, কিন্তু ভীড়ে টেবিল পাওয়া দুষ্কর। তাই সবার সাথে একটি টেবিল শেয়ার করে নিলাম। তাদের সাথে আড্ডায় সময়ও বেশ কেটে গেলো। বেশ কদিন পর দেশিয় খাবারের কিছুটা স্বাদ নিলাম সেখানে। দেখলাম কুয়ালালামপুরের বাইরে থেকে আসা প্রবাসীরা দেশি স্বাদের খাবার খেতে কোতারায়ার রেস্টুরেন্টগুলোতে হুমড়ি খাচ্ছে। বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে দেশিদের ভীড় আর আড্ডায় সরগরম। ব্যস্ত দোকানিদের সঙ্গে কথা বলা দুষ্কর। বাংলাদেশি পর্যটকরাও অনেকে ভীড় দেখতে আসেন এখানে। স্থানীয় মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলা দেখতে হলে কোতারায়াতে আসতেই হবে সবাইকে। গত কয়েকদিন ধরেই অনেক হাঁটা হচ্ছে, তাই পায়ে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। খানিকক্ষণ বসে বিশ্রাম নিয়ে রওয়ানা হলাম সিটি গ্যালারির উদ্দেশ্যে। সেখানে শুধু সিটি গ্যারালি না, রয়েছে সুলতান আব্দুল সামাদ জামে মসজিদ, মারদেকা স্কয়ার, ন্যাশনাল টেক্সটাইল মিউজিয়াম, সুলতান আব্দুল সামাদ বিল্ডিং, টাইম স্কয়ার। এদের পাশেই রয়েছে দুটি নদী কাং আর গাম্বাক। দেখার মতো বেশ আকর্ষণীয় স্থান, তাই চিন্তা একসাথে সব দেখে হোটেলে ফিরবো।

Merdeka_Square_Kuala_Lumpur_panorama
সিটি গ্যালারি : মার্দেকা স্কয়ারের রাস্তা ধরে কিছু দূর সামনে এগুলেই এ গ্যালারি। অনেক বিদেশি পর্যটকের ভীড় সেখানে। গ্যালারিতে ঢোকার জন্য সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে মালয়েশিয়ান ১০ রিঙ্গিত দিয়ে টিকিট কাটলাম। এক রিঙ্গিত মানে বাংলাদেশি টাকায় বিশ টাকা। গ্যালারিতে মনোমুগ্ধকর লেজার শোয়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস, বিখ্যাত মানুষদের অবদান, বিখ্যাত স্থাপনা, ট্যুরিস্ট স্পট এসবের ব্যাপারে টুরিস্টদের আইডিয়া দেয়া হয়। এই লেজার শোয়ের দিকে মুগ্ধনয়ণে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে, টেরই পাইনি। লেজার শো দেখে গ্যালারির ভেতরের দোকান থেকে কিছু স্যুভিনিয়র কিনলাম। দোকানের সব প্রোডাক্টই একবারে জেনুইন এবং ফিক্সড প্রাইস, তাই দরদাম করার কোন সুযোগই নেই। সিটি গ্যালারির সামনের রাস্তায় ‘আই লাভ কেএল’ লেখা একটা স্থাপনার সামনে ছবি তোলার জন্য মানুষের ভীড় লেগেই ছিলো, যা গ্যালারিতে ঢোকার সময়ই লক্ষ্য করেছিলাম। তাই গ্যালারি থেকে বের হয়ে আমিও ছবি তোলার জন্য দৌঁড় দিলাম, যদিও ছবি তোলার সুযোগের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে বেশ অনেকটা সময় চলে গেল। কিন্তু ছবি কে তুলে দেবে, তাই অনেক সময় দাঁড়াতে হলো।

মার্দেকা স্কয়ার : হাজারো পর্যটকের ভীড় সেখানে। মালেয়েশিয়া ভ্রমণে এসেছেন আর এ জায়গা দেখে যাওয়া হবে না, তা হতেই পারে না! তাই সবসময়ই এলাকাটি পর্যটক-মুখর থাকে। কুয়ালালামপুরের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ দর্শনের ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রাধাণ্য পায় এই মার্দেকা স্কয়ার। যা দেখে অভিভূত হন দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। মার্দেকা অর্থ স্বাধীনতা। তৎকালীন দ্য ইউনিয়ন জ্যাক সর্বপ্রথম এখানে শিথিল করা হয় ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্টে। ১০০ মিটার উঁচু পতাকা উত্তোলনের স্তম্ভ পৃথিবীর বৃহত্তম বলে স্বীকৃত। এটিকে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও ধরা হয়। এটি পুলিশের প্যারেড এবং ক্রিকেট ম্যাচের জন্যও ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এটি একটি দর্শণীয় ল্যান্ডস্কেপ এরিয়া যা বাগান, ঝর্না ইত্যাদিতে সজ্জিত করা হয়েছে। স্থানটি আজও যে কোন জাতীয় উৎসব, যেমন জাতীয় দিবস বা শোভা যাত্রা শুরু করার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি জালান রাকায় অবস্থিত। অনেক পর্যটকের ভীড়। একটির পর একটি বাস পর্যটক নিয়ে আসছে। মার্দেকা স্কয়ারের সামনের খালি মাঠে নেমে সবাই ছবি তুলছে। কেউবা আসছে ফটোশুট করতে। বিকেল বেলার অনেক সুন্দর দৃশ্য এ জায়গায়। দেখতে খুবই ভালো লাগছিলো।

20180508_184355
সুলতান আব্দুল সামাদ বিল্ডিং : ব্রিটিশ শাসনামলে এ বিল্ডিংটি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হতো। ১৮৯৭ সালে এ ভবনটি নির্মাণ করা হয়। নিও-সারাসেনিক ধরণের এ স্থাপত্যটি সম্পূর্ণ ইটের তৈরি। সমসাময়িক স্থাপত্যের মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং পুরো মালয় অঞ্চলে সবচেয়ে নিখূঁত স্থাপত্য হিসেবে স্বীকৃত। অশ্বক্ষুরাকৃতির নকশা, তামার তৈরি গম্বুজসহ ৪১ দশমিক ২০ মিটার উচ্চতার ঘড়ির টাওয়ারটি সবাইকে মুগ্ধ করে। বিশেষ করে রাতের বেলায় আলোকসজ্জিত অবস্থায় এটি অপরূপ হয়ে সবার চোখে ধরা দেয়।

ন্যাশনাল মনুমেন্ট : অনেক সুন্দর গোছালো এ জায়গটি। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্য হলো এই ন্যাশনাল মনুমেন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ বীরদের স্মরণে ১৫ মিটারের এ ভাস্কর্যটি উন্মুক্ত করা হয় ১৯৬৩ সালে। প্রতীকীভাবে সাতজন বীরের

 

প্রতিমূর্তির মাধ্যমে বিশ্বস্ততা, আত্মত্যাগ আর বন্ধুত্বের বিষয়টি এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার ভাস্কর্য শিল্প সনাতন ও আধুনিক ধারার এক স্বতন্ত্র মেলবন্ধন। জাতীয় মনুমেন্টের কাছাকাছি রয়েছে সিনোটাফ। জাতীয় স্মৃতিসৌধের পূর্বসূরি একটি অন্তর্বর্তী, এটি মূলত উপনিবেশিক ১০ মিটার সমতল ঘাসের আচ্ছাদিত মাটিতে একটি বৃত্তাকার চৌম্বক অংশ। যারা যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন তাদের সম্মানে, সিনাট্যাফের শিলালিপিতে উৎসর্গীকৃত অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে সেনোটাফের প্লেটগুলিতে খোদাই করে লেখা রয়েছে। মনুমেন্টের বাইরে রয়েছে বিশাল খোলা জায়গা। বসে সময় কাটানোর জন্য রয়েছে পার্কের মত জায়গা। সব মিলে এটি পর্যটকের জন্য বিশেষ এক আর্কষণীয় স্থান।
সেখান থেকে বের হয়ে দেখি কোথায় ট্যাক্সি নেই! কি আর করা, মেইন রোডে আসার পরও দাঁড়িয়ে আছি ট্যাক্সি নাই। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তাই চিন্তা করলাম হেঁটেই চলে যাবো। হেঁটে আসার পথে মালয়েশিয়া ন্যাশনাল প্রেসক্লাবও দেখে নেয়া হলো। সাইনবোর্ডে লেখা না দেখলে বুঝতে পারতাম না যে এটি জাতীয় প্রেসকাব। অনেক পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি সেন্ট্রাল মার্কেটের সামনে। হাতে ছিলো মোবাইল আর তার সহযোগী গুগল ম্যাপ। তাই কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি। রাত তখন সাড়ে ৮টা, সেন্ট্রাল মার্কেটের সামনে থেকে হোটেলে ফেরার জন্য ট্যাক্সি ভাড়া করি, ভাড়া তখন ২০ রিঙ্গিত। এর কমে কেউ যেতে রাজি নয়, কারণ সবারই এক কথা এখন প্রচন্ড জ্যাম হবে, তাই ভাড়াও একটু বেশি। কি আর করা! আসতেই হলো সেই ভাড়ায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিলো একজন মহিলা, এটা দেখে খুবই ভালো লাগলো। বুকিত বিন্তাংয়ে আসতে রাত পৌণে ১০টা হয়ে গেছে, তাই খাবার খেয়ে সোজ হোটেলে গিয়ে বিছানা ঝাঁপ! কারণ সেদিন এতো বেশি হাঁটতে হয়েছে যে, পা ফুলে গিয়েছিল। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে আবার বের হতে হবে। ঘুমাবার আগেই পরদিন কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবো, তা ঠিক করে রাখি।

কেএল টাওয়ার : সেদিন ছিলো মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচন। তাই সরকারি সবকিছু বন্ধ ছিলো। প্রথমে শুরু করি কেএল টাওয়ার দিয়ে সেদিনের ঘোরঘুরি। কুয়ালালামপুরের একটি অন্যতম আকর্ষণ কেএল টাওয়ার। যার পুরো নাম মিনারা কুয়ালামপুর।
কুয়ালালামপুরের অরণ্য সংরণ জুড়ে চমৎকারভাবে উদীয়মান কেএল টাওয়ার বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু টেলিকম টাওয়ারের মধ্যে অন্যতম বলে মর্যাদা লাভ করেছে। কেএল টাওয়ারকে মালয়েশিয়ার টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও বলা হয়। এটিকে মালেশিয়ার জাতীয় প্রতীকও ধরা হয়। আসলে এটি একটি কমিউনিকেশন টাওয়ার। কুয়ালালামপুরের দুটি দর্শনীয় আকাশচুম্বী স্থাপনার মধ্যে এটি একটি। এর মেইন লবি কাঁচের কারুকার্যখচিত গম্বুজের মতো, যার নকশা ইরানের ইস্পাহানের কারিগরের হাতে বানানো। ১৯৯১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৯৫ সালে টাওয়ারটি সবার জন্য উন্মুক্ত কওে দেয়া হয়। টাওয়ারটি নির্মিত হয়েছে মালয়েশিয়া সরকারের অর্থায়নে। টাওয়ারের ছাদে একটি এন্টেনা আছে, যার উচ্চতা ৪২১ মিটার এবং ছাদ পর্যন্ত উচ্চতা ৩৩৫ মিটার। কেএল টাওয়ারের চূঁড়ায় আছে খাবার হোটেল ও একটি পর্যবেক্ষণ ডেক। হোটেলের যেকোনো আসনে বসেই দেখতে পাওয়া যায় পুরো কুয়ালালামপুর শহর। হোটেলগুলো ঘূর্ণায়মান। শুধু তাই নয়, বিয়ের অনুষ্ঠানও হয় নিয়মিত। উচ্চতার দিক থেকে কেএল টাওয়ার প্রায় পেট্রোনাস টাওয়ারের কাছাকাছি। বিশ্বে কেএল টাওয়ারের অবস্থান ছয় নম্বরে। টাওয়ারের চূঁড়ায় উঠতে হয় লিফটে করে। এ জন্যে গুণতে হয় ৮০ রিঙ্গিত (কম্বো প্যাকেজ নিয়েছিলাম স্ক্যাই ডেক)। সাধারণ টিকেটও রয়েছে, সেজন্য অবশ্য খরচ পড়তে বেশ একটু বেশিই, প্রাপ্তবয়স্ক ৩৩ রিঙ্গিত ও শিশু ২৩ রিঙ্গিত (জনপ্রতি)। সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকে। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অসংখ্য পর্যটক প্রতিদিন কেএল টাওয়ার দেখতে আসে।
নিচ থেকে মাথা উঁচু করে কেএল টাওয়ারের চূঁড়ায় তাকালে মনে হয় এতো উপরে গেলে ভয় লাগবে, কিন্তু না চূঁড়ায় ওঠার পর বুঝতে পারি কেএল টাওয়ার কেনো সবার এতো প্রিয়!

maxresdefault (1)
জাতীয় মসজিদ : মসজিদের ভেতর ঢুকতেই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো! এতো সুন্দর মসজিদ! শুধু সুন্দর বললেই হবে না, এর অপূর্ব সুন্দর কারুকাজ যেনো মুগ্ধতায় ভরে তুলবে যে কারো মন। কুয়ালালামপুর জাতীয় মসজিদ মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। যুক্তরাজ্যের স্থপতি হাওয়ার্ড অ্যাশলে এবং মালয়েশিয়ান হিশাম আল বাকরি ও বাহারুদ্দিন কাশিমের নকশায় মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৫ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। মসজিদের মূল কে প্রবেশ পথের সামনে মালয়, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় রচিত পুস্তক রাখা আছে তাকে। ইংরেজিতে লেখা ধর্মীয় বাণী সম্বলিত বিভিন্ন লিফলেটও রাখা আছে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য। ১৯৮৭ সালে ব্যাপক সংস্কার হয় মসজিদটির। গম্বুজের পিঙ্ক কালার পাল্টে হয় সবুজ নীল। এখন এটা কুয়ালালামপুরের গর্ব।
১৩ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এ মসজিদ কমপ্লেক্সে একসঙ্গে ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মূল প্রার্থণা ঘরের ছাদটিকে দেখে মনে হয় যেনো মেলে থাকা এক অতিকায় ছাতা। সেই ছাদ থেকে ঝুলে থাকা ঝাড় বাতির বর্ণিল আলোর প্রতিফলন পড়ে মেঝের গালিচায়। চারপাশের দেওয়ালগুলো কার্যত কাঁচের। মূল প্রার্থণা ঘরকে ঘিরে থাকা বারান্দাগুলোতেও নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদ ঘিরে থাকা উন্মুক্ত চত্বরে নানা আয়তনের পানির ফোয়ারা। নয়নাভিরাম বাগানও আছে মসজিদ কমপ্লেক্সে। মসজিদের গম্বুজে তারার নকশা কাটা। নামাজ ঘরের উপরে গম্বুজ। মূল প্রার্থণা গৃহের পূর্ব দিকের বারান্দায় ফোয়ারার কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা মিনারটির উচ্চতা ৭৩ মিটার। মাথায় গোটানো ছাতার শেপ। মসজিদের অবস্থান কুয়ালালামপুর রেল স্টেশনের কাছেই। স্টেশন থেকে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড পথও আছে মসজিদে যাওয়ার। আধুনিক মসৃণ নগরে এক টুকরো ইতিহাস।
এ মসজিদের সীমানা ঘেঁষেই ইসলামিক আর্ট মিউজিয়াম ও ইসলামিক আর্ট সেন্টার। ন্যাশনাল প্লানেটোরিয়াম আর পার্কের অবস্থানও মসজিদের খুব কাছেই। এখানে এলে ঢুঁ মেরে আসা যায় বার্ড পার্ক আর পুলিশ মিউজিয়াম থেকেও। কিন্তু আমার হাতে সময় কম, তাই আমি ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও সেখানে যেতে পারিনি। সবাই এই মসজিদ পরিদর্শন করতে পারেন। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা, বিকাল ৩টা থেকে ৪টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত মসজিদটি উন্মুক্ত রাখা হয়। শুক্রবার জুম্মার দিনে কেবল বিকাল ৩টা থেকে ৪টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত মসজিদ পরিদর্শন করা যায়।
এরপর দেখতে যাই মালয়েশিয়ার জাতীয় জাদুঘর। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন থাকায় সেদিন তা বন্ধ ছিলো, তাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। বাইরে থেকে দেখেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয়েছে! মালয়েশিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ব্রিটিশ শাসকদের ছবি ও বিবরণ, পুরনো আসবাবপত্র ইত্যাদি দেখা হলো না। এই জাদুঘরে প্রবেশ করলে মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের পাশাপাশি মালয় জাতিয় নৃতাত্বিক পরিচিতি ও উন্নয়নের পথ পরিক্রমণের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যেতো। যা হোক, আবার কখনো সুযোগ হলে আসা হবে এ জায়গায় এই বলে নিজেকে সান্তনা দিয়ে এ স্থান ত্যাগ করি।
কি করবো, হাতেও আছে বেশ খানিকটা সময়, তাই চিন্তা করালাম, অনেকের কাছে বাতু ক্যাভস সম্পর্কে জেনেছি, দেখি আসি বাতু ক্যাভস। GRAB আ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ভাড়া করে চলে যাই বাতু ক্যাভসে। একটা কথা বলে রাখি, মালয়েশিয়ায় আপনার ভ্রমণসঙ্গী করে নিতে পারেন GRAB আ্যাপকে, কারণ এটি যে কোন সময় গাড়ি পেতে আপনাকে সহযোগিতা করবে। চাইলে যে কেউ ট্রেনেও বাতু ক্যাভস যেতে পারেন। অত্যাধুনিক ট্রেন সার্ভিস রয়েছে সেখানে। পাসার সেনি থেকে ট্রেনে উঠতে হবে এবং নামতে হয় বাতু কেভস স্টেশন। এ লাইনে এটাই শেষ স্টেশন। স্টেশন থেকে বের হলেই বাতু কেভস।

 

সূত্র: এনা।

 

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত