বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

অপরূপ বৈচিত্র্যে এক খণ্ড স্বর্গ



প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মৌলভীবাজারজুড়ে রয়েছে নয়নাভিরাম চা বাগান, আঁকাবাঁকা পাহাড় টিলা, সবুজ বৃক্ষরাজি। রয়েছে সবুজ বনানী, বর্ণিল পাখ-পাখালি, পাহাড়ের চূড়া থেকে অঝোরে নিসৃত হওয়া জলপ্রপাত-ঝরনাধারা।

পর্যটন শিল্পের জন্য মনোমুগ্ধকর এই জনপদজুড়ে রয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল আর দিগন্ত বিস্তৃত হাইল হাওরের নীল জলরাশি। চা বাগান, লেক, পাহাড়, ঘন জঙ্গল, খনিজ গ্যাসকূপ, লেবু, আনারস, পান আর আগর বাগান দিয়ে সাজানো এখানকার প্রকৃতি। এ ছাড়া জেলার নয়টি উপজেলায়ই ছড়িয়ে রয়েছে ক্ষুুদ্র-নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, রয়েছে তাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর উৎসব। দেশের সবচেয়ে শীতপ্রধান অঞ্চল, আবার সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রধান অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত এ জেলা। গরমকালে বৃষ্টিতে ভিজতে বা কনকনে ঠাণ্ডা অনুভব করতে এখানে পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। জেলায় রয়েছে ৯২টি চা বাগান। দেশের সবচেয়ে বেশি চা বাগান এখানে থাকায় ‘চায়ের দেশ’ বলে এ জেলার পরিচিতিও রয়েছে। চা বাগানে নৈসর্গিক সৌন্দর্য, শ্রমিকদের পাতা তোলার কৌশল, কারখানায় চা উৎপাদন প্রক্রিয়া— এসবই পর্যটকদের মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়। চা বাগানে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন, শিল্পীর তুলি দিয়ে সবুজকে স্তরে স্তরে সাজানো। বাগানগুলোর বুক চিড়ে বয়েছে চোখ জুড়ানো লেক।

কানাডিয়ান ফ্রিল্যান্স লেখক এন্টনি ও ডেন্টাল এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মৌলভীবাজারকে ‘এক খণ্ড স্বর্গ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। উচ্চ ফলনশীল ও উন্নতমানের চায়ের ক্লোন উদ্ভাবনের জন্য এখানে রয়েছে চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই)। রয়েছে দেশের চা শিল্পের দেড়শ বছরের ইতিহাস নিয়ে স্থাপন করা চা-জাদুঘর। আর পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাতে জেলার প্রবেশ দ্বার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাওগাঁও এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে চা কন্যার ভাস্কর্য। শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে ডিনস্টর চা বাগানে রয়েছে ৪৬ জন ব্রিটিশ নাগরিকের সমাধিস্থল ‘ডিনস্টন সিমেস্ট্রি’।

এছাড়া কমলগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি টিলার বুক চিড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মাধরপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত। বড়লেখা উপজেলার সুজানগরে রয়েছে ছোট-বড় প্রায় তিন শতাধিক আতর কারখানা। রয়েছে ‘সাদা সোনা’ বলে খ্যাত রাবার বাগান। এ অঞ্চলের আদিবাসী খাসিয়াদের পান চাষ ও তাদের জীবনধারা পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। এ ছাড়া জেলার পাহাড়ি টিলায় টিলায় রয়েছে লেবু ও আনারস বাগান। শীতল পাটির জন্য বিখ্যাত রাজনগর ও বড়লেখা উপজেলা। রয়েছে হাকালুকি, কাউয়াদীঘি আর বাইক্কা বিল খ্যাত হাইল হাওর। বর্ষা এলে থৈথৈ জলে রুপালি টেউ, ছোট-বড় নৌকা আর জলের বুকে উকি দেওয়া হিজল-করছ বন নৈসর্গ সৃষ্টি করে। আর শীত এলে হাওরের বিলগুলোতে চলে রং বদলের খেলা। শোনা যায় অতিথি পাখির কিচির-মিচির ডাক।

উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে অসংখ্য পাহাড়, পর্বত ও অরণ্যরাজির নয়নাভিরাম দৃশ্য। আরও আছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড ও বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, রাজকান্দি, পাথাড়িয়া ও ভাটেরা হিল ফরেস্ট। এগুলোজুড়ে শুধু সবুজের সমারোহ।

জেলার সাতটি উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পুরকীর্তি ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। এরমধ্যে মৌলভীবাজার শহরের তিন মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে গয়ঘড় গ্রামে রয়েছে মধ্যযুগের ঐতিহাসিক নিদর্শন পাঠান পীর খাজা ওসমানের দীঘি, গড়, দুর্গ, ১৪৭৬ সালে নির্মিত উপমহাদেশের প্রচীনতম মসজিদগুলোর অন্যতম খোযাজ মসজিদ, শহরের দরগা মহল্লায় ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর মাজার। সদর উপজেলার জগিস গ্রামে রয়েছে দোল গোবিন্দ আশ্রম, পশ্চিম বাজার মনু নদীর জাহাজ ঘাট। পাগুলিয়ায় রয়েছে দিল্লির পীর সাহেবের মসজিদ। বিরাইমবাদ গ্রামে আছে অজ্ঞান ঠাকুরের দেয়াল। কুলউড়া উপজেলায় রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দলনের তীর্থস্থান রঙ্গির কোল আশ্রম। বর্তমানে এখানে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবানামৃত সংঘ ইস্কন মন্দির।

প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে পৃথিমপাশায় দাঁড়িয়ে আছে নবাববাড়ী, নন্দ নগরে সতীদাহ মন্দির। আরও রয়েছে ইরানের শাহান শাহ রেজা শাহ পাহলভীর আগমন উপলক্ষে নির্মাণ করা শমসেরনগর ও লংলা রেল স্টেশনে নির্মিত সুরম্য তোরণ। শমসের নগরে ব্রিটিশ নির্মিত বিমানবন্দর ও একাত্তরে গণহত্যার বধ্যভূমিও রয়েছে। রয়েছে পতনউষার দুর্গের ধ্বংসস্তূপ। শ্রীমঙ্গল উপজেলায় রয়েছে ৪০০ বছরের পুরনো শ্রী শ্রী নির্মাই শিববাড়ী, কালাপুর ইউনিয়নে শতাব্দী প্রাচীন রাধা গোবিন্দ মন্দির, মাগুরছড়া ও কালাছড়া গ্যাস ফিল্ড। বড়লেখায় রয়েছে পাথাড়িয়ায় হজরত (রা.) ইয়াকুর এর মাজার, শাহবাজপুর মোঘল আমলের সারেগড় দুর্গ, মাধবকুণ্ড সংলগ্ন প্রাচীন শিব মন্দির, রাজনগড় উপজেলায় কমলা রানীর দীঘি ও রাজা সুবিধ নারায়ণের পরিবারের সমাধিস্থল, তারাপাশায় শতাব্দী প্রাচীন তীর্থস্থান বিষ্ণপদ ধাম, পাঁচগাঁওয়ে বাংলা সংবাদ পত্রের আদি পুরুষ গৌরী শংকর ভট্টাচার্য্যের বাড়ি এবং ঐতিহাসিক কালো ঝলঝল ও জাহান কোষা কামানের নির্মাতা জনার্জন কর্মকারের বাড়ি।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান খান কবির বলেন, ‘মৌলবীবাজারের টি কম্পেয়েন্সি নিয়ে আমাদের একটি পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন আছে। টি ট্যুরিজম নিয়ে আমরা এখানে কাজ করতে চাই। এখানকার গার্ডেনের ভিতরে যে রিসোর্টগুলো আছে সেগুলো আমরা ফোকাস করতে চাই। এ ছাড়া টি প্ল্যানটেশন, জলপ্রপাতসহ অন্যান্য স্থানগুলোকে নিয়েও আমাদের নানা পরিকল্পনা আছে।’

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত