শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

ওরা ভাষা সৈনিক, মূল্যায়ন নেই



স্টাফ রিপোর্টারঃ

মোহাম্মদ ইলিয়াস, সৈয়দ মতিউর রহমান ও মফিজ আলী। ওরা তিনজনই ভাষা সৈনিক। ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছরেও কোন মূল্যায়ন পাননি তারা। কিন্তু ৫২’র ভাষা আন্দোলনে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুশালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত জননেতা মোহাম্মদ ইলিয়াস। ভাষা আন্দোলনের সময়ে ঢাকার রাজপথে সক্রিয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাবেক এই প্রেসিডিয়াম সদস্য তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রশ্নাতিরিক্ত সৎ, নির্লোভ ও ত্যাগী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয় ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াছ ছাত্র জীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সরাসরি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
পতনঊষার ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণকারী মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক সৈয়দ মতিউর রহমান। তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁর নের্তৃত্বে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হত্যাকা-ের প্রতিবাদে মৌলভীবাজারের স্কুল এবং কয়েকটি মাদ্রাসায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়েছিল।
এছাড়াও প্রতিবাদ সভা ও ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়েছিল কমলগঞ্জ উপজেলা সদর, শমশেরনগর, ভানুগাছ বাজারে। এসব প্রতিবাদ সভা আর ধর্মঘট পালনের সময় প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা জ্বালাময়ী কিছু স্লোগানও তৈরি করেছিলেন। সরকারিভাবে তাঁর আজও কোন মূল্যায়ন হয়নি।
একই ইউনিয়নের ধুপাটিলা গ্রামে জন্ম গ্রহণকারী প্রয়াত মফিজ আলী ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির ভাষা বিরোধী আন্দোলনের সময়ে সিলেট ও শমশেরনগর কেন্দ্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের সেই পথ ধরেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং সর্বশেষ পূর্ব পাকিস্থান চা শ্রমিক সংঘের শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হিসেবে মফিজ আলীকে ২০০৩ সনে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা প্রদান করলেও আর কোন মূল্যায়িত হননি।
কমলগঞ্জের লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ জানান, ভাষা আন্দোলন ঢাকাকে কেন্দ্রবিন্দু করে সংগঠিত হলেও তা হয়ে উঠে বাঙালির জাতীয়তা তথা জাতিসত্ত্বার আন্দোলন। ঔপনিবেশিক পাকিস্থানী শাসক গোষ্ঠির ভাষা বিরোধী এ আন্দোলন একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরকে যুক্ত করে তোলে। ফলে বিভিন্নস্থানে এ আন্দোলনের চরিত্র অভিন্ন ছিল।
তিনি আরোও জানান, কমলগঞ্জের কুশালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস ভাষা আন্দোলনের ঢাকা কেন্দ্রিক নেতা হলেও তিনিও মূল্যায়িত হননি। তেমনি দুই কীর্তিমান পুরুষ প্রয়াত সৈয়দ মতিউর রহমান ও প্রয়াত শ্রমিক নেতা মফিজ আলী ভাষা আন্দোলনের দৃশ্যমান নেতা ছিলেন। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হলেও তারা সেভাবে বিবেচ্য বা মূল্যায়িত হয়ে উঠেননি।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, ভাষাসৈনিক ইলিয়াছ এর বিষয়ে আমি অবগত হয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁর কর্ম ও জীবনের ওপর একটি বই শিগগিরই প্রকাশ করব। পরে মার্চ মাসে এই তিন ভাষাসৈনিকের সম্মানার্থে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হবে।
আরেক ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান বলেন, ভাষা আন্দোলনে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভাষাসৈনিক ইলিয়াছ আলী। তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করার জন্য ২০১৬ সালে আমি আবেদন করেছিলাম। এবারও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আমি এ বিষয়ে কথা বলব।
ভাষা আন্দোলনে তৎকালীন মহকুমা শহর মৌলভীবাজারেরও বিশেষ অবদান রয়েছে। তখন মৌলভীবাজারে কোন কলেজ ছিলনা। বিচ্ছিন্নভাবে স্কুলের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। ৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারি হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে মৌলভীবাজার শিশু পার্কে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশাল বড় সভা হয়েছিল। সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন আব্দুল আজিজ অ্যাডভোকেট। ছাত্রজনতার অংশগ্রহনে এখানে আরও অনেক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছিল।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মেয়ে রওশন আরা বাচ্চু ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিল করে আহত হয়েছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এখানকার আরও অনেক ভাষা সৈনিকের মধ্যে যাদের কথা বইপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা হলেন- সৈয়দ আকমল হোসেন, অ্যাডভোকেট আব্দুল খালিক, আব্দুল মজিদ ও রওশন আরা বাচ্চুর বোন সালেহা খাতুন। সালেহা ময়মনসিংহের একটি স্কুলে পড়তেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নারকীয় হামলার প্রতিবাদ করে ঐ স্কুল থেকে বহিস্কার হয়েছিলেন। প্রতিবাদের আগুন জ্বলেছিল শ্রীমঙ্গল শহরেও। ২১ ফেব্রুয়ারি হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে এখানকার স্কুল এবং কয়েকটি মাদ্রাসায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়েছিল। বিশাল এক প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন সৈয়দ মতিউর রহমান। এছাড়াও প্রতিবাদ সভা ও ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়েছিল জেলার কমলগঞ্জ, শমসের নগর, ভানুগাছ, রাজনগরে। স্থানীয় জনসাধারণের দাবী- মৌলভীবাজার জেলার অমূল্যায়িত ভাষাসৈনিকদের খুজে বের করে যথাযথ মূল্যায়ন করা।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত