বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

মৌলভীবাজারের চারটি আসন, হামলা মামলার ভয়ে ঘর ছাড়া ধানের শীষের কর্মীরা



স্টাফ রিপোর্টার: পুরাতন মামলার পাশাপাশি একাধিক নতুন মামলা। এসব মামলায় চলছে গ্রেফতার। পরিকল্পিত ভাবে হামলা করে অফিস ও যানবাহন ভাঙ্গচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দেওয়া হচ্ছে মামলা। মুঠোফোন ও বাড়িতে গিয়ে দেওয়া হচ্ছে হুমকি। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন জানা অজানা মামলায় নাজেহাল এজেলার বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। প্রতিনিয়ত এমন হামলা মামলার ভয় আর গ্রেফতার এড়াতে ঘর ছাড়া ধানের শীষের কর্মীরা। এখন ভোটের মাঠে এমন আতংক মৌলভীবাজার জেলা জুড়ে। ৪টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিকল্পিত ভাবে চলছে মামলা ও গ্রেফতার এমন অভিযোগ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের। বিএনপি ও ঐক্যফন্টের নেতাকর্মীদের অভিযোগ পুরানো মামলা ছাড়াও গায়েবী মামলা ও নতুন ভাবে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে ঢালাও ভাবে তাদেরকে আটক করা হচ্ছে। তাই গ্রেফতার আতংক নিয়ে দিনে ভোটের মাঠে থাকলেও পুলিশি ধরপাকড় এড়াতে রাতে বাড়ি ঘর ছেড়ে অন্যত্র থাকছেন তারা।

তাছাড়া প্রশাসনের লোকজন প্রতিনিয়ত নানা ভাবে তাদের গ্রেফতারের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাদের। বিএনপি ও ঐক্যফন্টের নেতাকর্মীরা ক্ষোভের সাথে বলেন সরকারীদল আওয়ামীলীগ ও মহাজোটের নেতাকর্মীরা ঢালাও ভাবে নির্বাচনী আচরন বিধি ভঙ্গ করে প্রচার প্রচারণা চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। বরং উল্টো পুলিশ তাদের নানা ভাবে সহযোগিতা করছে। তারা জানান গেল কয়েক দিন থেকে নৌকা মার্কার পক্ষের লোকজন পরিকল্পিত ভাবে নিজের কার্যালয় কিংবা যানবাহন ভাঙ্গচুর অথবা অগ্নিসংযোগ করে ঢালাও ভাবে ধানের শীষের পক্ষের নেতাকর্মী ও সর্মথকদের উপর মামলা দিচ্ছেন। তথচ আমরা নির্যাতিত হয়ে আইনের আশ্রয় নিতে গেলে থানায় আমাদের মামলা নেওয়া হচ্ছেনা। উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তারা অভিযোগ করে বলেন পুলিশের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তাদের আচরনে শান্তিপ্রিয় এই এলাকা এখন আতংকের জনপদে পরিনত হচ্ছে।

প্রতিনিয়ত এমন ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠার শেষ নেই। জেলা বিএনপির একাধীক নেতা মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন গেল ৩-৪ দিন থেকে বিএনপি,২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফন্টের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও সর্মথকদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তাদের এমন গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত থাকায় আমাদের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে কাজ করতে পারছেন না। সরকার দলের লোকজন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে আমাদের নেতাকর্মী ও সর্মথকদের মাঠ ছাড়া করছেন। তারা বলেন ভোটের মাঠে ধানের শীষের জোয়ার দেখেই প্রতিপক্ষের সরকারীদলের লোকজন এখন মামলা হামলায় আমাদের নাজেহাল করতে চাইছেন। তারা বলেন জনগণের মনের অবস্থা বুঝে পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখবে এমনটি আস্থা ও জোর দাবি আমাদের। জেলার ৭টি উপজেলার বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ জানান গ্রেফতার আতংকে তারা ভোটের মাঠে স্বাচ্ছন্দে কাজ করতে পারছেন না।

কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ জানান কুলাউড়ার জয়চন্ডী ইউনিয়নের একাধিকবারের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা কমর উদ্দিন কমরু ও জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মাছুম রেজাকে সম্প্রতি পুলিশ গ্রেফতার করেছে। নেতাকর্মীরা বলেন শুধু মাত্র ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় তড়িগড়ি করে নতুন ভাবে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় জনপ্রিয় এই দুই চেয়ারম্যানকে আটক করা হয়েছে। একই ভাবে বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজ উদ্দিনকেও আটক করা হয়েছে। বাদ যাচ্চেনা অন্য উপজেলার নেতাকর্মীরাও। বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন সম্প্রতি কুলাউড়ার কাদিপুর ইউনিয়নের ঢুলিপাড়া নামক স্থানে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা নিজেরা নিজেদের অফিস ভাঙ্গচুর করে উল্টো ধানের শীষের মিছিলে হামলা করেও বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের ৪৮ জন নেতাকর্মীসহ আরো ৩০/৪০ জন কে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা করা করেছেন। এই মামলায় বিএনপির নেতাকর্মীসহ ৬জনকে আটক করা হয়েছে অন্যদের গ্রেফতার করতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই আতংকে বাড়ি ঘর ছাড়া ওই এলাকার ধানের শীষের কর্মী ও সর্মথকরা। তারা জানান বুধবার রাতে একই কায়দায় কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ও হাজিপুর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগ ও নৌকা প্রতীকের কর্মী ও সর্মথকরা নিজেদের অফিস নিজেরা ভাংচুর করে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই অভিযোগ অন্য ৩টি আসনের প্রার্থী ও কর্মীদের।

এমন পরিবেশ অব্যাহত থাকলে শান্তিপূর্ন ভোট দেওয়া নিয়ে সন্দিহান স্থানীয় বাসিন্দারা। মামলা গ্রেফতার ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পুলিশি অভিযান নিয়ে সম্প্রতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এমন ঘটনার প্রতিবাদ জানান জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি ও মৌলভীবাজার-৩ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এম নাসের রহমান। ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলা রিটার্নিং অফিসার বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন এম নাসের রহমান। লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর নির্বাচনী এলাকাসহ জেলার ৪টি সংসদীয় আসনে আওয়ামীলীগ কর্মী সমর্থকরা বিএনপির নির্বাচনী পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, পরিকল্পিত ভাবে মিথ্যা মামলা, অব্যাহত ধরপাকড় ও তল্লাশীর নামে পুলিশী হয়রানীর মাধ্যমে ধানের শীষের কর্মী সর্মথকদের মাঝে আতংক ছড়ানো হচ্ছে। অভিযোগে আরো বলা হয়, তাঁর নির্বাচনী এলাকা মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় পুলিশ গভীর রাতে নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে গ্রেফতার ও হয়রানী করছে। যা সুষ্টু নির্বাচনের অন্তরায়। পুলিশসহ আইন শৃংখলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিতকরণ, দলীয় নেতাকর্মীসহ নির্বাচনীকাজে নিয়োজিত লোকজনদের হয়রানী বন্ধ, মিথ্যা, সাজানো ও গায়েবী মামলায় গ্রেফতার না করা, সুষ্টু ও গ্রহনযোগ্য শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে জেলা রিটার্নিং অফিসারকে অনুরোধ জানানো হয়। এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় জেলার রাজনগর থেকে ২, কুলাউড়া থেকে ৬, বড়লেখা থেকে ২, জুড়ি থেকে ৩, শ্রীমঙ্গল থেকে ১৬, কমলগঞ্জ থেকে ১জনসহ বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের ৩০ নেতাকর্মীকে আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করে পুলিশ। আটককৃতদের মধ্যে কুলাউড়া উপজেলা বিএনপি নেতা মঈনুল হক বকুল, জয়চন্ডি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কমর উদ্দিন কমরু,ছাত্রদল নেতা ইব্রাহিম লিসেছ, প্রবাসী যুবদলনেতা আলাল মিয়া, বিএনপি নেতা তারা মিয়া, শ্রীমঙ্গল পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামিম আহমেদ, বিএনপিনেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন,আব্দুল কাদির,আফজল আলী,আল-আমিন আহমেদ, মনির, ফাইজুল,সোহেল মিয়া,একমন হোসেন দ্বিমন,কামাল মিয়া, রুবেল মিয়া, শহিদুল ইসলাম, ইমাদ আলী,জামাল হোসেন, মাইনুদ্দিন ও সেফুল আহমেদ,বড়লেখা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হাফিজ,দক্ষিণভাগ উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার,জুড়ী উপজেলা বিএনপির নেতা ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মাছুম রেজা, আব্দুল গফুর সেলিম রেজাউল করিম রাজু, কমলগঞ্জের মোস্তাফিজুর রহমান শিপলু,রাজনগর থানার জুয়েল খান ও হাবিবুর রহমান রয়েছেন। এছাড়াও এর আগে ২০ দলীয় জোটের ২৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই গ্রেফতার অভিযান এখন অব্যাহত থাকায় নেতাকর্মীরা পুলিশি ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকেই অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ভিপি মিজানুর রহমান মিজান মানবজমিনকে বলেন মামলা হামলা আর গ্রেফতারের ভয়ে তাদের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে নির্বাচনী কাজ করতে পারছেন না। ৪টি আসনে একই অবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন শান্তিপূর্ন এজলাকে যাতে অস্থিতিশীল করা না হয় এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরী করা দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান। তবে জেলা পুলিশ প্রশাসন সুত্রে জানা যায় নতুন মামলা ও গ্রেফতারের বিষয়ে এখন থেকে তারা আরো সর্তক দৃষ্টি রাখবেন। যাতে অযতা কোন প্রার্থীর পক্ষের কর্মী কিংবা সমর্থক হয়রানীর শিকার না হন। তবে পুলিশের ভূমিকা নিরপেক্ষ নয় এমন বিষয়টি নাকচ করে জানানো হয় পুলিশ সবার জন্য সমান দৃষ্টি নিয়ে কাজ করছে। এবিষয়ে জানতে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহজালাল মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্তথাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত