বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ মাঘ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

কন্যাসন্তানের উচ্চশিক্ষা



পূর্ণতা আঞ্জুমঃ

‘স্বামী যখন পৃথিবী থেকে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ (সেলাই করার জন্য) মাপেন। স্বামী যখন কল্পনার সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাল-ডাল ওজন করেন এবং রাঁধুনির গতি নির্ণয় করেন।’

বেগম রোকেয়ার আমলে নারীদের অবস্থা ছিল এই। ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনের কথাও আমাদের জানা আছে। আর নারীদের পড়াশোনার অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। ঘরেই তারা বাবা-ভাইয়ের অধীনে থেকে পড়াশোনা করতেন। কিন্তু যুগ বদলেছে। ক্যালেন্ডারে উল্টানো হয়েছে পাতার পর পাতা। এখন নারীরা আর আগের মতো নেই। পড়াশোনায় কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন অনেকদূর।

আসলেই কি তা? আসলেই কি সত্যিকার অর্থে আমাদের নারীরা পেয়েছেন সত্যিকারের মুক্তির স্বাদ? নিজেকে সম্পূর্ণ চেনা-জানার স্বাধীনতা?

শিক্ষার জন্য এখন অনেক দূর যাচ্ছেন আমাদের তরুণীরা। বাবা-মাও মেয়েদের এখন আলাদা করে মেয়েসন্তান হিসেবে মানুষ করছেন না, সন্তান হিসেবেই দেখছেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কী দেখি? গ্র্যাজুয়েশন শেষে একজন তরুণী পারেন বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে দেশের বাইরে পড়তে যেতে। সেই ধাপও আমাদের সমাজ পার হয়েছে। এখন তরুণীরা একাই যাচ্ছেন দেশের বাইরে পড়তে। এটা আমাদের রাজধানীকেন্দ্রিক অভিভাবকরা করছেন।

আমাদের মফস্বলের তরুণীরা? অভিভাবকরা?

যেই স্বল্পসংখ্যক মেয়ে উচ্চশিক্ষায় পদার্পণের সুযোগ পান, সেখানেও তাদের মুখোমুখি হতে হয় বিভিন্ন ধরনের বাধার। উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিষয় পছন্দের ক্ষেত্রে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এমনকি সমাজও প্রথমে মনে করিয়ে দেয় যে, ‘তুমি মেয়ে। কীভাবে এটা করবা? এতে তো অনেক ঝামেলা।’ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে প্রায়ই একটি মেয়ের অভিভাবককে প্রভাবিত করে বলতে শোনা যায়, ‘মেয়েকে এত লেখাপড়া করিয়ে কী হবে? তার চেয়ে বরং বিয়ের জন্য টাকা গোছাও। শেষে তো ওইটাই কাজে আসবে। মেয়ের পড়ার পেছনে এত বাজে খরচ কর না।’ এতে করে মেয়েদের অভিভাবকও মেয়েদের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ে। এমনটাই ধারা। কোনোরকমে পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরিতে থাকতে পারলেই বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যায় মেয়ে। আর চাকরি? সেটাও জীবনসঙ্গী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা চাইলে করতে পারবে মেয়ে। এঙ্গেলস তার ‘অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- নারী মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন নারীরা সমাজের প্রতিটা কর্মকাণ্ডে সমান গুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। মেয়ে বলে প্রথমেই একজনকে পেছনের সারিতে ফেলে দেওয়া হয়। একটি মেয়ে যদি তার যোগ্যতা প্রমাণে সুযোগ না পায় তবে কীভাবে সে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করবে? আমরা আমাদের সমাজে এখনও দেখি একজন নারী প্রকৌশলী-আইনবিদকে বলা হয় মেয়ে হয়েও কেন আপনি এই পেশায় এসেছেন। যেন পেশা হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে যায় কোনটা ছেলেদের পেশা আর কোনটা মেয়েদের পেশা।

বাংলাদেশ শিক্ষা গবেষণা ও পরিসংখ্যান ব্যুরো এক প্রতিবেদনে বলছে, নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশ। যার মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের অংশগ্রহণ ৩৭ শতাংশ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২৬ শতাংশ।

উচ্চশিক্ষায় নারীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে বেশ কয়েকটি কারণ। মূলত সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীরা উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশ গমনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া নিরাপত্তাহীনতা, যৌন হয়রানি, অভিভাবকের মন-মানসিকতা, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ইত্যাদি কারণে মেয়েরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে পড়ছে। অনেক অভিভাবকের ভাবনা- মেয়েকে যদি উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পাঠাই তবে উচ্চশিক্ষিত হয়ে যাওয়ার পর তার জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া সমস্যা হবে। তাই অনেক অভিভাবক মেয়েকে বিদেশে পড়াতে চান না। আবার অনেক পরিবার চিন্তা করে মেয়েকে এত টাকা খরচ করে বিদেশ পাঠিয়ে লাভ কী। তারা তো বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। আমাদের দেশে অনেক মেধাবী নারী শিক্ষার্থী আছেন যারা বিদেশে গিয়ে যদি উচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ পান তাহলে প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি গবেষক বের হবেন।

নেতিবাচক চিন্তা যেমন আছে, ইতিবাচক চিন্তার দেখাও মিলে। শৈশব থেকেই এখন অনেক বাবা-মা সন্তানকে শুধু সন্তান হিসেবেও দেখেন। আলাদা করে ছেলেসন্তান বা মেয়েসন্তান হিসেবে নয়। তারা মেয়েকে এমনভাবে শিক্ষিত করে তোলেন যেন মেয়ে দেশে-সমাজে একজন সচেতন মানুষ হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তেমনি একজন জাফরিন রেজওয়ানা- ‘আমি বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। ছোটকাল থেকেই আমার বাবা-মা আমাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, আমি কখনও অনুভব করতে পারিনি আমি তাদের মেয়েসন্তান। বরং আমার বাবা-মাকে অনেকেই বলতেন আরেকটি সন্তান নিতে। মেয়েসন্তানের তো কোনো ভরসা নেই। কী যে হাস্যকর আমাদের সমাজব্যবস্থা। আমার বাবা-মা কিন্তু তাদের একমাত্র সন্তান নিয়েই খুশি ছিলেন এবং আমাকে সেইভাবে তৈরি করেছেন। দেশের বাইরে এতদিন পড়াশোনা করছি। যোগাযোগ করছি দেশে তাদের সঙ্গে। বাবা-মা কখনও আক্ষেপ করে বলেননি মেয়েটা আমার একা একা বিদেশ পড়তে গেছে। এটা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। আমরা যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই, ইতিবাচক মনোভাবের হই, তাহলে এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারব।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ করলে এমনটাই অভিব্যক্তি জানান জাফরিন।

সূত্র: সমকাল।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত