বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

আইন পেশায় আসতে চান



আইন পেশায় যারা আসতে চান এবং যাদের স্বপ্ন এই পেশাকে ঘিরে, তাদের সবার আগে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ, এই পেশা অন্য সেবামূলক পেশাগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন। আইন পেশার শুরুটা একটু চ্যালেঞ্জের, একটু দুর্গম। তাই শুরু থেকে কঠিন পরিশ্রম ও একাগ্রতা নিয়ে কাজ করার প্রস্তুতি নিতে হবে। তা ছাড়া এখানে আসার আগে আপনাকে ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন’ কথাটির মর্মবাণীও মাথায় রাখতে হবে। রাজ্যের ধৈর্য নিয়ে বিচারপ্রার্থীদের সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনার মানসিকতা রাখতে হবে। এ পেশার শুরু করুন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সঙ্গে কাজ দিয়ে। প্রথমে আয়-রোজগারের দিকে না তাকিয়ে কাজের প্রতি মনোযোগী হোন। একাডেমিক রেজাল্ট এখানে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, একাডেমিক ফলের চেয়ে এ পেশায় পেশাজীবনের মেধা, পরিশ্রম ও ধৈর্যই আপনাকে এনে দেবে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। এই পেশার সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করেই এগিয়ে যেতে হবে আগামীর সাফল্য পেতে।

চলুন, বিস্তারিত জানা যাক-

শুরুর কথা

অন্যান্য পেশার মতো আইন পেশায় আসতেও আপনাকে একটা দেয়াল টপকে আসতে হবে। চলুন সেই দেয়াল টপকানোটা দেখি- আইনজীবী হতে হলে আপনাকে আইনের ওপর স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর বার কাউন্সিল থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হতে হলে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত নিম্ন আদালতে কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বার কাউন্সিলের পরীক্ষার দেয়াল টপকাতে হবে। আর বিচারক হতে হলে জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের সহকারী জজ নিয়োগের পরীক্ষায় বসতে হবে। তবে এখন সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেও আপনার আইনজীবী হিসেবে সনদ থাকতে হবে। বিচারক আর আইনজীবী হিসেবে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে নেওয়া যায় বিচারপতি হওয়ার সুযোগ।

জুনিয়রশিপ

আইন বিভাগে স্নাতক পাস করে ক্যারিয়ারের শুরুতে তরুণ আইনজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে জুনিয়রশিপ। এ ক্ষেত্রে অনুগত জুনিয়র-সিনিয়রের সঠিক দিকনির্দেশনায় অনুশীলন বা পথচলা শুরু করলে খুঁটিনাটি বিষয়ে সহজেই অবগত হতে পারেন, যা আইন পেশায় সফলতা পেতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া এ পেশায় সফলতা পেতে একজন জুনিয়রের আচার-আচরণসহ কী কী বিষয়ে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। সেসবও ধরিয়ে দেন সিনিয়ররা। প্রচুর পরিশ্রমের পাশাপাশি আপনি শেখার আগ্রহ ধরে রাখতে পারলে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই অনুশীলন পর্ব শেষ করে কাজে নেমে পড়তে পারেন। তখন অভিজ্ঞতাটা আপনাকে বড় ধরনের সাপোর্ট দিয়ে যাবে।

কাজের ক্ষেত্র

একজন আইনজীবী আইন পেশার পাশাপাশি যে কোনো কোম্পানির লিগ্যাল অ্যাডভাইজার, যে কোনো ব্যাংকের নিজস্ব আইনজীবী অথবা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার আইন উপদেষ্টা হিসেবে চাকরি করতে পারেন। আইন কমিশনেও চাকরির সুযোগ আছে। এখানে আয় ও সম্মান উভয়টি ভালো মানের। বর্তমানে ব্যাংক-বীমা ছাড়াও বিভিন্ন মার্কেট, বিউটি পার্লারসহ ছোট-বড় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে লিগ্যাল অ্যাডভাইজার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এতে একজন আইনজীবীর কাজের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে। তা ছাড়া মানবাধিকারকর্মী হিসেবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থায় কাজের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত বিচারক ও আইনজীবী হিসেবে কাজেরও সুযোগ আছে। বিস্তর জায়গা আছে আইন সাংবাদিকতায়ও। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম আদালত প্রতিবেদক হিসেবে আইনজীবীদের নিয়োগ দেয়। তা ছাড়া আইন একটি মুক্ত পেশা। এখানে রাজ্যের স্বাধীনতা। নিজের পছন্দ অনুযায়ী ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করা যায়। তবে এ পেশায় সামাজিক দায়বদ্ধতা অন্যান্য পেশার চেয়ে অনেক বেশি। একজন আইনজীবীকে বার কাউন্সিল থেকে প্রণীত আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। তা না হলে তার বার কাউন্সিল সনদ বাতিল হয়ে যেতে পারে!

আয়-রোজগার

আইন পেশাটা পুরোই আপনার কাজের ওপর নির্ভর করবে। কাজ বলতে মেধা এবং অভিজ্ঞতা। আপনি এখানে যতই মাথা খাটাতে পারবেন, ততই ভালো একটা অ্যামাউন্ট পকেটে পুরতে পারবেন। তা ছাড়া জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা সহকারী জজ পদে নিয়োগ পেলে সর্বোচ্চ সম্মান, রাজ্যের সুবিধাসহ ভালো অঙ্কের বেতন তো আছেই। তবে আইনজীবী হলে আয়-রোজগারের বিষয়টি অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ ও মামলার ধরনের ওপর নির্ভর করে। হাইকোর্ট অথবা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মাসিক আয় মামলার ধরন অনুযায়ী ৬০ হাজার থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। আইন পেশায় সদ্য যোগদানকারীরা ভালো টাকা আয় করতে পারেন মাথা খাটিয়ে। একজন নতুন আইনজীবী সাধারণত ৩০-৩৫ হাজার টাকার ওপর আয় করতে পারেন অনায়াসে।

মানুষের পাশে

বাংলাদেশে যতগুলো আত্মনির্ভরকেন্দ্রিক পেশার দেখা মেলে, তার মধ্যে আইন পেশাই সর্বজন পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশা। এ পেশায় এসে আপনি যেমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন, তেমনি সমাজে সবার কাছে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন। তা ছাড়া সম্মান এবং সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য বর্তমান সময়ে আইন পেশার প্রতি সবার আগ্রহ আরও বেড়েই চলছে। এই পেশার সুযোগ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাত্রা ও সম্ভাবনা যোগ করছে। প্রাচীন আমল থেকেই আইনজীবীদের দেখা হয় মর্যাদার চোখে। একসময় এ পেশায় ছেলেরা এলেও সেই দেয়াল আরও আগেই ভেঙে গেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেয়েরা এখন বেশ ভালোভাবেই নিচ্ছেন এ পেশা। আপনিও পারেন আইন পেশায় এসে সফল ক্যারিয়ার গড়তে। এর জন্য প্রস্তুতিটা শুরু করুন আজ থেকেই।

কেন বাছাই করবেন আইন পেশা?

বর্তমান বিশ্বে মানুষ পেশা নির্বাচনে আগের চেয়ে বহুগুণ আধুনিক মন-মানসিকতাসম্পন্ন হয়েছে। আমাদের দেশ বাংলাদেশও সেই ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের তরুণরা এখন পড়াশোনা শেষ করে নিজেকে নিয়োজিত করছেন নিজেদের পছন্দের বিভিন্ন পেশায়। গত কয়েক দশকে তরুণদের পছন্দের পেশার তালিকায় শীর্ষে ছিল আইন পেশা। নিজেদের যোগ্যতা, প্যাশন কিংবা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে অনেক তরুণই এখন যোগ দিচ্ছেন এই আইন পেশায়। চলুন জেনে নেওয়া যাক বর্তমান বিশ্বে আপনি কেন এ পেশায় নিয়োজিত হবেন কিংবা আপনার সন্তানকে কেন আইনপেশায় নিয়োজিত হতে পরামর্শ দেবেনঃ

  • স্বাধীনতাঃ আইন পেশা হচ্ছে একটি স্বাধীন পেশা। এজন্যে একে বলা হয় ‘আইন ব্যবসা’। এতে ৬ মাসের শিক্ষানবিশ সময় পার করার পর জেলা কোর্ট কিংবা হাইকোর্টে স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকে ।
  • আকাশছোঁয়া সম্ভাবনাঃ আইন পেশার ক্ষেত্রে একটি কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, এই পেশায় আকাশ হচ্ছে সীমানা। গতানুগতিক চাকুরীর চেয়ে এই পেশায় সাফল্যের সীমানা অনেক বেশি।
  • সামাজিক মর্যাদাঃ আইনজীবীরা হচ্ছেন সমাজের প্রথম সারির নাগরিক। সামাজিক যেকোন ক্ষেত্রে তাই এদেরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়। এছাড়া একজন আইনজীবী সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে সুন্দর আইনানুগ সমাধান দিতে পারেন বলে সমাজে এদের বিশেষ মূল্যায়ন রয়েছে।
  • অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাঃ আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পেতে কিছুটা বেশি সময় লাগলেও সময়ের সাথে সাথে অন্য পেশার চেয়ে এ পেশায় অধিক অর্থনৈতিক নিরপত্তা অর্জন করা যায়।
  • কাজের ক্ষেত্রঃ আইন পেশা অধিক জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে এর কাজের ক্ষেত্র। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে একজন ছাত্র উকিল হওয়া ছাড়াও নিম্ন ও উচ্চ আদালতের বিচারক, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, কর্পোরেট বিভিন্ন কোম্পানির আইন উপদেষ্টা কিংবা আইন কর্মকর্তা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিওতে কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে পারেন। এছাড়া এলএলবি একটি অনার্স ডিগ্রী হওয়ায় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের সু্যোগ তো থেকেই যায় ।
  • উচ্চতর গবেষণা ও ডিগ্রি অর্জনঃ এছাড়া আইন পেশায় দেশের প্রচলিত আইন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ ও গবেষণার প্রচুর সু্যোগ থাকায় এসব বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের বিশাল সুযোগ রয়েছে ।
  • কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজের সু্যোগঃ এছাড়া সরকারের বিভিন্ন কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিভিন্ন দেশের সাথে বিভিন্ন আইনানুগ বিষয়ে পরামর্শের জন্যে সরকার বিভিন্ন সময়ে আইন উপদেষ্টা নিয়োগ করে থাকেন। সেখানে খুব সহজেই সরকারের উপরের পর্যায়ে কাজের সু্যোগ থাকে।
  • দেশ ও দশের সেবার সু্যোগঃ এছাড়া আইনজীবীরা বর্তমানে স্ব-উদ্যোগে কিংবা সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত লিগ্যাল এইড অর্গানাইজেশনগুলোর মাধ্যমে গরীব কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষদের আইনগত সহায়তা প্রদান করে দেশের সেবায় নিজেদেরকে সরাসরি নিয়োজিত করার সু্যোগ পাচ্ছেন।

এসব দিক বিবেচনায় আইন পেশায় সুযোগ এবং সম্ভাবনা অন্য পেশার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় আমাদের দেশেও তরুণদের আগ্রহের তালিকার শীর্ষে রয়েছে এই আইন পেশা ।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত