বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পর্যটক বরণে প্রস্তুত চায়ের রাজধানী ‘মৌলভীবাজার’
ঈদ আনন্দ

ঈদ আনন্দ



ওমর ফারুক নাঈম ::

ঈদকে ঘিরে পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা। আর প্রতিবছরে ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির লীলাভূমি হিসাবে পরিচিত পর্যটন জেলা চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখতে সমাগম ঘটে লাখো পর্যটকদের। পর্যটক বরণে প্রস্তুত চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজার।

বিশেষ করে নয়নাভিরাম শতাধিক চা বাগান, জীব্যবৈচিত্রে ভরপুর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, দেশের বৃহত্তম জলরাশি মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, দূর্গম পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে হামহাম জলপ্রপাত, এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওর, দোসাই রিসোর্ট এন্ড স্পা সেন্টার, গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট, মনু ব্যারেজ এলাকায় রাঙাউটি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাধবপুর লেইক, শ্রীমঙ্গলের স্বাধীনতার বধ্যভুমি, বাইক্কা বিল, আগরের কারখানা, রাবার বাগান, জুড়ির কমলার বাগান, তুর্কি নকশায় নির্মিত শ্রীমঙ্গলের দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, বীরশ্রেষ্ট হামিদুর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ, মনিপুরি তাঁতশিল্প, খাসিয়াদের চাষকৃত পানের বরজ, মৌলভীবাজারের বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক সহ আরো অনেক সুন্দর আকর্ষণীয় জায়গা।

সৌন্দর্য উপভোগ করতে ইতোমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে অভিজাত সব রেষ্টহাউস থেকে শুরু করে ছোট বড় হোটেল রিসোর্টগুলো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা কিভাবে উপভোগ করতে পারে দৃষ্টি নন্দন এই স্থান গুলো। পর্যটকদের সুবিধার জন্য আকর্ষণীয় স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলো ধরা হলো।

চা বাগান: চা বাগান মানেই সবুজের অবারিত সৌন্দর্য। পূরো শ্রীমঙ্গল শহরটা ঘিরে রয়েছে শুধু চায়ের বাগান। শ্রীমঙ্গল নাম শুনলেই প্রথমেই স্বরন হবে চা বাগানের কথা। এ দেশে চায়ের রাজধানী’র কথা বললেই প্রথমে মনে পড়বে শ্রীমঙ্গলের নাম। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে যে কোন সড়ক ধরে হাটাপথ দুরত্বে পৌছা মাত্র চোখে পড়বে মাইলের পর মাইল পাহাড় ঘেরা চা বাগান। সবুজের মেলা চা বাগানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে অতি অবশ্যই বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। ইচ্ছে করলে কতৃপর্ক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে এসব চা বাগানের চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় প্রবেশ করে কাচাঁ চা পাতা থেকে চা তৈরীর প্রক্রিয়াও দেখা যেতে পারেন।

হাকালুকি হাওর: ছোট বড় ২৩৮টি বিল নিয়ে এ হাওরের আয়তন ২০ হাজার ৪ শত হেক্টর। প্রকৃতির এই বিশাল দুনিয়ায় কি নেই। নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ, পাখি, শাপলা-শালুক, ঝিনুক, শত শত প্রজাতির জলজ প্রাণী আর হিজল, কড়চ, বরুন, আড়ং, মূর্তা, কলুমসহ সবুজের ঢেউ জাগানিয়া মনকাড়া পরিবেশ। এই মৌসুমে থৈ থৈ পানি আর শীত মৌসুমে পাখির খেলা বিমোহিত রূপ মাধুর্যে কাছে টানে প্রকৃতি প্রেমীদের। এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির সীমানা মৌলভীবাজার ছাড়িয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত। হাকালুকি হাওরে যাওয়া যায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা দিয়ে। তবে কুলাউড়া উপজেলা হতে এখানে যাওয়া সহজ।

মাধবকুন্ড জলপ্রপাত: দেশের বৃহত্তম জলপ্রপাত মাধবকুন্ড। বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলী বাজার থেকে ৮ কি. মি. পূর্ব দিকে এগোলেই কানে আসবে ক্রমাগত জল গড়ানোর শব্দ। সেই সঙ্গে থাকবে সবুজ চা পাতার তাজা গন্ধ। প্রায় ২শ’ ৫০ ফুট পাথারিয়া পাহাড়ের ওপর থেকে ছোট-বড় পাথরের বুক চিড়ে আছড়ে পড়া জলরাশির ঝর্ণাধারার দৃশ্যে মন নাচে আনন্দ আবেগে। তাই যে কোন প্রকৃতি প্রেমীর জন্য এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান: লাউয়াছড়া রেইন ফরেষ্ট হিসেবে খ্যাত এই বনে রয়েছে হরেক প্রজাতির বন্যপ্রাণী আর বৃক্ষাদি। রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষরাজি। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান শ্রীমঙ্গল হতে মাত্র ১০ কিঃমিঃ আর ঢাকা থেকে ১৯৬ কিঃমিঃ। এর আয়তন ১২৫০ হেক্টর। মোট ১৬টি উল্লুক পরিবার হাজারো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভারত, চায়না, মায়ানমার এবং বাংলাদেশসহ ৪টি দেশে ওদের প্রজাতি সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গা ঘেষা রয়েছে ৩টি আদিবাসী পল্লী। ( মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়া) ও ১টি ত্রিপুরাদের পাড়া। আদিবাসীদের জীবনযাত্রা সাধারণত পাহাড়ী কৃষ্টি কালচারের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে যা সাধারনের থেকে অনেক আলাদা। আদিবাসিদের জীবনযাত্রা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য ইত্যাদি দেখাও পর্যটকদের জন্য বাড়তি পাওনা। ঢাকা / সিলেট থেকে বাস কিংবা ট্রেন এ করে আপনাকে প্রথমেই আসতে হবে শ্রীমঙ্গল শহরে । শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএন জি চালিত অটো রিকসা অন্যান্য যানবাহন নিয়ে অতি সহজেই ৮/১২ মিনিটের মধ্যে পৌছে যেতে পারবেন লাউয়াছড়ায়।

আগর বাগান: বড়লেখার আজীমগঞ্জ ও সুজানগর এলাকায় বিশাল বিশাল আগর বাগান আর তা থেকে নানা প্রক্রিয়ায় সুগন্ধি সংগ্রহের দৃশ্য কৌতূহল জাগায়। ওখানকার উৎপাদিত আগর সুগন্ধির চাহিদা মিটাচ্ছে দেশ-বিদেশের। যা রপ্তানী করে বৈদেশিক মুনাফা অর্জিত হয়।

মনিপুরী পল্লি: শ্রীমঙ্গলের রামনগর মনিপুরী পাড়ায় এখনো ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়াসে বেশ কটি তাঁতে তৈরী হচ্ছে শাড়ি, থ্রি-পিস, ওড়না, ব্যাগসহ নানা ধরনের পণ্য। তাঁত শিল্প সম্পর্কে জানতে এবং তাঁতে কাপড় বুনার প্রক্রিয়া দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন শ্রীমঙ্গলের রামনগর মনিপুরী পাড়ায়। ঢাকা / সিলেট থেকে বাস কিংবা ট্রেন এ করে আপনাকে প্রথমেই আসতে হবে শ্রীমঙ্গল শহরে । সেখান থেকে সিএনজি কিংবা রিক্শা যোগে আপনাকে যেতে রামনগর মনিপুরি পাড়ায় ।

হাম হাম জলপ্রপাত: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নয়নাভিরাম হামহাম জলপ্রপাতে পর্যটকের ঢল নেমেছে গহিন অরণ্যের এই জলপ্রপাতটি দেখার জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা ভীড় করেন। মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড জলপ্রপাতের চেয়ে তিনগুণ বড় হামহাম জলপ্রপাতটি। কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা বনাঞ্চলের ভারতীয় সীমান্তে হামহাম জলপ্রপাতটির সংবাদ সম্প্রতি বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার হলে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়। পর্যটকদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠেছে ১৬০ ফুট উচ্চতা থেকে প্রবাহিত হামহাম জলপ্রপাত। মাধবকুন্ডের চেয়ে তিনগুণ বড় হয়ে পানি পড়ে। কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কি.মি. পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি বন রেঞ্জের কুরমা বনবিট এলাকার প্রায় ১০ কি.মি.অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন হামহাম জলপ্রপাতের অবস্থান। শ্রীমঙ্গল থেকে সারাদিনের জন্য অর্থাৎ যাওয়া-আসার জন্য রির্জাভ গাড়ী/জিপ ভাড়া করে যেতে হবে। এরপর হাটা জঙ্গল, ছোট-খাট টিলা, ঝিরিপথ, পাথর পূর্ণ পিচ্ছিল রাস্তা পার হয়ে প্রায় ৩ ঘন্টা পর হাম হাম জলপ্রপাত। সকাল সকাল বের হয়ে গেলে বিকাল ৫ টার মধ্যে খুব সহজেই ফেরা যায়।

মাধবপুর হ্রদ: প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভুমি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত মাধবপুর লেক দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি স্থান। এটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখলা চা বাগানে অবস্থিত। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ১৫ কি: মি: দূরে পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জের মাধবপুর চা বাগান। লাউয়াছড়া প্রবেশের মুখে হাতের ডান দিকে নুরজাহান চা বাগানের ভিতর দিয়ে অথবা ভানুগাছ বাজার হয়ে সেখানে যাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে সোজা মাধবপুর লেকে যেতে পারেন। শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ড থেকে কমলগঞ্জ সিএনজিস্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে কমলগঞ্জ উপজেলা যেতে ভানুগাছ বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে পত্রখোলা যেতে মাধবপুর বাজারে নামতে হবে এরপর সামান্য হাটাপথে চা বাগান।

বাইক্কা বিল: হাইল হাওরে অবস্থিত সংরতি মৎস্য অভয়াশ্রম ‘বাইক্কা বিল’। ইউএস আইডি’র র অর্থায়নে মাচ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে মৎস্য ও পাখির অভয়াশ্রম। নয়নাভিরাম জলাভূমিতে হাজারও শাপলা আর পদ্মফুল ফুঁটে। বিলের পানির উপর ঘুরে বেড়ায় ফড়িং। সকাল বিকাল চলে রঙিন ফড়িংয়ের বিরতিহীন শোভাযাত্রা। বৃষ্টিহীন উষ্ণ দিনে বিলে ফুলের পাশে আসে রঙিন প্রজাপতির দল। জীববৈচিত্র ও মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর বাইক্কা বিল জলজ সম্পদের অমূল্য ভান্ডার। বিলের পানিতে ফোটা হাজারো পানা, শাপলা, পদ্ম আর নীলপদ্ম শোভিত মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক শোভা দেখে পর্যটক ও প্রকৃতিপিপাসুরা বিমোহিত হন। অপরূপ সৌন্দর্য্যমন্ডিত এ বিল এখন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে।

খাসিয়া পানপুঞ্জি : আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায় দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় উঁচু পাহাড়ি টিলা পরিস্কার করে পান চাষ করে থাকে আর এসব পান চাষ এলাকাই পুঞ্জি নামে পরিচিত। প্রতিটি পানপুঞ্জিতে ২৫/৩০টি পরিবার গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বসবাস করে। খাসিয়ারা পাহাড়ি পতিত ভূমিতে সুউচ্চ গাছের পাশে লতানো পানের চারা রোপন করে। টিলার পর টিলা সুউচ্চ গাছগুলো সবুজ পান পাতায় ঢেকে থাকে আর বড় গাছে লতানো পান গাছের এই দৃশ্য অত্যন্ত নয়নাভিরাম। এই দৃশ্য দেখতে চাইলে চলে যান নাহার, নিরালা, চলিতাছড়া, লাউয়াছড়া প্রভৃতি পান পুঞ্জিতে। এসব পুঞ্জিতে প্রতিদিনই সকাল-বিকেল পান ক্রেতাদের জীপ গাড়ি যাতায়াত করে। আপনি এদের সাথে ভাড়া দরদাম করে চলে যেতে পারবেন যে কোন পুঞ্জিতে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে লাওয়াছড়ার ভিতর গেলেই পাবেন খাশিয়া পান পুঞ্জি ।

ভ্রমন পিপাসুদের ভ্রমনকে আরামদায়ক করতে রেস্ট হাউস গুলোতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। মৌলভীবাজার জোনের এএসপি আহসান হাবীব জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নির্বিগ্ন রাখতে থাকছে অতিরিক্ত লোকবল। আইনশূঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য পর্যটন স্থানগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল থাকবে।

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত