শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

১২ ভূঁইয়ার নেতা ঈশা খাঁর স্মৃতি!



আকিব হৃদয়, কিশোরগঞ্জ::
কিশোরগঞ্জের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গদেশের শাসক ঈশা খাঁর বাড়ি। কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পূর্বে করিমগঞ্জ উপজেলার কাদির জঙ্গল ইউনিয়নের নরসুন্দা নদীর তীরে জঙ্গলবাড়ি দুর্গের অবস্থান। ১২ ভূঁইয়ার নেতা ঈশা খাঁ সম্পর্কে যা পাওয়া যায় তাহলো তিনি ১৫২৯ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সোলায়মান খাঁ। তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক আফগান দলপতির বংশধর। প্রাচীন বঙ্গের অধিপতি নুসরত শাহের রাজত্বকালে তিনি বাংলায় বসতি স্থাপন করেন এবং স্বীয় প্রচেষ্টায় ভাটি এলাকার বৃহত্তর ঢাকার ও ময়মনসিংহ জেলার উত্তর-পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
সোলায়মান খাঁ অন্তত পক্ষে দুবার ইসলাম শাহ শুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং ১৫৪৮ সালে নিহত হন। ঈশা খাঁর বয়স তখন ১৯ বছর। পিতার মৃত্যুর পর ঈশা খাঁর পিতৃব্য কুতুবউদ্দীন তাকে লালন পালন করেন। তখন বাংলার জমিদাররা মোগল ও ইংরেজদের কবল থেকে বাংলাকে রক্ষা করার জন্য তাদের গোয়েন্দাদের মাধ্যমে ঈশা খাঁকে আফগানিস্তানে সংবাদ দিয়েছিলেন। ঈশা খাঁ তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আফগানিস্তান হতে ১৪০০ অশ্বারোহী, ২১টি সামরিক নৌকা ও পর্যাপ্ত গোলাবারুদ নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে পৌঁছান। ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি দুর্গ দখল করে পরে সোনারগাঁ দুর্গ দখল করেন। তিনি তার যৌবনকাল ভাটিতে কাটিয়েছিলেন। সোনারগাঁয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণ গ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদরায়ের কন্যা-কেদার রাজার বোন স্বর্ণময়ীকে বিবাহ করেন।
স্বর্ণময়ী পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ঈশা খাঁ তার নাম রাখেন সোনা বিবি। সেই নাম অনুসারে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ নামকরণ করা হয়। কররানী বংশের আফগান শাসক তাজ খানের অনুগ্রহে ৩৫ বছর বয়সে ঈশা খাঁ বাংলার কররানী শাসকের সমান-হিসাবে সোনারগাঁ ও মহেশ্বরদী পরগনায় ১৫৬৪ সালে ভিনদেশি হিসেবে তিনগুণ মোহর দিয়ে জমিদারি লাভ করেন। তিনি ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এত শক্তিশালী হয়ে উঠেন যে, আবুল ফজল তাকে ভাটির শাসকরূপে আখ্যায়িত করেন। ১৫৭৫ সালে তিনি সোনারগাঁয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মোগল নৌবহরকে বিতাড়িত করতে দাউদ খানের সেনাপতিকে সাহায্য করেছিলেন। দাউদ খানের প্রতি কর্তব্য পালনের প্রতিদানে তিনি মসনদ-ই-আলা উপাধি লাভ করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে মোগলদের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষার জন্য বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঢাকা সোনারগাঁয়ের বিচক্ষণ ও শাসক ঈশা খাঁ মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে ১৫৯৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে মোগলদের আক্রমণের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে ঈশা খাঁর সফল সংগ্রাম তাকে বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তিনি তার সোনারগাঁ ও মহেশ্বরদীর জমিদারিকে সাফল্যের সঙ্গে এক স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করেন।
ঈশা খাঁ এক প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। তার মূল বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনাগাঁওয়ে অবস্থিত। কিন্তু সেটি ছাড়াও তার আরো একটি ঘাঁটি ছিল কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জঙ্গলবাড়িতে। এটা বীর ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে প্রচলিত। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন ঈশা খাঁর জমিদারবাড়িটি এখনো পুরোনো জরাজীর্ণ স্থাপনা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এখন নেই সেই জৌলুস আর অভিজাত্য। শুধু রয়ে গেছে কিছু স্মৃতি চিহ্ন।

সেখানে গেলে জমিদারবাড়ির প্রাসাদসম অট্টালিকা আজ আর চোখে পড়বে না। পাওয়া যাবে কালের সাক্ষী হয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা জরাজীর্ণ একটি ভবন, দরবারগৃহ, পুকুরঘাট ও মসজিদ। ঈশা খাঁর এই বাড়িটি দেখতে প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় লেগে থাকে।

ইতিহাস বলছে, ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় মোগলদের কাছে পরাজিত হয়ে ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়িতে কোচ রাজা লন হাজোর দুর্গে হামলা করে এটি দখল করে নেন। জঙ্গলবাড়িতে স্থাপন করেন তার দ্বিতীয় রাজধানী। দুর্গটি সংস্কার করে তিনি এর তিন দিকে পরিখা খনন করে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে জঙ্গলবাড়িকে একটি গোলাকার দ্বীপের মতো করে গড়ে তোলেন। ১৫৮১ থেকে ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়িতে অবস্থান করে শাসন করেন তার ২২টি পরগনা। জঙ্গলবাড়ি অবস্থান করেই তিনি সোনারগাঁ দখল করে সেখানে স্থাপন করেন নতুন রাজধানী।

কিশোরগঞ্জ শহর থেকে বাস, অটো অথবা সিএনজি যোগে সরাসরি ঈশা খাঁর দুর্গে আসা যায়। এক সময় দুর্গম জঙ্গলাকীর্ণ ছিল বলেই হয়তো এর নাম হয়েছে জঙ্গলবাড়ি। বারো ভূঁইয়াদের শ্রেষ্ঠ ঈশা খাঁর রাজধানী হিসেবে জঙ্গলবাড়ির নাম মিশে আছে ইতিহাসে। এখানে রয়েছে প্রায় ভগ্ন দুর্গ প্রাচীর, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঈশা খাঁর দরবার হল, প্রাচীন মসজিদ, সামনে ধ্বংসপ্রাপ্ত সান বাঁধানো ঘাটের বিশাল পুকুর ও প্রায় মাটিচাপা পড়া একটি ভবনের ভিত্তি ভূমি।

জঙ্গলবাড়ি দুর্গ বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত ঈশা খাঁর স্মৃতিবাহী একটি স্থাপনা। মসনদে-আলা-বীর ঈশা খাঁ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়াদের প্রধান। ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি প্রকৃতপক্ষে ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী ছিল। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের প্রতœতাত্ত্বিক অধিদফতর কর্তৃক তালিকাভুক্ত একটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা।

ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়িটি কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে করিমগঞ্জ উপজেলার নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। বনজঙ্গল ঘেরা এক স্থানটি ‘জঙ্গলবাড়ি’ নামে পরিচিত। এ এলাকাটিই বারো ভূঁইয়ার নেতা, ভাটি রাজ্যের অধিপতি ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। তিনি এটাকে দুর্গ হিসেবেও ব্যবহার করতেন। গত ২০০৫ সালের ১২ জুন, এখানকার দরবার গৃহটি ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম রুহুল আমিন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার কামরুজ্জামান খান ও চেয়ারম্যান এ বি এম সিরাজুল ইসলাম এই উদ্যোগ নেন। তবে বর্তমানে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেবল উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ইটের পাঁচিল দিয়ে ভাগ করা দুটি চত্বর অবশিষ্ট আছে। স্থানীয়দের কাছে পাঁচিলটি ‘প্রাসাদ প্রাচীর’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে আরো একটি তোরণ। তোরণটির সামেনে ‘করাচি’ নামে পরিচিত একটি পূর্বমুখী একতলা ভবন আছে। উত্তরে রয়েছে একটি তিনগম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। তোরণের পেছনে ‘অন্দর মহল’ নামে একতলা দক্ষিণমুখী একটি ভবন। গোটা ইটের দেয়াল চুনকামসহ লেপন দিয়ে ঢাকা।

সামনেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বেশ বড় একটি পুকুর। মোগল প্রথাসিদ্ধ রীতির ছাপ মসজিদটির প্রতিটি ইটের গায়ে ও স্থাপত্যে চিহ্ন রেখে গেছে। বাংলাদেশ প্রত্মত্ত্ব অধিদফতর ২০০৯ সাল থেকে ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত জঙ্গলবাড়িটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে এই অধিদফতরই এই জঙ্গলবাড়িটি সংরক্ষণের দায়িত্বে আছে।

কিশোরগঞ্জ ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লেখক ও গবেষক আমিনুল হক সাদী বলেন, ‘ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী জঙ্গলবাড়ির দুর্গ নগরী ও হাবেলী সংস্কার না হওয়ায় আজ তা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। তবে সম্প্রতি প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ায় বেশ আশান্বিত হয়েছি। হয়ত ইতিহাস বিজড়িত এই ‘জঙ্গলবাড়ি’ আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

 

নিউজ সম্পর্কে আপনার বস্তুনিস্ঠ মতামত প্রদান করুন

টি মতামত