শুক্রবার, ২১ জুন ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এম এম শাহীন একটি রূপান্তরের গল্প



ফজলুর রহমানঃ আমরা জীবনে কত রকম গল্প শুনি। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের গল্পের মধ্যেই বসবাস। কিছু গল্প বাস্তব, কিছু গল্প কাল্পনিক। কিছু আছে বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেল। আবার বাস্তব এমন কিছু গল্প আছে, যা কল্পনাকেও হার মানায়।

এম এম শাহীন একটি নাম। এম এম শাহীন একটি গল্প। রূপান্তরের গল্প। মানুষকে ভালোবাসার গল্প। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জীবনের নানা বাঁক পার হয়ে এগিয়ে চলার গল্প। এ বদল একদিনে ঘটেনি। দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিরন্তর এ রূপান্তর। এ রূপান্তর ভাবনার জগৎ, ভালোবাসার জগতের রূপান্তর। স্বপ্ন ও প্রত্যাশার রূপান্তর।

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত এলাকা কুলাউড়া। বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তঘেঁষা একটি অঞ্চল। কুলাউড়াকে প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ ঢেলে গড়ে তুলেছে। তাই তো কুলাউড়াকে ‘প্রকৃতির রূপসী কন্যা’ মনে করে সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ। সেই কুলাউড়ার এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে পিতা-মাতার আদরে-সোহাগে বেড়ে ওঠা শাহীন চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন-কাজল মেখে নিয়ে, দুরন্ত যৌবনের জেদ নিয়ে দেশের সীমানা ডিঙায়। অর্থ-বিত্তে, ধনে-সম্পদে বড় হতে হবে। নিজ পরিবারকে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজনকে সুখী করতে হবে। অনেক চড়াই-উতরাই, লড়াই-সংগ্রাম শেষে থিতু হলেন বিশ্বের রাজধানী নিউইয়র্কে।

শুরু করলেন জীবনসংগ্রাম। স্বপ্নপূরণের লড়াই। মূলধন-সাহস, সততা। আর তার সঙ্গে শ্রম, মেধা, অধ্যবসায়। তিনি অচিরেই সাফল্যের সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ওপরের দিকে উঠতে লাগলেন। সাফল্যের বরপুত্র এম এম শাহীন। স্বপ্ন তার হাতের মুঠোয়। সামনে তার অপার সম্ভাবনা। কিন্তু বিধাতা-পুরুষ যার জন্য অন্য পথ ঠিক করে রেখেছেন, এম এম শাহীনের সাধ্য কি তার নিজের স্বপ্নের পথে চলেন? তার ভেতরের তাড়না তাকে বাণিজ্যিক শাহীন হওয়ার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে তাকে মানবিক শাহীন, জনগণের শাহীন হওয়ার পথে নিয়ে যায়। তিনি মানুষের মাঝে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। এবং অন্য রকম এক ভালোবাসায় মানুষের মধ্যেই তিনি তার মোক্ষ খুঁজে পেতে শুরু করেন।

এই অনুভব থেকে এম এম শাহীন সংসারজীবনে থেকেও মানুষের সেবা, মানুষের উপকার করা ও কল্যাণ সাধনের মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেন। এত দিন যা ছিলেন তার মনের ভেতর একটা গুপ্ত বাসনারূপে, অনুক‚ল সমর্থন পেয়ে মানুষের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সেই সুপ্ত আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটে বাস্তব ক্ষেত্রে, নানা কর্মে। তার ধ্যান, জ্ঞান ও কর্ম সব একাকার, একাত্ম হয়ে যায় জীবনের এই মহান ব্রতে।

তার জীবনের এই নতুন অধ্যায় শুরু প্রবাস কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে নিজেকে নানা কাজে যুক্ত করে। তিনি ভুলে যান একা একা বড় হওয়ার স্বপ্ন। নিজের সংসার, নিজের পরিজনের সুখ-স্বস্তি আর স্বপ্ন থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত করে কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে বড় হওয়ার কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কমিউনিটির মানুষের বড় হওয়ার মধ্যেই নিজের বড় হওয়া দেখতে পান। সবার এগিয়ে চলার মধ্যেই নিজের এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ অনুভব করতে থাকেন। যার মজে থাকার কথা ছিল-বাণিজ্যে বসতি লক্ষী মুনাফার সুখে, তিনি কিনা মজে গেলেন মানুষের ভালো করা, কল্যাণ করার ব্রতে।

সব দ্বিধা ঝেড়ে তিনি নেমে পড়েন প্রথমেই কমিউনিটির সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে। তিনি জানতেন-ঐক্যই শক্তি, ঐক্যই বল। প্রাক-বিপ্লবকালে আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জস ডিকিনসন্ তার মুক্তির গানে যে বলেছিলেন, ‘Then join hand in hand, brave Americans all! By uniting we stand, by devided we fall!’ (১৭৬৮ সালে ‘লিবার্টি সং’ নামে প্রথম বস্টন গেজেট প্রকাশিত)। সে চেতনায় বিশ্বাসী এম এম শাহীনকে এরপর সব সময় জনঘনিষ্ঠই দেখা গেছে। ঐক্যই শক্তি, বিভক্তি পতন-এই মন্ত্রে তিনি উদ্বুদ্ধ করতে থাকনে প্রবাসীদের। তখন প্রবাসী সবাই তার স্বজন। এই প্রবাসে আমরা সবাই জীবনযুদ্ধে আছি। পদে পদে কাঁটা। পদে পদে বাধা। চারপাশের পরিবেশ প্রতিকূল।

তিনি বুঝতে পারেন, এই বাধা একা একা অতিক্রম করা যাবে না। জোট বাঁধতে হবে। দেশ থেকে প্রায় ১৪ হাজার মাইল দূরে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজনহীন। অঞ্চলভেদ ভুলে এখানে সবাই স্বদেশ-স্বজন। জোট বাঁধতে হবে এই স্বজনদের নিয়ে। ব্যক্তিগত স্বার্থ ভুলে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’-এই বোধ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন। সবাইকে নিয়ে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা। জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের ছাতার নিচে সংগঠিত করেন নিজ অঞ্চল বৃহত্তর সিলেটের মানুষদের। বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয় ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মরণে নিউইয়র্কে প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারি তার নেতৃত্বেই পালিত হয়। নিউইয়র্কে একসময় বাংলাদেশের মানুষ বিভিন্ন এলাকায় দুর্বৃত্তের দ্বারা আক্রান্ত হতেন। শারীরিকভাবে আহত হওয়া ছাড়াও বহু কষ্টে অর্জিত সর্বস্ব হারাতে হতো। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে তার বিরুদ্ধে তিনি জীবনবাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রবাসে দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার সূচনাতেও জনাব শাহীনের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

আসলে মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ বোধ করার পর থেকেই তার মাথার মধ্যে সব সময় প্রবাসীদের কল্যাণ চিন্তা কাজ করতে থাকে। কী করলে প্রবাসের মানুষের ভালো হবে, কিসে প্রবাসীরা একটু আনন্দ পাবে, সুবিধা পাবে, দেশের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন এবং দেশের ও প্রবাসে বসবাস করা মানুষদের জন্য করণীয় কী-সেই চিন্তা তার কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়। তিনি দাবি তোলেন, প্রবাসীদের জন্য ভোটের অধিকার চাই। নিউইয়র্ক-ঢাকা-নিউইয়র্ক বিমানের ফ্লাইট চাই। সোনালী ব্যাংকের শাখা চাই। ফ্ল্যাট-প্লট দেওয়া চাই, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় চাই। বিনা খরচায় প্রবাসীদের মরদেহ দেশে পাঠাতে হবে। পার্লামেন্টে প্রবাসীদের জন্য কমপক্ষে ১০টি সংরক্ষিত আসন চাই। দেশে প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধসহ সকল প্রকার নিরাপত্তা চাই। ইত্যাকার সব দাবি তোলেন এবং সেসব দাবি আদায়ে নেতৃত্ব দেন। কিছু দাবি বাংলাদেশের সরকার মেনে নেয়। কিছু আজও অধরা।

তিনি ঠিকানা পত্রিকা প্রকাশ করে সেখানে প্রবাসীদের দাবি-দাওয়ার সমর্থনে জনমতকে সংগঠিত করতে শুরু করেন। যে কারণে ঠিকানা প্রবাসীদের ভালোবাসা অর্জনের পাশাপাশি প্রবাসীদের দ্বিতীয় ঠিকানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এম এম শাহীন অনুভব করেন আরো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সেবা করার জন্য আরো বড় পরিসরে কাজের সুযোগ দরকার। বৃহত্তর জনগণের পক্ষে কথা বলতে হবে তাদের পাশে থেকে। সে সময় তার মননে, ভাবনায়, চেতনায় কেবলই মানুষ আর মানুষ।

মানবসেবাকে পরম ধর্মজ্ঞানে জনাব শাহীন বেছে নেন রাজনীতি। মানুষের সেবা করার জন্য রাজনীতির চেয়ে বড় আর কোনো পথ নেই। যদিও তিনি জানেন, আজকের সময়ে সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখে থাকেন। তবে কর্মের সততা ও আন্তরিকতায় উদ্ভাসিত এম এম শাহীনের জায়গা এলাকার মানুষের হৃদয়ে। তারা শাহীনকে তাদের চলতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেই রাখেন। মানুষ খুব বিশ্বাস করেন শাহীন সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করেন। রাজনীতি করে নিজের ভাগ্য গড়ার আদর্শে বিশ্বাস করেন না। মানুষই তার আইন-আদালত। মানুষই তার শেষ কথা। শাহীন এলাকার মানুষের প্রয়োজনে সময়ের বিবেচনা করে সাড়া দেন না। ধনী-নির্ধন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যখনই যে কেউ ডাক দেন, দিন-রাত্রি, পূর্ণিমা-অমাবস্যায়, রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝায় তিনি মানুষের পাশে গিয়ে হাজির হন।

এম এম শাহীন খুব ভালো করে জানেন, সত্য বড় কঠিন। সেই কঠিনকে যারা ভালোবাসেন, তারাই খাঁটি প্রেমিক। মানুষ ব্যতীত সত্যি নেই। মানুষকে ভালোবাসাও খুব কঠিন কাজ। কঠিন জেনেও সেই মানুষকে ভালোবেসে প্রবাসে সব সুখের হাতছানিকে পেছনে ফেলে সাফল্যের মাঝপথে সাজানো রাজ্যপাট গুটিয়ে নিয়ে চলে আসেন আপন ভুবনে-নিজের মানুষদের মাঝে। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করে দেন তার ভালোবাসার মানুষদের কাছে। কুলাউড়ার মানুষের কাছেও এম এম শাহীন এক বিশ্বাসের নাম। এক আস্থা এবং ভালোবাসার নাম। মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জনের এক সিদ্ধপুরুষ শাহীন।

এম এম শাহীনের আরেক পরিচয়-তিনি কুলাউড়ার ভালোবাসা। আর রাজনীতি সেই ভালোবাসার ভাষা। তাই রাজনৈতিক দল যেভাবেই তাকে মূল্যায়ন করুক-তার পরোয়া করেন না তিনি। জনগণের মূল্যায়নই তার কাছে শেষ কথা। মানুষের সেই মূল্যায়নকে মূল্য দিতে তিনি সবকিছু করতে প্রস্তুত। ভোটের রাজনীতির হারজিতের পরোয়া নেই তার। মানুষকে ভালোবাসার পরীক্ষায় তিনি বিজয়ী হয়ে অমরত্ব লাভ করতে চান। তার নামের খ্যাতি আর কিছু নয়, তিনি কুলাউড়ার লোক। সেই তার প্রথম এবং শেষ পরিচয়। এলাকার মানুষের কাছে শাহীন হলেন তাদের রাজনীতির চারণ কবি। সেই কবিতার চরণে চরণে আর কিছুই থাকে না, থাকে শুধু মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। মানুষের প্রতি অঙ্গীকার। ধন-যশ কিছু নয়, শুধু মানুষের ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসা তার রাজমুকুট। মানুষের হৃদয় তার সিংহাসন।

 

লেখকঃ ফজলুর রহমান,

বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

(লিখাটি ফেইসবুক থেকে নেয়া)

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত